• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিন চ্যালেঞ্জ

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিন চ্যালেঞ্জ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৩ অক্টোবর ২০২১

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাই করে সে সময়। এতে বেকারত্বের হার বাড়তে থাকে। মহামারির নিয়ন্ত্রণে আসায় ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে অর্থনীতির চাকা। সেই সঙ্গে আশা জাগাচ্ছে কর্মসংস্থান খাতও। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

জানা গেছে, করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর দেশে সবকিছু প্রায় স্থবির ছিল। কিন্তু মানুষের ব্যয় থেমে থাকেনি। এতে ধনী ও দরিদ্রে মাঝে আরো বৈষম্য সৃষ্টি হয়। একমাত্র নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমেই এই বৈষম্য ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, লিঙ্গসমতা নিশ্চিতের পাশাপাশি অন্যান্য চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর যে সুযোগ রয়েছে, তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলছে, করোনা সংকটে কাজ হারিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বাড়ছে দারিদ্র্য। তাই নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমিয়ে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ, সাসটেইনেবল ডেভেলমেন্ট গোলের (এসডিজি) সময়সীমা ২০৩০ সাল। তার ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে দুটি হলো দারিদ্র্য নিয়ে। প্রথমত, দারিদ্র্য শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। আর কোনো মানুষ অভুক্ত থাকতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে প্রায় ৪১ ভাগ মানুষ। ২০১৯ সালে এটা ছিল ২০.৫ ভাগ।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির হিসেবে, গতবছরের ২৬ মার্চ থেকে এবছরের ৩০ মে-র মধ্যে সাধারণ ছুটির সময় তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘লুজিং লাইভলিহুড : দ্য লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্টস অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন শহরাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ কর্মী। গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান হারানোর হার ৪১ শতাংশ। এই মহামারিতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো শুধু বাংলাদেশ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোও। অর্থনীতির নিষ্ক্রিয়তায় এসব দেশে সংকুচিত হয়ে এসেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, করোনার কারণে কর্মসংস্থান হারানোর দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে ঢাকা বিভাগ। মহামারির কারণে এ বিভাগের শহরগুলোয় প্রতি চারজন কর্মীর প্রায় তিনজন (৭৪ শতাংশ) চাকরি হারিয়েছেন। এ বিভাগের গ্রাম অঞ্চলে চাকরি হারিয়েছেন ৪৫ শতাংশ।

শহরাঞ্চলে কর্মসংস্থান হারানোর দিক থেকে ঢাকা বিভাগের পরই রয়েছে সিলেট বিভাগ। এ বিভাগের শহরাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ কর্মী করোনায় চাকরি হারিয়েছেন। বিভাগটির গ্রামাঞ্চলে চাকরি হারিয়েছেন ৩৯ শতাংশ মানুষ। বরিশাল বিভাগের শহরাঞ্চলে ৫৪ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৪৭ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

এর বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগের শহর ও গ্রামাঞ্চলের কর্মীদের মধ্যে যথাক্রমে ৬৩ ও ৪৪ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগের শহরাঞ্চলে ৫৯ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৩৯ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগের শহরাঞ্চলে ৬১ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৩৫ শতাংশ এবং রংপুর বিভাগের শহরাঞ্চলে ৫৮ ও গ্রামাঞ্চলে ৩৭ শতাংশ মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা পরিস্থিতি দারিদ্র্য বাড়াবে। কারণ এ অঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। করোনা মহামারি তাদের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় খাবারের মূল্যবৃদ্ধিরও ঝুঁকি রয়েছে। দেশগুলো বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনের ভারসাম্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে ব্যক্তিপর্যায়ের ভোগ ব্যাপকভাবে কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলো। ফলে সামনের দিনগুলোয় আরো মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, মানুষ কাজ হারিয়েছে, আয় কমে গেছে, শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে, সবকিছু মিলিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনে দেড় দশকে যে অর্জন তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। এ কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য জিরো লেভেলে নামিয়ে এনে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বিআইডিএসের সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়, দেশে এখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশি। কিন্তু মহামারিতে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এখন দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটিরও বেশি। ১৩ ভাগ মানুষ ফরমাল সেক্টর থেকে চাকরি হারিয়েছেন। দারিদ্র্য বেড়েছে ২৫.১৩ ভাগ। এই দারিদ্র্য বাড়ার হার শহরে বেশি। ১৫-২০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্য রেখার খুব কাছে অবস্থান করে। সেই সংখ্যাটাও তিন কোটির মতো। তারাই এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

বর্তমানে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। তাই ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা। করোনা মহামারি সেই সংকটকে মহাসংকটে রূপ দিয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে কিভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার জন্য দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আর অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এই পরিকল্পনা এমন সময়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যখন দেশ মহামারির কারণে আর্থসামাজিক অবস্থা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন, করোনায় কাজ হারিয়ে মানুষ দরিদ্র অবস্থার মধ্যে পড়ছে। তাই শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, মানুষের কাজের ব্যবস্থাও করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ডা. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, মানুষ শুধু কাজ হারিয়ে দরিদ্র হচ্ছে না। এর সঙ্গে পেশারও পরিবর্তন হচ্ছে। তাই করোনা পরবর্তী শিল্পের ধারণা পাল্টে যাবে। উৎপাদন খাতে পরিবর্তন আসবে। নতুন ধরনের কাজ ও পেশার সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads