• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

জাতীয়

ধুঁকছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৯ জুলাই ২০২১

করোনার এই সময়ে রাজধানীর হোটেলগুলোর চিত্র করুণ। কঠোর লকডাউনে হোটেল-রেস্তোরাঁ কার্যত বন্ধ। অনলাইনে বিক্রি চালু থাকলেও আগের মতো চাহিদা নেই। জনসাধারণের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিক্রিবাট্টায় এখন মন্দাবস্থা।

মিরপুরের মুসলিম হোটেলে কাজ করেন জসিম শেখ। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘করোনায় হোটেল বন্ধ, কাজকাম নাই। শুইয়ে বইসা কতক্ষণ থাকন যায় কন? খিদা লাগলে তো খাওন লাগবই। কাম না করলে খাওন কে দিব?’

জসিম বলেন, ‘লকডাউনে হোটেলে পার্সেল খাওন দেওন যায়। তয়, এই বেচাকেনায় ঠিকমতো বেতন দেয় না মালিক। বকশিশও পাওন যায় না। মালিক চইল্যাই যাইতে কইছে। তারপরও রইছি।’

রাজধানীতে জসিমের থাকার খরচ নেই। সারা দিন কাজ করে রাতে হোটেলের টেবিলেই ঘুমিয়ে যান। কিন্তু পরিবারে টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির (বিআরওএ) মহাসচিব ইমরান হাসান জানান, শাটডাউনে তাদের ৮০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু টেকঅ্যাওয়ে সেবা চালু থাকায় ২ থেকে ৩ শতাংশ রেস্তোরাঁ তাদের কর্মকা্ল চালু রাখতে পেরেছে। টেকঅ্যাওয়ে বা অনলাইন ডেলিভারি সেবার মাধ্যমে তাদের কোনো ব্যবসা হয়নি বললেই চলে। তিনি জানান, দেশজুড়ে তার ২৩টি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় তিনি সেগুলো চালু করতে পারছেন না। বিআরওএর বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম সরকার রবিন বলেন, ‘করোনার প্রথম ধাক্কায় ৬০ শতাংশ রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। যে ক্ষতি হয়েছে, তা-ই আমরা এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারিনি। ১০-১৫ শতাংশ রেস্টুরেন্ট আর চালু করাই সম্ভব হয়নি। ঢাকার মধ্যে দুই শতাধিক রেস্টুরেন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।’

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির (বিআরওএ) তথ্য বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে ৭০ থেকে ৮০ হাজার রেস্তোরাঁ রয়েছে। এতে কাজ করছেন প্রায় ৩০ লাখের মতো শ্রমিক-কর্মচারী।

এর মধ্যে রাজধানীতে আছে প্রায় ৮ হাজার রেস্তোরাঁ। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আছে সাড়ে চার হাজার। উত্তর সিটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এসব রেস্তোরাঁয় সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

শাটডাউনে ক্রেতা না থাকায় সারা দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ রেখেছেন মালিকরা। আর যে ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ খোলা আছে, তারাও ক্রেতা পাচ্ছে না। এর ফলে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

করোনার এক বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মালিক সমিতির দাবি। দ্বিতীয় ঢেউয়ে এ খাতের ভয়াবহ অবস্থা।

করোনার প্রথম ধাক্কাতেই চাকরি হারিয়েছেন হাজার হাজার রেস্তোরাঁকর্মী। এ খাতে এখন দক্ষ শ্রমিকের অভাব। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির তথ্য বলছে, এ খাতে কর্মরত ৪০ শতাংশ শ্রমিক অন্য পেশায় চলে গেছেন।

তাই নতুন করে করোনার সেকেন্ড ওয়েভের ফলে আবারো নিজেদের ব্যবসা ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত রেস্টুরেন্ট মালিক ও কর্মীরা।

বিআরওএর কর্মকর্তা রবিন বলেন, ‘বহু রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ায় অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। প্রণোদনা তো দূরের কথা, একটি টাকাও পাননি তারা। শ্রমিকরা কোনো ত্রাণও পাননি।’

প্রণোদনার কোনো টাকা এ খাতে দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের জন্য কিছু দেয়ার দাবি উঠেছে বারবার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল করা হলেও সেখানে হোটেল, মোটেলের বিষয় ছিল। রেস্তোরাঁ খাতের উল্লেখ ছিল না।

রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, গত বছরের জুলাই থেকে রেস্টুরেন্টগুলো আবার চালু করার পর থেকে তারা প্রায় ৬০ শতাংশ লোকসান পুষিয়ে নেন। কিন্তু সাম্প্রতিক করোনার প্রকোপ ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যবসা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। রেস্টুরেন্ট মালিকরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আওতায় স্বল্প সুদে ঋণের আবেদন করেছেন।

বিআরওএ’র তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রথম ঢেউয়ে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে ৩০ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা না হলেও প্রায় ৯৯ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত। সব মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে এ খাত।

পর্যটন খাতের হোটেল-মোটেল-থিম পার্কের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য মূলধন সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৫ জুলাই ১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

৪ শতাংশ সুদে ১ বছর মেয়াদে এই ঋণ সুবিধা নিতে পারবেন পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা। সুদের হার ৮ শতাংশ হলেও সরকার ৪ শতাংশ ভর্তুকি দেবে।

এ সময়ে অনলাইন ফুড ডেলিভারি যারা দিচ্ছেন, তারা কিছুটা ব্যবসা করতে পারছেন। সেটার হারও ২ বা ৩ শতাংশ।

এম রেজাউল করিম সরকার রবিন বলেন, ‘রেস্টুরেন্ট বন্ধ করলে পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত। অনলাইন প্ল্যাটফরমদের ব্যবসা ভালো করার জন্য একটা চক্র কাজ করছে। অনলাইনে ১ বা ২ শতাংশ ব্যবসা চালু আছে। কিন্তু তারা আদৌ সরকারকে ট্যাক্স দেয় কি না তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু এ শাটডাউনেও তাদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা আরো ক্ষতির মুখে পড়ছে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads