• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জৈষ্ঠ ১৪২৯

জাতীয়

মশার ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারি ২০২১

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির একজন কাউন্সিলর এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মেয়রের কাছে লিখিত আবেদনও করেন তিনি।

ওষুধের কার্যকারিতা নেই এমন অভিযোগ মানতে নারাজ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের দাবি নগরীতে কিউলেক্স মশা শীত মৌসুমে এমনি বাড়ে। এ ঋতু শেষ হলে মশা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। মশা নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ করছেন এমন দাবি তাদের।

এদিকে গত কয়েক মাস ধরেই রাজধানীতে মশা মারাত্মক হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। বস্তি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোতেও বেড়েছে মশা। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই শুরু হয় উৎপাত। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে এতে। বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও। অন্যদিকে গত কয়েক মাস মশার উপদ্রব কিছুটা কম থাকায় ঢাকার দুই মেয়র দাবি করেছিলেন, এ বছর মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। প্রতি বছরের এ সময় প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। মশার প্রজননস্থলগুলো পরিষ্কার করে এ উপদ্রব কমিয়ে আনা সম্ভব। রমনান সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা নাজমুল সোহান বলেন, বাসায় ঢুকলেই মশা কামড়ায়। রাতে মশারি টাঙিয়ে থাকতে হয়। সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মীকে দেখা যায় না। এমন ভয়ংকর মশা আগে দেখিনি।

মালিবাগের রিকশাচলক বাতেন মোল্লা বলেন, আগে গ্যারেজে রিকশার মধ্যেই ঘুমাতে পারতাম। এখন বাইরেই ত্রিশ সেকেন্ড দাঁড়ানো যায় না। অথচ মেয়ররা বলেন, মশা নাকি নিয়ন্ত্রণে আছে। তারা কাজ করছেন নিয়মিত। বাস্তবে তা বুঝা যায় না। মশা এখন বেশি। মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৬৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মো. ইবরাহীম। মেয়রের কাছে অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ৬৭ নং ওয়ার্ডের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক বরাদ্দকৃত মশার ওষুধ যথা নিয়মে প্রতিদিন ছিটানো হচ্ছে। এলাকাবাসীর মন্তব্য ছিল, প্রথমে যে মশার ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তার কার্যকারিতা এমন ছিল যে জনগণ মশারি ছাড়া রাত কাটাতে পেরেছিল। কিন্তু এখন ওষুধের সে রকম কার্যকারিতা আমরা পাচ্ছি না।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন অনেক কাউন্সিলরের ফোন পাই। তারা অভিযোগ করেন, ওষুধ দিলেও কোনও কাজ হয় না। মশা মরে না। তারা ওষুধ ভালো করে পরীক্ষার দাবি করেন।

কাউন্সিলরের এ দাবির সঙ্গে কিছুটা একমত পোষণ করলেও দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আমরা আগের ওষুধই ব্যবহার করছি। যেসব ওষুধ ইমপোর্ট করা আছে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ওষুধ এখনও আসেনি। তিনি দাবি করেন, এখন বাতাস নেই। এ কারণে কিউলেক্স মশা একটু বাড়ে। ফাল্গুনের এলে আবার কমে যাবে। মশা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপরেও আমরা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছি।

আমিন উল্লাহ বলেন, মশার ওষুধ কিন্তু আমরা টেস্ট করি না। এই কাজটা করে থাকে আইইডিসিআর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের প্ল্যান্ট প্রটেকশন। তারা যে ওষুধ সার্টিফাইড করে আমরা সেটাই ব্যবহার করি।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, মশা বেড়েছে এটা সত্য। আমিও এখন মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই। তবে মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি। তাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতিটি কোম্পানি ‘অতিরিক্ত’ দর দেওয়ায় তা বারবার রি-টেন্ডার করে ডিএসসিসি। প্রায় চার দফায় টেন্ডার দিয়ে গত বছরের অক্টোবরের দিকে ওষুধ ফরমুলেশনের কাজ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করতে পারে সংস্থাটি। এই দীর্ঘ সময় সংস্থার কাছে ওষুধ ছিল না। তখন অলস সময় কাটিয়েছিল মশককর্মীরা।

ডিএসসিসিতে ওষুধ ফরমুলেশনের দায়িত্বে রয়েছে এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেড। কোম্পানিটির সরবরাহকৃত প্রায় এক লাখ লিটার ওষুধ ফিল্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় গত বছরের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ওই কোম্পানির ফরমুলেশন করা ওষুধই ব্যবহার করছে সংস্থাটি। তবে ফেরত দেওয়া ওষুধ কী করা হয়েছে তা বলতে পারছে না ডিএসসিসি।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের দাবি, মাঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া সেই ওষুধ ধ্বংস না করে আবারো ডিএসসিসিতে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ডিএসসিসিতে পরে যতগুলো লট সরবরাহ করা হয়েছে প্রতিটেই ফিল্ড টেস্ট করে গ্রহণ করা হয়েছে।

মশা বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মী কমিয়েছে ডিএসসিসি। সংস্থার বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ার্ডে নিয়োজিত নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী রেখে বাকিদের সচিব দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। ডেঙ্গুর এই মৌসুমে কর্মী কমানোকে চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন কীটতত্ত্ববিদ ও নাগরিকরা। তারা বলছেন, যেখানে অর্ধেকের চেয়েও কম জনবল নিয়ে কাজ করছে সিটি করপোরেশন, সেখানে কর্মী কমানো যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। বিশেষ করে এই ডেঙ্গু মৌসুমে সিটি করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তই মশা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ থেকে ১৮ জন করে কর্মী রয়েছে। এ থেকে ৩ থেকে ৭ জন করে কর্মী কমিয়ে সচিব দফতরে বদলি করা হয়। সবকটি ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৩০০ জন কর্মীকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে অফিস সহকারী হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘অধিকাংশ ওয়ার্ডে অতিরিক্ত জনবল থাকায় তাদের প্রত্যাহার করে ভিন্ন কাজে খাটাচ্ছি।’ যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশকনিধনে ওয়ার্ড পর্যায়ে সিটি করপোরেশনের যে জনবল রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

জনবল কমানো প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের যেখানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে সেখানে ওয়ার্ড থেকে জনবল কমানো কোনোভাবেই কম্য নয়। একটি ওয়ার্ডের মশা নিয়ন্ত্রণে যে পরিমাণ জনবল থাকা দরকার তার অর্ধেকের চেয়ে কম নিয়ে কাজ করছে সিটি করপোরেশন।

তিনি আরো বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক জায়গায় যদি ওষুধ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময় পর সেই জায়গায় আবার ওষুধ দিতে হবে। এক জায়গায় দিলাম, আরেক জায়গায় দিলাম না তা হলে চলবে না।

এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, একেকটি ওয়ার্ডকে ৮-১০টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতি সেক্টরে কমপক্ষে ৪ জন করে জনবল রাখতে বলেছি। এক্ষেত্রে একটি সেক্টরে একজন লারভিসাইডিং, একজন অ্যাডাল্টিসাইডিং এবং একজন পরিস্থিতি কতটা উন্নতি বা অবনতি হয়েছে তা দেখভাল করবে। এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রাখবে আরেকজন। যাতে তারাও মশক নিয়ন্ত্রণকাজে যুক্ত থাকতে পারে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে মশার উৎপাদনস্থল টিকতে পারবে না। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে ৩২ থেকে ৪০ জন লোক লাগবে। কিন্তু সেখানে আছে ১২-১৩ জন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মচারী রণজিৎ রায় বলেন, চোখের সামনেই দেখতেছি নিয়মিত ওষুধ ছিটাচ্ছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু মশা তো কমে না, উল্টো ঠিক যেন আরও বাড়ছে।

একই অভিযোগ মিরপুর-১ এলাকায় শাহআলী মার্কেটের পেছনের আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘প্রায় সময় তো সিটি করপোরেশনের দোষ দিতাম যে, তারা ওষুধ ছিটাচ্ছে না। কিন্তু এবার তো দেখছি ওষুধও ছিটানো হচ্ছে। তাও কেন মশা কমে না। আমাদের বাসা এবং গলির সড়কের কোথায়ও কিন্তু ময়লা-আবজর্না নেই। তারপরও রয়েছে মশার প্রচুর উপদ্রব।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের বলেন, ‘ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি মেয়র মহোদয়ও অবগত রয়েছেন। এমনকি মেয়র মহোদয় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এর কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে নিয়মিত যেসব ওষুধ ছিটানো হচ্ছে সেগুলোর পরিবর্তনে নতুন কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যায় কিনা সে বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, গত বছর ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাবের পর আমরা সিটি করপোরেশনকে কর্মী দিয়েছি, জনবল দিয়েছি, যন্ত্রপাতি দিয়েছি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েছি। তবে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে কর্মী ফেরত আনার বিষয়ে কোনো রিপোর্ট আমার জানা নেই। আমি মনে করে আমরা তাদের যে লোকবল দিয়েছি সেই লোকবল দিয়েই তারা কাজটা করতে পারে। সেই লোকবলের অবসর সময় যদি অন্য কাজে লাগে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু ডেঙ্গু মৌসুমে এটা কোনোভাবে কাম্য নয়।

বিগত বছরে সিঙ্গাপুর ও দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঢাকায় মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পৃথক দুটি আলাদা বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেয় দুই সিটি করপোরেশন। এজন্য ঢাকা দক্ষিণের পক্ষ থেকে ‘কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট’ ও উত্তর সিটির পক্ষ থেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ নামে পৃথক দুটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেটা নিয়ে এগুতে পারিনি। তবে প্রতিদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর সঙ্গে অনেক বৈঠক হয়েছে। আরো বৈঠক করছি। এ ছাড়া মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজও চালিয়ে যাচ্ছি।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট করার জন্য দেশব্যাপী কাজ করছি। শুধু ঢাকা শহরের দায়িত্ব তো সরকারের না, সরকারের দায়িত্ব সারা দেশ নিয়ে। আমরা এখন যদি একটি ম্যানেজমেন্ট সিসেন্টম ডেভেলপ করি সেটা সারা দেশের জন্যই করতে হবে। এমন একটি সিস্টেম করার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছি। এখন আমাদের সেই আঙ্গিকে কাজ করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোকে আমরা জনবল দিচ্ছি। এন্টোমলজিস্টসহ অন্যান্য জনবলও দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads