• শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৭
জনশক্তি রপ্তানি অন্যতম

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খুলতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি

জনশক্তি রপ্তানিতে এসেছে সফলতা

  • রবিউল হক
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০২১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে যে কয়েকটি সেক্টরে সাফল্য এসেছে তারমধ্যে জনশক্তি রপ্তানি অন্যতম। কর্তমানে দেশের অর্থীতিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান রাখছে এই খাত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরেই জনশক্তি রপ্তানির অবস্থান। এসময়ে বিদেশে ১ কোটি ৩২ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে, যা অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। অথচ তাদের অধিকার বা সম্মান দেওয়ার বিষয়টি এখনো খানিকটা অবহেলিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার হার বেড়েছে। তাদের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের কাজটি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু করে। এই তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন বাংলাদেশি বিদেশ যান। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৮৯ জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২২১ জন যান কাতারে। আর সৌদি আরবে গেছেন মাত্র ২১৭ জন। তবে দিনে দিনে বিদেশের বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন বাংলাদেশিরা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখে, যা দেশের বাইরেও বাংলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী। তারা বিদেশে কর্মসংসংস্থান, শিক্ষা এবং স্থানীয় রাজনীতিতেও ভালো অবস্থানে আছেন এবং দেশেও বছরে এখন প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রেমিটেন্সও পাঠাচ্ছেন। যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহতভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে এখন বছরে দশ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যায়। এরমধ্যে ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যান। তবে গত কয়েক বছর ধরেই এই সংখ্যাটা ১০ লাখের কাছাকাছি রয়েছে। ২০০৭ সালে বৈদিশেক কর্মসংস্থান হয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার বাংলাদেশির। আর ২০০৬ সালে ৮ লাখ ৩৩ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন। এটি সরকারি হিসাব হলেও বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরো বেশি। কেননা, ট্যুরিস্ট ভিসায় বা স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে বছরে ঠিক কতজন বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নেন তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিটেন্সের সাফল্যে সরকারি পর্যায়ে যতটা সন্তোষ প্রকাশ করা হয়, প্রবাসীদের মধ্যে সরকারি সহযোগিতা নিয়ে ঠিক ততটাই হতাশা ও অসন্তোষ রয়েছে। কারণ, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পদে পদে রয়েছে ভোগান্তি, প্রতারণা ও ঋণে জর্জরিত হওয়ার করুণ কাহিনী। একমাত্র বাংলাদেশিদেরই দিতে হয় বিশ্বের সর্বোচ্চ অভিবাসন খরচ। অথচ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও প্রতারণার শিকারও হতে হয় তাদের। এক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা বা নীতিমালার বেশিরভাগই অকার্যকর। এত বেশি অভিবাসন খরচ ও ভোগান্তি শেষেও বিদেশে বাংলাদেশিরা বেতন পান অন্যান্য যে কোনো দেশের কর্মীদের তুলনায় কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপে জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৬২ শতাংশ অদক্ষ এবং ৩৬ শতাংশ আধা দক্ষ। তাই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে প্রবাসে কর্মী নিয়োগ অবিলম্বে কমে যেতে পারে। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি কাজ করেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতাতেও আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাংলাদেশে কর্মরত একজন বিদেশি কর্মী গড়ে যে বেতন পান, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি ১০ শ্রমিকের বেতনও তার সমান নয়। কারণ, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশই কাজ করেন মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। এসব দেশেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিদেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাঠানোর দিকেই মনোযোগ বাড়াতে হবে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে যেসব শ্রমিকেরা যান, তারা স্থানীয় ভাষা না জানায় নানা রকম সমস্যায় পড়েন। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, আর সে জন্য আধুনিক ও উন্নত সুবিধাসংবলিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠন ‘বায়রা’র সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান রাখা এই খাতটি বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যেমন, অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে যাওয়া, অভিবাসন খরচ ও সময় বেশি, অভিবাসন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড না করা এবং টেকসই শ্রমবাজার না তৈরি করা। তিনি বলেন, নেপালে একজন কর্মীর বিদেশ যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ সপ্তাহ। সেখানে বাংলাদেশ থেকে ১ থেকে ২ মাস সময় লাগে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় এখন ইউরোপের শ্রমবাজারে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী তৈরি দিকে নজর দিতে হবে। বিদেশি বাংলাদেশের শ্রমবাজারগুলো কেন বার বার বন্ধ হয়ে যায় সেদিকে বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া অভিবাসন খরচ ও বিমানভাড়াও অত্যাধিক, যা টেকসই ও নিয়মিত অভিবাসনের বড় অন্তরায়।

বিএমইটি-র পরিসংখানে দেখা যায়, কম বেশি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে ১৭২টি দেশে কর্মীরা যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব। গত ৫০ বছরে দেশটিতে গেছে প্রায় ৪২ লাখ ৭৬ হাজার কর্মী। এখনো দেশটিতে প্রায় ২০ লাখ কর্মী কর্মরত আছে। এরপরই রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখানেও গত ৫০ বছরে ২৩ লাখ ৭৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে ওমানে ১৫ লাখ ২৯ হাজার এবং মালয়েশিয়ায় ১০ লাখ ৫৭ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। এর বাইরে কাতার, কুয়েত, লিবিয়া, জর্ডান, সিঙ্গাপুর, বাহরাইনের মতো দেশগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী গেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কর্মীরা কাজ করতে যান। ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশে কূটনৈতিক সংযোগ রাখার জন্য বাংলাদেশের ৭৭টি মিশন রয়েছে, এরমধ্যে ৫৯টি পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস। কয়েকটি দেশে রয়েছে একাধিক মিশন। আর ১৩৫টি দেশে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশন নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করতে যান এমন দেশের মধ্যে প্রায় ১১০টি দেশে কোনো শ্রম কল্যাণ উইং নেই।

বিদেশে লেবার উইং বাড়ানো হবে কিনা জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, যে কোনো এক্সপেনশনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া আছে। আমরা মূলত ২৯টি লেবার উইংয়ের জনবল বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের ওয়েলফেয়ার বোর্ড আর মন্ত্রণালয় থেকে আমরা চেষ্টা করছি, ওখানে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ করা যায় কিনা। যদি আমরা সেটা করতে পারি, তাহলে আশা করি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিক সেবা দিতে পারবো। আপাতত এইটুকু উদ্যোগই আছে আমাদের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads