• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

জাতীয়

শহরাঞ্চলে দরিদ্র ১৯ শতাংশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

মহামারি করোনার ভয়াল থাবায় বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে নীরব অর্থনৈতিক মন্দা। যার ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশও। গত দেড় বছর ধরে চলা এই মহামারি মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও ব্যবসা বাণিজ্য থমকে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। এতে বাড়তে থাকে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ১৯ শতাংশ মানুষই দরিদ্র্য। তবে তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। আর গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হলেও সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আছে ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামে দারিদ্র্য হারের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নে চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক ব্যবহারে দারিদ্র্যের হার ১২ শতাংশ কমে ২৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এর আগে বেসরকারি সংগঠন পিপিআরসি ও বিআইজিডির গবেষণায় উঠে আসে, করোনাকালে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে কমপক্ষে ১৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ। ভাগ্যের অন্বেষণে গ্রাম থেকে শহরমুখী হয় মানুষ। কিন্তু করোনা সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ, যোগাযোগের ব্যয় এবং অন্য নানামুখী ব্যয় মেটাতে না পেরেই এসব মানুষ ঢাকা ছেড়েছে।

আর বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ বাংলাদেশে দারিদ্র্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এই সুরক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এবং ক্রমাগত দরিদ্র পরিবারের উপকার করছে। সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে গ্রহণ এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার নামিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামকেন্দ্রিক। অথচ শহরে জনসংখ্যার ৫ জনের মধ্যে ১ জন দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি শহরের অর্ধেক পরিবারই দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একারণে গ্রামীণ এবং শহর এলাকায় সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পুনর্বিন্যাসের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা একটি স্বচ্ছ জরিপ করে ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেস’ তৈরির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগীর তালিকা করতে পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অব্যাহত বিনিয়োগ এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা বিতরণসহ বিদ্যমান কাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজার ডানডান চেন বলেন, গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে চলেছে। এখন এটি দেশের প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে তিনটিতে পৌঁছেছে। কোভিড-১৯ মহামারি আরো জোরদার, দক্ষ এবং অভিযোজিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে। যথাযথ লক্ষ্য ঠিক করে এই কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশটিতে দারিদ্র্যের হার কমাতে সফল হবে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ২ দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে; যা এই ধরনের আয়ের দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে, কিছু ঝুঁকি-গোষ্ঠী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব কর্মসূচিতে দরিদ্র তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া ‘প্রতি আটজন দরিদ্র ব্যক্তির মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। এরপরও, দরিদ্র শিশুরা সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ পায়। এই ব্যয় আরো কার্যকর হবে, যদি বরাদ্দগুলো বিভিন্ন স্তরের দরিদ্রদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া যায় এবং সেভাবেই কর্মসূচিগুলো হাতে নিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালাইন কদুয়েল বলেন, শৈশবে বিনিয়োগ একটি শিশুকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আরো উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করে। এভাবে প্রজন্ম ধরে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব। এবিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কর্মসূচি নিতে হবে।’

সুবিধাভোগীরা যাতে সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দ্রুত পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শও রয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, গভর্নমেন্ট টু পারসন (জিটুপি) ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) বাড়াতে হবে। সরকারের কোষাগার থেকে তহবিল সুবিধাভোগীর কাছে স্থানান্তরে প্রায় দুই মাস সময় লাগে, জিটুপি পদ্ধতিতে এটি ১০ দিনে নামিয়ে আনতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, সেসময় দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। এরপর দারিদ্র্যের হার নিয়ে আর কোনো নতুন তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিএস।

তবে গত ২৩ জুন ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণা তথ্য প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের-সানেম বলেছে, করোনাভাইরাস মহামারির অর্থনৈতিক প্রতিঘাতে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে।

এরআগে ১০ জুন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি বলেছিল, করোনার কারণে আয় কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

কিন্তু অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম সিপিডি, সানেমসহ অন্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর দারিদ্র্যের হার নিয়ে দেওয়া তথ্য প্রত্যাখ্যান করেন।

এরআগে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিআইজিডি করোনাকালে আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। দুটি প্রতিষ্ঠান গত এপ্রিলে এক জরিপের মাধ্যমে মহামারির সময়ে আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর একটি জরিপ করে। তখন তারা বলেছিল, এপ্রিলে তারা যে নতুন দরিদ্রশ্রেণি সৃষ্টির কথা বলেছিল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর পর তাদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত ২০ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত চলে এ জরিপ। এতে অংশ নেয় ৭ হাজার ৬৩৮ পরিবার। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি শহরের পরিবার, ৪৩ শতাংশের বেশি গ্রামের পরিবার এবং ১ দশমিক ২২ শতাংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবার।

ওই জরিপে দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এপ্রিল মাসে ৬ শতাংশ শহুরে দরিদ্র মানুষ শহর থেকে গ্রামে চলে যায়। জুনে এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। জুন মাসে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

এছাড়া ফেবরুয়ারি থেকে জুন মাসে শহুরে দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে ৪৩ শতাংশ, গ্রামের মানুষের আয় ৪১ শতাংশ আর পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় কমেছে ২৫ শতাংশ। ফেবরুয়ারিতে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে ১৭ শতাংশ জুনে এসে কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাদের মতে, করোনাকালে এক নতুন দরিদ্র শ্রেণি তৈরি হয়েছে। এপ্রিল মাসে তাদের সংখ্যা ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। জুনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন চালু হয়, তখন এ সংখ্যা সামান্য কমে হয়েছে ২১ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্ব ব্যাংকের জরিপে এই দরিদ্রের সংখ্যা নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads