• মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জাতীয়

ওভারলোডে নষ্ট হচ্ছে সড়ক

  • সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
  • প্রকাশিত ১৫ অক্টোবর ২০২১

বিশাল অঙ্কের অর্থব্যয়ে নির্মাণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে যাচ্ছে দেশের অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়ক। এজন্য যানবাহনের ওভারলোডিংকে অন্যতম কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সেইসাথে পরিকল্পনা প্রণয়নে সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি, নিন্মমানের নির্মাণ কাজ, ঠিকাদার সিন্ডিকেটকেও দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে।

সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর আয়োজিত ‘মহাসড়কের লাইফ টাইম : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনার উঠে আসে এসব তথ্য। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এই সেমিনারে টেকসই সড়ক নির্মাণে মতামত নেওয়া হয় প্রকৌশলীদের। তারা টেকসই সড়ক তৈরির জন্য গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নির্মাণকাজের গুণগত মান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি নিষ্কাশন এই চারটি চ্যালেঞ্জের কথা জানান। এসবের পাশাপাশি সঠিক ও আধুনিক নকশা প্রণয়নে ওপর জোর দেন তারা।

সওজ সূত্রে জানা যায়, সর্বোচ্চ গাড়িসহ ১৫ টন পণ্য পরিবহনের হিসেব করে আর্ন্তজাতিক মানদণ্ড অনুয়ায়ী সড়ক নির্মাণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তও (সওজ)। কিন্তু সেই যানবাহনকেই ২২ টন ভারবহনের অনুমতি দিচ্ছে আরেকটি সংস্থা বিআরটিএ। যদিও বাস্তবে এর চেয়েও বেশি ওজনের পণ্য নিয়ে সড়কে চলাচল করছে ট্রাক-ট্রেইলার। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক।

যানবাহনের অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা দেশে আছে মাত্র তিনটি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন (পণ্যবাহী গাড়ির ওজন পরিমাপ যন্ত্র)। তবে আগামী দেড় বছরের মধ্যে বেশ কিছু এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মিত হবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির হিসেবে সারা দেশে চলাচলরত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রেইলারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এরমধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই দুই এক্সেলের ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান। ২২ টনের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে এসব ট্রাক পণ্য পরিবহন করে আরো বেশি। ফলে যে রাস্তা ২০ বছর ভালো থাকার কথা, সেটি এক বছরও থাকছে না। ওভারলোডিংয়ের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও এক বছরের মধ্যে সংস্কার করতে হচ্ছে। চালু হওয়ার আগেই দেবে যাচ্ছে নির্মাণাধীন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক।

জানা যায়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের যে পেভমেন্ট (পিচ) ডিজাইন গাইডলাইন আছে, তাতে পেভমেন্টের ভার বহনক্ষমতা রাখা হয়েছে এক্সেলপ্রতি (প্রতিজোড়া চাকা) ৮ দশমিক ২ টন। আর্ন্তজাতিকভাবেও এটি স্বীকৃত মানদণ্ড। তবে নির্মাণকাজের মান খারাপ হওয়ায় বাংলাদেশের রাস্তার ভার বহনক্ষমতা তুলনামূলক কম। এসব রাস্তায় দুই এক্সেলের ট্রাক ১৬ টন ওজন নিয়ে চললে মোটামুটি টেকসই হওয়ার কথা। কিন্তু বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি)  পরিবহন মালিকদের চাপে দুই এক্সেলের ট্রাককে ২২ টন ওজন নিয়ে চলার অনুমতি দিয়ে রেখেছে। তবে বাস্তবে এর চেয়েও বেশি ওজন নিয়ে চলছে এসব ট্রাক।

দুই এক্সেলের মাঝারি ট্রাক সাড়ে ১৫ টন ভার বহনের উপযোগী করে তৈরি করে প্রস্তুতকারকরা। তবে বাস্তবে এর চাইতেও বেশি ওজন নিয়ে চলাচল করে এসব যানবাহন। বেশির ভাগ ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের বডি দেশেই বানানো হয়। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, এই বডি বানানোর সময়ই সবচেয়ে বড় অনিয়ম হচ্ছে। সাড়ে ১৫ টন ভার বহনের ক্ষমতার ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের ঢাউস বডি বানানো হচ্ছে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত ওজন রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি করে। এটা জানার পরও বিআরটিএ বছর বছর এসব ট্রাক-কাভার্ডভ্যানকে ফিটনেস সনদ দিয়ে যাচ্ছে। সরকারও রাস্তায় ২২ টন ওজন নিয়ে এসব গাড়িকে চালানোর অনুমতি দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশই কিন্তু এটা অনুমোদন দেয়নি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, পাকিস্তানেও ১৬ টনের বেশি ওজনের গাড়ি রাস্তায় চলতে দেওয়া হয় না। কিন্তু আমরা দিচ্ছি। ছোট ছোট ট্রাকের বদলে বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহারের পরামর্থ দিয়েছেন তিনি।

তবে পরিবহন মালিকরা বলছেন, রাতারাতি দেশের বিদ্যমান দুই এক্সেলের ট্রাক-কাভার্ডভ্যানগুলোকে বদলে ফেলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি বড় বড় ট্রাক কিংবা ট্রেইলার চালানোর উপযোগী রাস্তাও আমাদের দেশে কম। একইভাবে মাঝারি ট্রাকের বদলে বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহার করলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিরও আশঙ্কা করছেন তারা।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহারের বড় সমস্যা, সেগুলোকে সব রাস্তায় চালানো যায় না। মোড়ে ঘুরতে সমস্যা হয়। হাইওয়ে থেকে ছোট রাস্তায় যেতেও সমস্যা হয়। আবার আমাদের এখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ভাড়া নেওয়ার মতো পণ্য থাকে না। এটাও একটা সমস্যা। তবে ওভারলোড নিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা সেটাই মেনে নেব।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী অব্দুস সবুর এসব প্রসঙ্গে বলেন, অতিরিক্ত ওজন আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা। এর জন্য আমাদের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। তিনি বলেন, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে ২১টি নতুন জায়গায় ২৮টি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন (পন্যবাহি গাড়ির ওজন পরিমাপ যন্ত্র) বসানোর কাজ চলছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এগুলোর কাজ শেষ হবে। এগুলোর কাজ শেষ হলে ওভারলোডিং অনেকটাই কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের মেঘনা ও গোমতি পয়েন্টে এবং দরোগারহাটে মোট ৩টি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন কাজ করছে। কোনো ওভারলোডেড গাড়িই এখান দিয়ে পার হতে পারে না। যদি ওভারলোড থাকে তবে কেজি প্রতি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে তাদেরকে। প্রধান প্রকৌশলী অব্দুস সবুর বলেন, আমরা কিছু কারিগরি পরিবর্তনের কথা ভাবছি। আমরা একটা নীতিমালা করতে চাই, যার আলোকে গাড়ি আমদানি ও নিবন্ধন করা হবে। এটা নিয়ে আমরা যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করব। পাশাপাশি আমাদের সড়কের মান বাড়ানোর লক্ষ্যেও আমরা কাজ করব। তিনি স্বীকার করেন, ওভারলোডের বিষয়ে বিঅরটিএ ও সওজের মধ্যে একটি ‘গ্যাপ’ আছে। সওজ সাড়ে ১৫ টন পর্যন্ত ভার বহনের অনুমতি দিলেও বিআরটিএ ২২ টন পর্যন্ত অনুমতি দিচ্ছে। এতে রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে।

তবে এ প্রসঙ্গে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের অফিস নম্বরে ফোন করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সড়ক বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ সড়ক অবকাঠামো আছে কেবল নেপালের। উন্নত অর্থনীতির পথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন যে হারে বাড়বে তার জন্য প্রয়োজন হবে ছয় থেকে আট লেনের মহাসড়ক। অথচ বাংলাদেশ এখনো চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে।

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার  লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি রূপকল্প ২০৪১। কিন্তু অর্থনীতির এসব লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ হচ্ছে না দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত হওয়ার পথে থাকা অন্য দেশগুলো সড়ক অবকাঠামোয় যেভাবে এগিয়ে সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে পণ্য পরিবহন প্রধানত সড়ক নির্ভর। অথচ সেই সড়কেই লেগে থাকে যানজট ও ধীরগতি। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্বলতায় বিঘ্নিত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। বাড়ছে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘মুভিং ফরোয়ার্ড : কানেক্টিভিটি অ্যান্ড লজিস্টিকস টু সাসটেইন বাংলাদেশিজ সাকসেস শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে। এতে  বলা হয়েছে, যানজটের কারণে একটি ট্রাক গড়ে চলতে পারছে ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার। একটি পণ্যের যে দাম, তার সাড়ে ৪ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে শুধু পরিবহন খরচে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads