• রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ২১ কার্তিক ১৪২৪

জাতীয়

ভ্যাকসিন গ্রহণ বেশি জরুরি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৫ মে ২০২১

দেশে স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও কোভিড-১৯-এর ভ্যারিয়েন্টের কারণে সংক্রমণ বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিরা। ইতোমধ্যে দেশে পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলে সংক্রমণ ছড়ানো ভ্যারিয়েন্ট।

সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচনায় রয়েছে ভারতের পাওয়া নতুন ভ্যারিয়েন্ট। দেশটির মহারাষ্ট্রসহ কিছু অঞ্চলে ডাবল মিউটেন্ট (ই.১.৬১৭), ট্রিপল মিউটেন্ট (ই.১.৬১৭+ঝ:ঠ৩৮২খ) এবং ই.১.৬১৮ (বেঙ্গল ভ্যারিয়েন্ট) নামে পরিচিত ভ্যারিয়েন্টগুলো নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশেও। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই ভ্যারিয়েন্টগুলো দেশে আসলে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোদ ভারতেই এখনো তাদের নতুন পাওয়া ভ্যারিয়েন্টগুলো কতটুকু ক্ষতিকর তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা হয়নি। আর তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এখন পর্যন্ত এগুলোকে ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট বলে পর্যবেক্ষণে রাখছে। যেহেতু আমাদের দেশে আগে থেকেই যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে তাই সংক্রমণ শনাক্তের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, ভ্যারিয়েন্ট যাতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। কিন্তু একই ভাবে মহামারিকালে ভাইরাস নতুন নতুনভাবে রূপ বদলানোটাও স্বাভাবিক। আর তাই এ সময় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চাইতেও বেশি জরুরি মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, যাতে কোনোভাবেই মানুষ সহজে আক্রান্ত হতে না পারে। একই সঙ্গে মানুষকে ভ্যাকসিনও নিতে হবে, যাতে মানুষ কোভিড-১৯ সংক্রমিত হলেও তার মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে। একই সঙ্গে সংক্রমণের তীব্রতাও কমে আসে ভ্যাকসিন নেওয়ার কারণে।

অণুজীববিজ্ঞানী ও চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা বলেন, ‘ভারতের ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে খোদ সেই দেশেই এখন পর্যন্ত তেমন ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাদের গবেষকরা এখন পর্যন্ত বলে নাই যে সেখানে এই ভ্যারিয়েন্ট খুব বেশি বিস্তার ঘটেছে। তারা বলছে এখনো বিষয়টি দেখছে। তাদের এখানে সিকোয়েন্স কতগুলি হয়েছে? সেগুলোকে আবার স্টেট হিসেবে ভাগ করলে কত শতাংশ হয়? সুতরাং এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চাইতে জরুরি মাস্ক পরা ও ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।’

জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর’বি) গবেষক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটা নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের ভ্যারিয়েন্ট নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটা নিয়ে তথ্য যেনো কোনোভাবেই ভুল অর্থ প্রকাশের মতন করে মানুষের কাছে দেওয়া না হয় তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিগতভাবেই ভাইরাসের মিউটেশন ঘটবে বা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাবে। এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

তিনি বলেন, ‘সবার কাছে যেহেতু বিস্তারিত তথ্য থাকে না তাই হয়তো বা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়ে থাকে। তবে এটাকে তাদের দোষ হিসেবেও বলা যায় না। কারণ এতে যদি সতর্কতা বাড়ে ও সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানে তবে তার উপকার কিন্তু সবাই পাবে। ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো সবাইকে মাস্ক পরতেই হবে।’

ড. মুস্তাফিজ বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা কমন মিসটেক হচ্ছে এটা ভেবে যে ভ্যাকসিন ১০০ ভাগ কাজ করবে। এমনটা কিন্তু ভ্যাকসিন যারা বানায় তারাও বলে না। মডার্না বা ফাইজার বলেছে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ৫ শতাংশ কিন্তু দিচ্ছে না। এটা আবার ইনডিভিজুয়াল টু ইনডিভিজুয়াল নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের ওপরে নির্ভর করে। দেখা যায় অনেকের ইমিউন রেসপন্স হয় না। এসব মিলিয়ে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নতুন নতুন আসবেই আর এটা নিয়ে গবেষণা করতে হবে সবসময়েই। তবে ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো মাস্ক কিন্তু পরতেই হবে। এর তো কোনো বিকল্প নেই। মাস্ক পরলে মানুষকে ভাইরাস আক্রমণ করার সম্ভাবনা থাকবে না। আর তাই শুধু ভ্যারিয়েন্টের বিপক্ষে না, বলা যায় পুরো ভাইরাসের বিপক্ষে লড়াই করতে মাস্ক পরতেই হবে। একই সঙ্গে ভ্যাকসিনও নিতে হবে। কারণ যদি কেউ সংক্রমিত হয়ে যায় তবে তার ঝুঁকির মাত্রা কমাবে ভ্যাকসিন।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দেশে ভ্যারিয়েন্ট যাই আসুক না কেন সবাইকে মাস্ক পরতে হবে ভাইরাস থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে। একই সঙ্গে হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখতে হবে। মাস্ক না পরে যদি ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কেউ দুশ্চিন্তা করে তবে লাভ কী? কেউ যদি ভাইরাসকে নিজের কাছে প্রবেশের সুযোগ না দেয় তবে ভাইরাস কী পারবে কাউকে আক্রান্ত করতে? সম্ভব না তো। আর তাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে ও মাস্ক পরতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ভ্যাকসিন একদিকে যেমন মানুষের মাঝে ঝুঁকির মাত্রা কমাবে ঠিক তেমনি এর কারণে সংক্রমিতদের হাসপাতালে যাওয়ার সংখ্যাও কমাবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান খসরু বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কমেন্ট করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে সিকোয়েন্সিং ডাটা। যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ সিকোয়েন্স করেছে তা আমরা এখনো পারি নাই। ভাইরাস তো রূপ পাল্টাবেই। এরপরেও সে যতভাবেই তার রূপ পাল্টাক না কেনো সেখান থেকে সুরক্ষা দিবে কিন্তু মাস্ক। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন যারা গ্রহণ করবে তারাও সুরক্ষা পাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে হয়তোবা কম বা বেশি মাত্রায় সুরক্ষা যেই পাক না কেনো ভ্যাকসিন গ্রহীতার ঝুঁকির মাত্রাও কিন্তু কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ভেবে যদি কেউ স্বাস্থ্যবিধি না মানে তবে যে কারো মাঝেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও যদি কেউ মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়ায় তবে তার মাঝেও সংক্রমণ হতে পারে। কারণ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিন পরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে শুরু করে। আর তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময় পর্যন্ত সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এমনকি ভ্যাকসিনের দুই ডোজ নেওয়ার পরও সবাইকে অন্তত আগামী একবছর মাস্ক পরতেই হবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো কোভিড-১৯ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পেতে আমাদের মাস্ক পরার উপরে জোর দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। মাস্ক পরার অভ্যাস যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে তা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবে। একইসঙ্গে ভ্যাকসিন নিতে হবে সবাইকে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে আবার নির্ভার হয়ে স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। মাস্ক তাও পরতে হবে এবং হাত ধোঁয়ার অভ্যাসটাও ধরে রাখতে হবে। আর এগুলো না করে যদি মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েই নিজেকে নিরাপদ ভাবে তবে বিপদ ডেকে আনা হবে।’ কোনো কিছু খাওয়ার আগে ন্যূনতম ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া, একই সঙ্গে মাস্ক ব্যবহার করলেই করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads