• মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
দুশ্চিন্তায় খামারি ও ইজারাদার

ছবি: স্টার মেইল

জাতীয়

দুশ্চিন্তায় খামারি ও ইজারাদার

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ১২ জুলাই ২০২১

পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে ততই যেন চিন্তার ভাঁজ পড়ছে কোরবানির পশুর খামারি, বেপারি এবং হাট ইজারাদারদের কপালে। দুশ্চিন্তায় আছেন যারা কোরবানি করবেন সেসব ক্রেতারাও। তাদের শঙ্কা, গত বছরের মতো এবারও রাজধানীতে পশুর সঙ্কট এবং চড়া দাম নিয়ে। কারণ, গতবছর রাজধানীতে কোরবানির পশু সঙ্কটের কারণে শেষ পর্যন্ত অনেকেই কোরবানি দিতে পারেন নি। আবার শেষদিকে যারা কিনেছেন, তাদের চড়াদামে পশু কিনতে হয়েছে।

এদিকে খামারি ও বেপারিদের শঙ্কা, এবার সরকারি বিধিনিষেধে সীমিত আকারে বসানো হাটে পশুর প্রত্যাশিত দাম পাওয়া নিয়ে। কারণ, গতবছর একই শঙ্কায় অনেক খামারি কিংবা বেপারি ঢাকায় পশু কম নিয়ে আসেন। শুরুর দিকে অনেকে কম দামেই পশু বিক্রি করে দেন। কিন্তু শেষদিকে পশুর সঙ্কটে দাম বাড়লেও তখন আর ঢাকায় পশু নিয়ে আসার মতো যথেষ্ট সময় হাতে ছিল না। এছাড়া, হাটের সংখ্যা কম হওয়ায় অতিরিক্ত পশু রাখা নিয়ে বিপাকে পড়ার ভয়েও অনেকেই ঢাকায় পশু কম আনেন।

অন্যদিকে, মহামারির কারণে শেষ পর্যন্ত হাটগুলোতে কোরবানির পশু বিক্রির ওপর কড়াকাড়ি আরোপ কিংবা বাতিল করা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হাটের ইজারাদাররাও। পাশাপাশি অতিমারির কারণে নানা বিধি-নিষেধ এবং এ নিয়ে মানুষের মাঝে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কারণে অনেকেই অনলাইনে পশু কেনার দিকে ঝুঁকছেন। যার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে হাটগুলোতে। তাই বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে ইজারা নেওয়া হাটগুলো কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে শঙ্কা ইজারাদারদের।

রাজধানীর সবচেয়ে বড় অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট আফতাবনগর হাটের উত্তর সিটি অংশের ইজারাদার মাহবুবুর রহমান শিমুল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব দিয়ে হাটের ইজারা নিয়েছি। এখন জানি না কি হবে। তবে হাটে পশু বিক্রিতে যাতে কোনো জটিলতা তৈরি না হয় সে ব্যাপারে উত্তরের মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন। একইসাথে হাটগুলোতে যাতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।’

এদিকে, এবছর দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কোরবানির পশু রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবছর চাহিদার তুলনায় কোরবানি পশুর জোগান বেশি থাকবে। অধিদপ্তরের হিসেবে, গত বছর ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০টি। এ বছর ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার গরু-মহিষ, ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ছাগল-ভেড়া এবং অন্য ৪ হাজার ৭৬৫টি পশু রয়েছে।

খামারি ও বেপারিরা রয়েছেন নানামুখি শঙ্কায়। তাদের দাবি, একদিকে চাহিদার তুলনায় পশুর যোগান বেশি। এরপর সীমান্ত এলাকা দিয়ে পশু আসলে দাম অনেকটাই পড়ে যাবে। এছাড়া, করোনার কারণে অনেকেই হয়তো কোরবানি দিতে পারবেন না। পাশাপাশি অনলাইনে আগে থেকেই অনেক পশু বিক্রি হয়ে যাওয়া। সবমিলিয়ে পশুর ন্যায্য দাম না পাওয়াসহ নানা জটিল সমীকরণে হিসেব মেলাতে পারছেন না তারা। সাভারের হাসিব অ্যাগ্রোর মালিক মো. হাসিব বলেন, ছোট-বড় ৪৮টি গরু বছর ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করছেন। এতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে পশু বিক্রি করে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চিন্তায় আছি। কারণ একটি গরুর জন্য দিনে ১৪০ থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ টাকা খরচ হয়। প্রতিদিন খাবার হিসাবে গরুগুলোকে খৈল, ভুষি, কুড়ো, ফিড ও কাঁচা ঘাস দিতে হয়। তিনি বলেন, মানভেদে প্রতিটি গরুর দাম ৫০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হবে। এবার গরু বিক্রি করে লাভ নিয়ে শঙ্কায় আছি।’

রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটের ব্যবসায়ী আজমত আলী বলেন, ‘দেশের খামারগুলোয় বর্তমানে পর্যাপ্ত গরু, ছাগল ও মহিষ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর দাম অনেক কম হতে পারে। প্রতি বছর ঈদ ঘিরে ভারত থেকে নানাভাবে গরু আসে। এতে হাটে গরুর দাম কমে যায়। এবার যাতে অন্য দেশ থেকে পশু না আসে, সেদিকে সংশ্লিষ্টদের খেয়াল রাখতে হবে।’

এদিকে, কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন রাজধানী ও আশপাশের নামিদামি খামারিরা। তারা ইতোমধ্যে অনলাইনে অনেক পশু বিক্রি করে ফেলেছেন। অনলাইনের ক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দামেই পশু কিনেছেন বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন অনলাইনে পশু বিক্রি সম্পর্কে বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার অনলাইনে বেশি সাড়া পাওয়া গেলেও গত বছর অনলাইনে ২৭ হাজার পশু বিক্রি হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা মোট বিক্রি হওয়া পশুর ২ শতাংশও নয়।

ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, দেশে ১০টির বেশি গরু থাকা খামারের সংখ্যা ১৪ লাখ। এর মধ্যে কোরবানির জন্য পশু উৎপাদন করেন সাড়ে তিন লাখ খামারি। এসব খামারে মাঝারি আকারের গরুই বেশি উৎপাদন করা হয়। এবার এসব গরুর চাহিদা বেশি থাকবে।

এবার গাবতলী স্থায়ী পশুহাটসহ ২১টি স্থানে কোরবানির পশুহাট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) রয়েছে ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) রয়েছে আটটি। কিন্তু চলমান লকডাউন আরো বাড়লে হাট বসবে কীভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর না বাড়লেও ১৫ জুলাইয়ের আগে হাটে পশু তোলা সম্ভব নয়। আবার কোনোভাবে পশু তুললেও পরে যদি হাটই বাতিল করা হয়, তাহলে খামারি ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের দুর্গতি আরো বাড়বে।

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এখন পর্যন্ত হাট বসার সিদ্ধান্ত আছে। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা জানানো হবে।

একই কথা জানিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের জানান, ২১ জুলাই ঈদ হতে পারে। আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত লকডাউনের সরকারি ঘোষণা আছে। এরপর বৃদ্ধি করা না হলে ১৫ জুলাই থেকে হাট বসতে বাধা নেই। এখন সবই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads