• শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৭

জাতীয়

হুমকির মুখে শিল্প-উৎপাদন

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

দেশে ক্রমেই প্রকট হচ্ছে গ্যাস সংকট। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বিভিন্ন শিল্প ও কলকারখানার উৎপাদন। এ সংকটের কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে চার ঘণ্টার জন্য সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর শুরু হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বাসা-বাড়িতেও গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে বিভিন্ন সেক্টরে। সবচেয়ে বেশি চিন্তিত শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাতগুলো।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) জানিয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাবে সিরামিক কারখানাগুলোতে দিনে প্রায় তিন কোটি টাকার উৎপাদন কম হচ্ছে। পাশাপাশি কারখানায় পোড়ানোর অপেক্ষায় থাকা বিপুল পরিমাণ সিরামিক পণ্য নষ্ট হচ্ছে। সঙ্কটের সমাধান চেয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে বিসিএমইএ।

সরকার দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি করছে। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক মাস ধরে এলএনজি আমদানি কম হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমেছে। যার প্রভাব পড়েছে সরবরাহে। জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান জানান, দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা  খোলাবাজার থেকে এলএনজি না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে, দেশীয় কূপগুলো থেকে কম গ্যাস মিলছে। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম হওয়ায় সঙ্কট হচ্ছে। তবে ভাসমান এবং স্থলভাগে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শেষ হলে সংকট কেটে যাবে বলে জানান তিনি। এ ব্যাপারে পিডিবি চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন জানান, গ্যাসের সরবরাহ কমলে হয়তো তাদেরকে তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। এতে খরচও বাড়বে বলে জানান তিনি। তবে বর্তমানের সংকট কীভাবে মিটবে সে বিষয়ে কোন পক্ষ থেকে সদুত্তর মিলছে না। গত সপ্তাহে বিসিএমইএ এর নির্বাহী সচিব জাহেদী হাসান চৌধুরী স্বাক্ষরিত তিতাসকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, গ্যাস-সংকটের কারণে সিরামিক খাতের তৈজসপত্র, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ভালুকা এবং গাজীপুরের মাওনা, শ্রীপুর, জয়দেবপুর, ভবানীপুর ও ভাওয়াল মির্জাপুর এলাকার কারখানাগুলোতে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতাভেদে ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ারিংস-প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে গ্যাসের চাপের ইউনিট) পর্যন্ত লোড অনুমোদন করা থাকলেও গ্যাসের চাপ কখনো কখনো ১-২ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, গ্যাস-সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না কারখানাগুলো। তাতে রপ্তানি ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অপ্রতুল গ্যাস সরবরাহের কারণে ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার কারখানার চুল্লি বন্ধ থাকছে। ফলে এসব এলাকায় প্রতিদিন তিন কোটি টাকার সিরামিক তৈজসপত্র, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যারের উৎপাদন কম হচ্ছে এবং পোড়ানোর অপেক্ষায় থাকা সিরামিক পণ্য নষ্ট হচ্ছে।

এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর নেতারা পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অনেক বস্ত্রকলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, গ্যাসের চাপ ১ দশমিক ৫০ পিএসআইয়ে নেমে গেছে। এতে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার ৭০ শতাংশই কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাতে বস্ত্র খাতের গড় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এলএনজি টার্মিনাল করা হয়েছে। সেখানে বড় বড় জাহাজ ভিড়তে পারে। তারপরও কারখানাগুলো গ্যাস-সংকটে ভুগছে। সার কারখানায় গ্যাস দেওয়ার কারণে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না।’ তিনি দ্রুত জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানান।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। গত সপ্তাহে পেট্রোবাংলা মোট সরবরাহ করে ৩১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের প্রথম দিকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বিশেষ করে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অচলাবস্থার কারণে বর্তমানে তা কমে ২৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২৪২ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে।

বর্তমানে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে ২৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মিলছে। জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০২২-২৩ সালে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে গ্যাস উৎপাদন ১৮.৪ কোটি ঘনফুট কমতে পারে। ২০২৩-২৪ সালে দৈনিক উৎপাদন ৪৩.৫ কোটি ঘনফুট কমে যেতে পারে। এ সময় শেভরনের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকার এলএনজির আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। কাতারের রাস লাফান লিকিউফাইড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানির গ্যাস ১৫ বছর চুক্তির আওতায় কিনছে পেট্রোবাংলা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তির পর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১১৩টি জাহাজে এলএনজি সরবরাহ করেছে রাস গ্যাস। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ১১টি, ২০১৯-এ ৪৩টি, ২০২০-এ ৪০টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৯টি জাহাজ এসেছে। এ বছর আরো ২১টি জাহাজে এলএনজি সরবরাহ করার কথা রাস গ্যাসের।

এদিকে, গ্যাস সংকটের মাঝেও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বদ্ধপরিকর  সরকার। এ কারণে বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ চালু রাখতে সিএনজি পাম্প স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সারাদেশে সন্ধ্যা ৬টা থেকে চার ঘণ্টার জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, যা কার্যকর শুরু গত রোববার থেকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads