• সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

জাতীয়

দ্বিতীয় ডোজে অ্যান্টিবডি বৃদ্ধি দশগুণ

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ০৩ আগস্ট ২০২১

করোনার নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকা (ভ্যাকসিন) কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এ নিয়ে চলছে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের গবেষণা। সম্প্রতি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মোটামুটি নিশ্চিত, যে পূর্ণ ডোজ টিকা নিলে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে। এতে কমে সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি। তবে এবার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর প্রমাণ পেয়েছে যে, মানবদেহে মাত্রা দুই ডোজ টিকাই কমাতে পারে মৃত্যুঝুঁকি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপাতত করোনা মহামারি থেকে সুরক্ষা পেতে দেশের সবাকেই টিকার আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই। সেক্ষত্রেও দেশের এ বিশাল জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজন পড়বে প্রচুর পরিমাণ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা। বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় করে এতো ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে আমদানি করা আমাদের দেশের জন্য সম্ভব নয়। তাছাড়া, এ টিকার মেয়াদকালও সর্বোচ্চ এক বছর। এ অবস্থায় দেশেই টিকা উৎপাদনের জন্য পরামর্শ দিলেন তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশ উৎপাদিত গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকা উৎপাদনে বড় ধরনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তাই ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকারি উদ্যোগে ‘বঙ্গভ্যাক্স’ এর উৎপাদন প্রসারের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার অধ্যাপক ও যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ভ্যাকসিন অ্যাডভাইজারি প্যানেলের সদস্য ড. পল অফফিট বলেছিলেন, করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ ভাইরাস নিস্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ টিকার তুলনায় ১০ গুণ অ্যান্টিবডি সৃষ্টিতে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা সেলুলার ইমিউনিটির সৃষ্টি করে এবং এর ফলে শুধু যে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা পাওয়া যায়, তা-ই নয়, নতুন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধেও ভালো সুরক্ষা পাওয়া যায়।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের এক সমীক্ষায় পূর্ণ ডোজ টিকায় মৃত্যুঝুঁকি কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুতরাং করোনাভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইন হয়তো বেশি দ্রুত ছড়াতে পারে বা খুব দ্রুত রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে। কিন্তু টিকা নেওয়া থাকলে সুরক্ষা পাওয়া যাবেই। আর সংক্রমণ ঘটলেও এর তীব্রতা তেমন বেশি হবে না। হয়তো বাসায় নিজ ব্যবস্থাপনায় আইসোলেশনে কয়েক দিন থাকলে সুস্থ হয়ে উঠা যাবে। অবশ্য নিয়মিত পালস-অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা দেখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সমীক্ষায় বিষয়ে আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনাভাইরাসের দুই ডোজ টিকা যারা নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের সমস্যা, হাসপাতালে ভর্তির হার এবং মৃত্যুঝুঁকি টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কম দেখা গেছে। গত মে ও জুন মাসে দেশে যারা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের জাতীয় তালিকা থেকে দ্বৈবচয়ন ভিত্তিতে ১ হাজার ৩৩৪ জনকে নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়। তাদের সবার বয়স ছিল ৩০ বছরের বেশি।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৯২ জন কোনো টিকা নেননি। বাকি ৭৪২ জন অন্তত এক ডোজ টিকা নিয়েছেন। আর অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশ টিকা নিয়েও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। টিকার দুই ডোজ নিয়েছেন এমন ৩০৬ জন টিকা নেওয়ার অন্তত ১৪ দিন পর করোনায় আক্রান্ত হন। টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতায় ভুগেছেন ১১ শতাংশ। আর দুই ডোজ টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার ছিল ৪ শতাংশ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা ভুগছিলেন এ ধরনের রোগীদের মধ্যে যারা টিকা নেননি, তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতায় ভোগার হার দেখা গেছে পূর্ণ টিকা গ্রহণকারীদের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।

দুই ডোজ টিকা নিয়েও যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৭ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। আর যারা টিকা নেননি তাদের মধ্যে এই হার ২৩ শতাংশ। আগে থেকেই বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে ভুগছিলেন, তাদের মধ্যে টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের ১০ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অথচ টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে এই হার ৩২ শতাংশ।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের ১৯ জনকে আইসিইউতে নিতে হয়েছে, যা ৩ শতাংশ। আর যারা দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৩ জনকে আইসিইউতে যেতে হয়েছে, যা ১ শতাংশের কম। টিকা নেননি এমন আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ শতাংশ বা ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে । অন্যদিকে টিকা নিয়েছেন এমন ১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) পরিচালিত ‘হেমাটোলজিক্যাল প্যারামিটারস অ্যান্ড অ্যান্টিবডি টাটরে আফটার ভ্যাকসিনেশন অ্যাগেইনস্ট সার্স-কোভিড-২’ শিরোনামের এক গবেষণায় টিকা গ্রহণকারী ৯৮ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডির তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সোমবার বিএসএমএমইউতে এ গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও গবেষক দলের প্রধান শারফুদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, যাঁরা আগেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের শরীরে তুলনামূলক বেশি অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। যে ২ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি, তাঁরা জটিল রোগে আক্রান্ত, অনেক বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম।

তিনি জানান, ওষুধ প্রস্তুতকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত এবং ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি করোনার টিকা গ্রহণকারী ২০৯ জনের ওপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়।

যদিও কোন ভ্যাকসিনটি সেরা, এটি এখনো বলার সময় হয়নি। গত বছরের শেষ দিকে উল্লেখিত চারটি ওষুধ কোম্পানি ঘোষণা করে, তাদের ভ্যাকসিন কাজ করছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ভ্যাকসিনই ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

বিএসএমএমইউ সূত্র জানায়, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে টিকা নিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ পুরুষ এবং অর্ধেকের বেশি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মধ্যে ৩১ শতাংশের আগে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। অর্ধেকের বেশি অংশগ্রহণকারী আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানিসহ অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন। তবে এসব রোগ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিকা গ্রহণের পর অ্যান্টিবডি তৈরিতে কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। ৪২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর টিকা গ্রহণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সামান্য জ্বরসহ মৃদু উপসর্গ ছিল। রক্ত জমাটবাঁধা বা এ রকম অন্য কোনো জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গবেষণাকালে পরিলক্ষিত হয়নি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির কোনো সম্পর্কও পাওয়া যায়নি।

দেশে করোনা বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, করোনা সংক্রামণ ঝুঁকি থেকে একমাত্র টিকাই কমাতে পারে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রমাণিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশেও প্রমাণ মিলল। তবে দেশে টিকা তৈরি কোনো অলীক কল্পনা না। বাংলাদেশে তো বিভিন্ন রোগের টিকা হচ্ছে। দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তৈরি করছে। তবে ভারতে করোনা টিকা উৎপাদন করছে সেরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেক।

তিনি আরো বলেন, ভ্যাকসিন সক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশের সামনে এখন বিশাল সুযোগ। টিকা যদি নিজেরা করতে পারি শুধু আমরা না, মিয়ানমার, ভুটানেও দিতে পারব। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকেও জানিয়েছি। অন্য দেশের আবিষ্কৃত টিকা ফর্মুলা এনেও তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিশুদের টিকা, করোনা টিকা বা অন্য মহামারির টিকা তৈরির সক্ষমতা যেন তৈরি হয়। সরকার যেন গ্রহণযোগ্য ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি (এনআরএ) গঠন করে। ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগ নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাপোর্ট দিতে হবে। উদ্যোগ সরকারি বা বেসরকারিভাবেও হতে পারে। ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে পারে সরকার। অদূর ভবিষ্যতে আমরা নিজেরা যেন সহজে টিকা তৈরি করতে পারি।

এবিষয়ে সিনেসিস হেলথের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, এমনটা হলে খুবই আশাব্যঞ্জক বিষয় হবে। বেসরকারি উদ্যোগে অলরেডি গ্লোব বায়োটেক শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত হয়েছে, করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদনে যাচ্ছে, ট্রায়ালে যাচ্ছে। এখন সরকারকে এগিয়ে আসা দরকার সাপোর্ট দেওয়ার জন্য।

ভ্যাকসিন সক্ষমতার আগে জনস্বাস্থ্য কাঠামো ঠিক করার তাগিদ দিয়ে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভ্যাকসিন যারা তৈরি করছে, তাদের ভ্যাকসিন তৈরির ক্যাপাসিটিতে সীমাবদ্ধতা আছে। দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে ভ্যাকসিন সক্ষমতা আমাদের দরকার। তবে ভ্যাকসিন সক্ষমতার আগে জনস্বাস্থ্য কাঠামো ঠিক করতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে মহামারি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads