• মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮

জাতীয়

মামলা দিয়ে মুনিয়াকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে নুসরাত!

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ০৫ মে ২০২১

পৈত্রিক সম্পত্তির দখল নিয়ে মোসারাত জাহান মুনিয়ার বোন নুসরাত তার একমাত্র ভাই ও চাচার বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতয়ালী থানায় মামলা করেন। সেই মামলা দিয়ে মুনিয়াকে পরিবারের সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলেন নুসরাত। এককভাবে মুনিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেন বোন ও ভগ্নিপতি মিজান। তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন মুনিয়াকে। নিজে কুমিল্লায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকলেও মুনিয়ার থাকার জন্য মাসে লাখ টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করেন গুলশানে। ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে নুসরাত ও তার স্বামী মিজানুর রহমানের এনআইডি কার্ডসহ অন্যান্য তথ্য জমা দেন। কুমিল্লার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ জানান, নুসরাত পরিকল্পিতভাবে মুনিয়াকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। বিষয়টি স্বীকার করেছেন মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ ও চাচা শাহাদাত হোসেন সেলিমও।

মনোহরপুর এলাকার বাসিন্দা ও ফার্মেসী ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, মনোহরপুর উজিরদিঘীর পাড় এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান একজন সম্মানিত লোক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকার সবাই তাকে তার পরিবারকে সম্মানের চোখেই দেখতো। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল নুসরাত। স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই উগ্র নুসরাতকে নিয়ে নানা কথা ছড়ায় এরাকায়। তিনি এক সময় ডাচবাংলা ব্যাংক ঝাউতলা শাখায় চাকরি করতেন। ২০১৮ সালে একজন সহকর্মীর সঙ্গে শহরের ঝাউতলার বাসায় আপত্তির অবস্থায় পুলিশ আটক করে নুসরাতকে। ওই অভিযানে ছিলেন পুলিশের পরিদর্শক সালাহ উদ্দিন। পরে ডাচবাংলা ব্যাংকের ওই শাখার ম্যানেজারের জিম্মায় মুচলেকা রেখে নুসরাতকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে নুসরাত ও এবং ওই যুবককে আলাদা শাখায় বদলি করা হয়। সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে নুসরাত যোগ দেন পদ্মা ব্যাংকে।

নুসতরাতের ভাই শফিকুর রহমান সবুজ বলেন, আমরা তিন ভাই-বোনের মধ্যে মুনিয়া তৃতীয়। তার বয়স ২১ বছর। সে মাধ্যমিক শেষ করে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ণরত ছিল। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে পড়াশোনার জন্য যথাসাধ্য সহযোগিতা করে আসছিলাম। ইতোমধ্যে আসামি নাজমুল করীম চৌধুরী শারুনের সঙ্গে আমার বোনের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে মাঝে মধ্যে আসামি শারুনের সঙ্গে কথাবার্তা ও দেখা সাক্ষাত হতো মুনিয়ার। আমার বোনকে হত্যার আগে তার কাছ থেকেই আমি এসব কথা জেনেছি ও শুনেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় গত দু বছর আগে আমার বোন নুসরাত জাহান (তানিয়া) ও তার স্বামী মিজানুর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গুলশানে ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট ভাড়া করে। সেখানে আমার ছোট বোন নুসরাত আমার অপর ছোট বোন মুনিয়াকে ওই বাসায় অবস্থানের নির্দেশ দেয়। তাদের নির্দেশে মুনিয়া সেখানে অবস্থান শুরু করে। সেই বাসা থেকেই তার লাশ উদ্ধার করে।

নুসরাতের এক আত্মীয় জানান, মুনিয়ার মারা যাওয়ার মাত্র ৬ দিন আগে নুসরাত ও মিজানের বিবাহবার্ষিকী পালন করা হয় কুমিল্লা শহরের একটি রেস্টুরেন্টে। সেখান খরচ হয় ৯৫ হাজার টাকা। যার পুরো টাকাই দেন মুনিয়া। টাকার জন্য নুসরাত ও তার স্বামী মিজান মুনিয়াকে সবসময় চাপে রাখতো। এমনকি মারধরও করতো বলে জানা গেছে। মুনিয়া বিভিন্ন সময় তার বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়গুলো শেয়ার করেছেন।

তবে মুনিয়ার ভাই সবুজ বলেন, মুনিয়ার অবাধ চলাফেরা শুরু থেকেই আমি অপছন্দ করতাম। মুনিয়া কোথায় থাকে, কী করে তার কিছুই আমাদেরকে জানতে দিতো না নুসরাত ও তার স্বামী। এমনকি তার তার মৃত্যুর খবরও শুরুতে দেওয়া হয়নি। ঘটনার সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে আমাকে জানানো হয় মুনিয়া আত্মহত্যা করেছে। মুনিয়ার বিষয়ে নুসরাত ও তার স্বামী অনেক তথ্যই গোপন করে আমার কাছে।

সবুজ বলেন, আমাদের পৈতৃক সম্পত্তির সমান ভাগ নিয়ে নুসরাত আমি, আমার চাচা, চাচিসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করে। মামলার কারণে স্বাভাবিকভাবেই নুসরাত ও মুনিয়ার সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হয়। ওই মামলা এখনো চলছে। ২০১৫ সালে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর মুনিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন নুসরাত।

মুনিয়ার আত্মীয়রা বলছেন, বাবা-মার মৃত্যুর পর এই বোন-ভগ্নিপতিই ছিলেন মুনিয়ার একমাত্র অভিভাবক। টাকার লোভে তারা মুনিয়ার জীবন কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন সেটা একবার জানারও চেষ্টা করেননি। বরং ছোট বোনকে যথেচ্ছাচার করার, যেখানে-সেখানে থাকার স্বাধীনতা দিয়ে বোন-ভগ্নিপতি হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের অর্থ।

মুনিয়ার বোন নুসরাত বলেন, আমার সন্তান না থাকায় আমি মুনিয়াকে আমার নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছি। এখন পারিবারিক অভিভাকত্ব দাবী করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। আমাদের পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও মামলা আছে এটা কুমিল্লার সবাই জানে। আমি আমার ভাই ও চাচার বিরুদ্ধে মামলা করেছি। এর মানে এই নয় যে, মামলাটি ভিন্ন দিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে গত ২৬ এপ্রিল মরদেহ উদ্ধার করা হয় মোসারাত জাহান মুনিয়ার (২১)। এ ঘটনায় তার বোন বাদী হয়ে গুলশান থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন। আর গত ২ মে মুনিয়ার মৃত্যুকে হত্যা উল্লেখ করে আদালতে জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।

মুনিয়ার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলাটি তদন্ত করছেন গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান। তিনি বলেন, মামলার তদন্তে অনেক তথ্যই আসছে। সেগুলো আমরা যাছাই বাছাই করে দেখছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads