• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

জাতীয়

সাক্ষাৎকার

প্রধান ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে : ইলিয়াস কাঞ্চন

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২২ অক্টোবর ২০২১

‘পথ যেন হয় শান্তির মৃত্যুর নয়’-এমন স্লোগানে ২৮ বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর জন্ম হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন। দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন ওই বছরের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। স্ত্রীর সেই নির্মম মৃত্যুতে তিনি দেশ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা দূর করার দাবিতে সোচ্চার হন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর ২০১৭ সালে সরকার তার আন্দোলনকে স্বীকৃতি জানিয়ে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্তু স্বীকৃতি দিলেও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তার মতে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য প্রধান ভূমিকা সরকারের।

বাংলাদেশের খবরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিসচা-র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমরা সড়ক নিয়ে কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের কাজের জায়গাটা খুবই সীমিত। আমাদের কাজ হলো সাধারণ মানুষকে ও সরকারকে সচেতন করা। পাশাপাশি সরকার যদি চায় তাহলে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা। এর বাইরে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই। যেমন একটা দেশের সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য পলিসি থাকতে হয়। সেই পলিসি সরকারকেই করতে হবে। পলিসি প্রণয়নে আমাদের যুক্ত করা হলে আমরা হয়তো সাজেশান্স দিতে পারবো এর বাইরে কিছু করতে পারবো না।’

তার মতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়ক এবং ব্রিজ কালভার্টগুলোকে এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে। সেইসঙ্গে এমন গাড়ি আমদানি কিংবা তৈরি করতে হবে যেগুলো দুর্ঘটনা ঘটাবে না। যারা গাড়িগুলো চালাবে তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলে তারপর লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। আর এসব বিষয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেই নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইন যদি দুর্বল থাকে এবং আইনের প্রয়োগে কোনো ঘাটতি থাকে সেটাও সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এগুলো কোনো প্রাইভেট সেক্টর করতে পারবে না। তাছাড়া, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাজেটের ব্যাপার রয়েছে। সেটাও সরকারকেই করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার একটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকতে হবে। অর্থাৎ, টোটাল বিষয়টিই সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রোপার অথিরিটির প্রোপার কাজটি করতে হবে। কেউ যদি বড়ই গাছ লাগিয়ে আশা করে কলা খাবেন। সেটি কখনোই সম্ভব না।’

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনগণকে মুখে সচেতনতার কথা বলে কোনো লাভ হবে না জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘জনগণকে আগে তাদের অভ্যাসটা তৈরি করে দিতে হবে। নইলে তাদের মধ্যে যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে সেটার ওপরই চলবে। যেমন ঢাকায় যখন উত্তরা মটরস্ চালু হলো তখন তারা বললো যে লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে উঠতে হবে, মানুষ কিন্তু তখন ঠিকই লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে উঠেছে। একারণে অভ্যাসটাও সরকারকেই তৈরি করে দিতে হবে এবং সেটার জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে লোক উঠানামা করা যাবে না, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হওয়া যাবে না। এগুলো আইনের মাধ্যমে করা না হলে শুধু মুখ দিয়ে বললে জনগণ মানবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে দীর্ঘ ৫০ বছর। এই সময়ে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

তিনি এশিয়ার উন্নত দেশ সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সিঙ্গাপুরের বেশিরভাগ মানুষ এক সময় জেলে এবং ডাকাত ছিল। তারা বলতে গেলে একটা বর্বর জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু একসময় দেশটিতে আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু হলে আমূল পরিবর্তন চলে আসে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর এশিয়ার অন্যতম সভ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। তাই জনগণকে আসলে বোঝাতে হবে যে আমরা আসলে কি চাই এবং কেন চাই। সেটি বোঝাতে পারলে জনগণও মানতে বাধ্য হবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি আজো করা হচ্ছে না।’

সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো আহ্বান আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ৮০-৯০ দশকের জনপ্রিয় এই অভিনেতা জানান, সরকার নিরাপদ সড়ক দিবসকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ উপলক্ষে কিছু কাজ হচ্ছে। সরকারের কাছে নিসচা ১১১টি প্রস্তাবনা দিয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে সেগুলোর কার্যক্রম থমকে যায়। তবে সেগুলো এখন নিয়ে কাজ হচ্ছে। পরিপূর্ণভাবে কাজগুলো করা গেলে দেশ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভবপর হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আমাদের কথার কারণেই যে সরকারকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে তা নয়; উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশকে অবশ্যই ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। সরকার যতই ব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার, টানেল নির্মাণ করুক না কেন, সড়ক দুর্ঘটনা না কমালে স্বীকৃতি মিলবে না।’  

প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলোর পাশাপাশি সরকারের কাছে দেওয়া  নিসচা-র ১১১টি প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘এগুলো যত দ্রুত কার্যকর হবে, তত দ্রুতই আমরা সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে পারবো। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো-সড়ক দুর্ঘটনা সত্যিকার অর্থে কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি করতে হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এই ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রাখতে হবে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads