• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮
দিনে ভাঙছে ১৪ সংসার

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

দিনে ভাঙছে ১৪ সংসার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

আমেনা বেগম (ছদ্মনাম), ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সৌরভকে (ছদ্মনাম)। তাদের সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে। বিয়ের বয়স প্রায় ১৫ বছর। কিন্তু মাস ছয়েক আগে সৌরভ আরেক নারীকে বিয়ে করেন। এজন্য স্বামী সৌরভকে তালাক দিয়েছেন স্ত্রী আমেনা।

নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এই নারী বলেন, ভালোবেসে সৌরভকে বিয়ে করেছিলাম। পরিবারের মত ছিল না। মাস ছয়েক আগে জানতে পারি, তিনি আরেকটি বিয়ে করেছেন। তাই বাধ্য হয়ে তাকে তালাক দিয়েছি। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিনযাপন করছি।

চট্টগ্রাম নগরে অনেক দম্পতির ক্ষেত্রেই ঘটছে বিয়েবিচ্ছেদের ঘটনা। বিয়েবিচ্ছেদ ঘটেছে- এমন অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছে। এমনই একজন কোহিনূর আক্তার (ছদ্মনাম)। চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তিন লাখ টাকা দেনমোহরে (কাবিন) এ নারী বিয়ে করছিলেন আমীর হোসেন নামের একজনকে। বিয়ের পর দীর্ঘদিন বাবার বাড়িতেই ছিলেন। আমীর হোসেনও গার্মেন্টসে চাকরি করতেন।

কোহিনূর বলেন, প্রথমদিকে আমার বেতনের সব টাকা নিয়ে নিতেন স্বামী। মাস ছয়েক আগে তাকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিই। তাই তিনি আর কোনো খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না। এমনকি স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাড়িতেও নিচ্ছেন না। তাই বাধ্য হয়ে স্বামীকে তালাক দিয়েছি।

বিয়েবিচ্ছেদ ঘটানো আরেক নারী তিথি আক্তার (ছদ্মনাম)। কাজ করছেন চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন না যেতেই জানতে পারেন স্বামী মাদকাসক্ত।

তিনি বলেন, স্বামীকে মাদক থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। মাদক সেবন করে বাড়িতে এসে প্রায়ই আমাকে মারধর করতেন। বাধ্য হয়ে তাকে তালাক দিয়েছি।

চলতি বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে বিয়েবিচ্ছেদ চেয়ে সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতে আবেদন করেছেন তিন হাজার ৫৭২ জন। সেই হিসাব করলে দিনে গড়ে ১৪টি সংসার ভাঙার আবেদন পড়েছে এ আদালতে। আবেদনের পর সমঝোতার মাধ্যমে সংসার টিকে যায়, এমন উদাহরণ খুবই কম। আবেদনকারীদের অধিকাংশই নারী।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস বলেন, নানা কারণে সংসার ভাঙছে। উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্ত-সব ক্ষেত্রেই সংসার ভাঙার ঘটনা ঘটছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিয়েবিচ্ছেদের প্রবণতা বেশি।

তিনি বলেন, মাদকাসক্তি, মোবাইল ফোনে আসক্তি, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের কারণেই মূলত বিয়েবিচ্ছেদের হার ও প্রবণতা বাড়ছে। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাবেও বিয়েবিচ্ছেদ ঘটছে। এছাড়া, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বিয়ে ভাঙার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। বরপক্ষের যৌতুকের চাপ ও কনেপক্ষের দেনমোহরের চাপও এর জন্য দায়ী।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতে জমা দেওয়া বিয়েবিচ্ছেদের আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত হোক আর নিম্নবিত্ত হোক, সব আবেদনের ভাষা প্রায় একই। নারীদের বিয়েবিচ্ছেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক বা দ্বিতীয় বিয়ে, মতের বনিবনা না হওয়া, শাশুড়ির সঙ্গে দ্বন্দ্ব, স্বামীর মাদকাসক্তি, চাকরি করতে না দেওয়া বা স্বাবলম্বী হতে বাধা দেওয়া ইত্যাদি।

পুরুষের বিয়েবিচ্ছেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, অন্য পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, সংসারে মানিয়ে না চলা, স্বামীর কথা না শোনা, যৌথ পরিবারে থাকতে না চাওয়া, সন্তান না হওয়া, শ্বশুর ও স্বামীর নিকটাত্মীয়ের প্রতি সম্মান না দেখানো ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরের লোভেও বিয়ের কয়েক মাস না যেতেই স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতে ২০২০ সালে সালে বিয়েবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন চার হাজার ৮৫৪ জন। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল চার হাজার ৫৫০। ২০১৮ সালে চার হাজার ৩৩১, ২০১৭ সালে তিন হাজার ৯২৮,  ২০১৬ সালে তিন হাজার ৯৬১, ২০১৫ সালে তিন হাজার ৪৮৬ ও ২০১৪ সালে তিন হাজার ২৬৮ জন বিয়েবিচ্ছেদের আবেদন করেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতের তালাকের নোটিশগুলোর ৫৫ শতাংশের বেশি ছিল স্ত্রীদের পক্ষ থেকে। অর্থাৎ নারীরাই বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বেশি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

জানা গেছে, বিয়েবিচ্ছেদে ইচ্ছুক স্বামী বা স্ত্রীকে তার সিদ্ধান্তের কথা লিখিতভাবে (তালাক নোটিশ) প্রথমে সিটি করপোরেশনের মেয়রকে জানাতে হয়। যাকে তালাক দিতে ইচ্ছুক তাকেও সেই নোটিশ পাঠাতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর মেয়র নোটিশটি সালিশি আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালতে মেয়রের পক্ষে নিযুক্ত থাকেন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম-জেলা জজ)। আদালত বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর করার আগে স্বামী-স্ত্রী দুই পক্ষকে তিন মাসে তিনবার নোটিশ দেন। দুই পক্ষের কোনো পক্ষ বা দুই পক্ষই হাজির হলে সমঝোতার চেষ্টা করেন আদালত। কিন্তু সমঝোতা না হলে আইন অনুযায়ী ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ( যুগ্ম-জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস আরো বলেন, করোনাকালে বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। এর অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। করোনার কারণে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে হয়তো একে অন্যের দোষ-ত্রুটি মেনে নিতে পারছেন না। এ কারণেও  বিয়ে ভাঙছে। বাস্তবতা হলো মানুষের মধ্যে সহনশীলতা অনেক কমে গেছে। অনেক সময় তালাকের আবেদন করলেও দুই পক্ষকে বুঝিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেটার হার খুবই কম।

করোনাকালে বিয়েবিচ্ছেদ বাড়ছে মূলত চারটি কারণে, এমনটিই বলছেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, অর্থসংকট, বাল্যবিয়ে, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে সমাজে বিয়েবিচ্ছেদ বাড়ছে। এ প্রবণতা সামনে আরো বাড়বে বলে  আশঙ্কা করছেন এ সমাজবিজ্ঞানী।

তিনি বলেন,  দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। করোনাকালে শহর থেকে মানুষ গ্রামে ছুটছে।  সেখানে গিয়ে মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সের আগেই বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অল্প বয়সে সংসার জীবনে মানিয়ে নিতে পারছে না মেয়েরা। ফলে বিয়েবিচ্ছেদ বাড়ছে। মেয়েরা বাল্যবিয়ের কারণে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

তিনি আরো বলেন, দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঠিক ব্যবহার না করে তার অপব্যবহার বাড়ছে। এ মাধ্যমে একজন একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে ও সংসার ভেঙে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত হয়ে মিথ্যা পরিচয়ে বিয়ে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে গিয়ে তা মিলছে না। ফলে অবিশ্বাস জন্ম হচ্ছে, বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতায় বিয়ে ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে।

এ সমাজবিজ্ঞানী বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো দিন দিন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বিয়েবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। যুক্তির চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগের কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেকে। তা ছাড়া নারীরা আগের চেয়ে শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। সংসারে ভূমিকা ও অধিকারের স্বীকৃতি চান তারা। কিন্তু অনেক পরিবারেই স্ত্রীদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা দিতে চান না স্বামীরা। তখনই দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়। এরই পরিণতি বিচ্ছেদ।

তিনি বলেন, কোনো একটি বিশেষ কারণে বিয়েবিচ্ছেদ হচ্ছে তা বলা যাবে না। করোনাকালে কর্মসংস্থানের সংকট, চলাফেরার সংকট, দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থাকার কারণে মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক সংকট একসঙ্গে হয়ে মানুষের মধ্যে একাকীত্ব তৈরি করেছে। দেখা যাচ্ছে বিয়ে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কয়েকদিন পরই তা ভেঙে যাচ্ছে।

বিয়েবিচ্ছেদের হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায়-এ প্রশ্নের জবাবে সমাজবিজ্ঞানী ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। পরিবারগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। সরকারি ও সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো নিয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে বিয়েবিচ্ছেদের আগে দুই পক্ষকে বুঝিয়ে বিচ্ছেদ থেকে ফিরিয়ে আনা যায়, যাতে কাউন্সিলিং করে দুজনের বোঝাপড়ার দূরত্ব কমিয়ে আনা যায়।

তিনি মনে করেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাউন্সিলর নিয়োগ করে কাউন্সিলিংয়ের কাজটি করা যেতে পারে। কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে বিয়েবিচ্ছেদের সংখ্যা কমে আসবে বলেও মনে করেন এ সমাজবিজ্ঞানী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads