• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জৈষ্ঠ ১৪২৯

জাতীয়

ঘুরছে অর্থনীতির চাকা

নগদ টাকার সংকট ব্যাংকে!

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৩ নভেম্বর ২০২১

মাত্র পাঁচ মাস আগে গত জুনে অলস ৬২ হাজার কোটি টাকা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল ব্যাংক খাতে। সেসময় ছিল না বিনিয়োগ, এমনকি ছিল না ট্রেজারি বিলবন্ডেও খাটানোর সুযোগ। কিন্তু আয় না হলেও ব্যাংকগুলোকে আমানতের বিপরীতে সুদ ঠিকই দিয়ে যেতে হচ্ছিল।

ঠিক তার তিন মাস পর সেপ্টেম্বর শেষে চিত্রটা পাল্টে যায়। অলস টাকা ২৭ হাজার কোটি কমে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কোটি। আরো দুই মাস পর এই অঙ্কটা আরো কমে এসেছে বলে জানাচ্ছেন ব্যাংকাররা। তবে চূড়ান্ত হিসাবটা এখনো দিতে পারছেন না তারা।

জানা গেছে, করোনার বিধিনিষেধ শিথিল হতে শুরু করে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে। এরপর থেকে দেশের অর্থনীতির জং ধরা চাকা ঘুরতে শুরু করে। হাত গুটিয়ে রাখা বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের জন্য ব্যাংকে আসতে থাকে। ফলে ব্যাংকে অলস আর অতিরিক্ত তারল্য দুটোই কমে আসছে।

টাকার চাহিদা বাড়ছে, এ কারণে বাড়ছে ব্যাংকের সুদহার। করোনার সময় ঋণ দিতে অপেক্ষায় থাকা ব্যাংকগুলো ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিলেও এখন বেধে দেয়া সর্বনিম্ন সুদ ৯ শতাংশের নিচে দিতে চাইছে না। মাস কয়েক মাসেও কলমানিতে টাকার কোনো চাহিদা ছিল না। এখন ৪ শতাংশের ওপরে সুদে টাকা ধার করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। এতে এটাই স্পষ্ট হয় যে, অনেক ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত টাকা আর নেই।

অর্থাৎ করোনার ধাক্কায় দেশে বিনিয়োগের যে খরা তৈরি হয়েছিল, তা কাটতে শুরু করেছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণের জন্য আবেদন বাড়ছে। বেড়েছে বিতরণও। ফলে ব্যাংকে যে অতিরিক্ত তারল্যের পাহাড় জমেছিল, তা ছোট হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ১০ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। আগের মাস আগস্টে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা আশা করছেন, ঋণ বিতরণ আরো বাড়বে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ঋণের চাহিদা বেড়েছে। করোনার কারণে ঋণের চাহিদা কম ছিল। তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে করপোরেট ঋণ ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখন ঋণের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ৯ শতাংশের কম সুদে ঋণে এখন ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর তারিক আফজাল বলেন, ‘সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ায় বেসরকারি ঋণে চাহিদা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তি বিনিয়োগে খরা কাটছে। ব্যাংকগুলো এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে ঋণ বিতরণে আগের থেকে বেশি মনোযোগী। সামনের দিনে ঋণে গতি ফিরবে।’

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের চাহিদাও কিছুটা বেড়েছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরতে শুরু করেছে। সামনে বেসরকারি খাতেও ঋণ প্রবাহ আরো বাড়বে। তবে ব্যাংকগুলোর দেখে শুনে ভালো গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া উচিত। কারণ, ঋণ খেলাপিদের পুনরায় ঋণ দিলে সেটা অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না।’ এরআগে ২০২০ সালের মার্চে করোনার আঘাতের পর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে নামে। অর্থনীতির ওপর আঘাত মোকাবিলায় সরকার ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, তার বাইরে ঋণ প্রস্তাব ছিল না বললেই চলে।

এই প্রণোদণার পরেও গত জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশের মতো, অথচ লক্ষ্য ছিল ১৪.৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ ঋণ প্রবাহ রেকর্ড হয় মে মাসে। বিনিয়োগের এমন খরা সামপ্রতিক বছরগুলোতে কখনো হয়নি।

চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের বছরের মতোই ঋণে ১৪.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরেছে। এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা কাটিয়ে উদ্যোক্তারাও উৎপাদন শুরু করার বা নতুন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন। জুলাই ও আগস্ট মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। আর নতুন এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ।

তবে ভাইরাসের প্রকোপ আরো কমে আসায় ঋণপ্রবাহ আরো বেড়েছে। জুলাই ও আগস্টে যা ছিল যথাক্রমে ৮.৩৮ ও ৮.৪২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে সেটা আরো বেড়ে হয় ৮.৭৭ শতাংশ।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। মার্চ শেষে সেটা বেড়ে হয় ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে শেষে ঋণ বেড়ে ১২ লাখ ১০ হাজার ৭২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ছয় মাসে ঋণ বেড়েছে ৩৩ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

এছাড়া বছরখানেক আগেও আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে (কলমানি মার্কেট) সুদহার ছিল দুই শতাংশের নিচে। টাকার চাহিদা কম থাকায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই উদ্বৃত্ত অর্থ ছিল; কিন্তু আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া, ঋণের চাহিদা বেশি হওয়ায় নগদ টাকার চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকা উত্তোলন করায় বাজারে নগদ টাকার প্রবাহে টান পড়েছে।

এক বছর আগেও যেখানে কলমানি মার্কেটের সুদহার ছিল ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। কলমানি মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলো অনেকটাই এখন চাপে পড়ে গেছে।

আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সংকট পরিস্থিতিতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ঋণের সুদহারও বেড়ে গেছে। গত জুনে সরকারের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে সুদের হার ছিল গড়ে ৫.৬৫ শতাংশ। বর্তমানে তা ৭.৪৪ শতাংশে উঠেছে।

সংকটের সময় এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে, আবার ব্যাংক থেকে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে টাকা ধার নেয়। সাধারণত এক রাতের জন্য এই ধার নেওয়া হয়। এই ধার দেওয়া-নেওয়া কার্যক্রম যে ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয় তা আন্তঃব্যাংক কলমানি বাজার নামে পরিচিত।

এদিকে, বিনিয়োগে গতি ফিরতে শুরু করার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য কমেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। জুনে অতিরিক্ত এ তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

অলস তারল্যের চাপ কমাতে গত আগস্টে উদ্যোগী হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য মাসব্যাপী ৭, ১৪ ও ৩০ দিন মেয়াদি বিলের নিলাম কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ওই নিলামের মাধ্যমে মুদ্রাবাজার থেকে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

নিয়মানুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে বর্তমানে নগদে রাখতে হয় সাড়ে ৪ শতাংশ, যা সিআরআর হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন বিল ও বন্ডের বিপরীতে বিধিবদ্ধ তারল্য বা এসএলআর রাখতে হচ্ছে ১৩ শতাংশ।

এই নিয়মে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর রাখার প্রয়োজন ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যাংকিং খাতে মোট তারল্য ছিল ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত তারল্য সে সময় দাঁড়ায় দুই লাখ ১৯ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

তবে অতিরিক্ত তারল্যের সব অর্থই অলস নয়। অতিরিক্ত তারল্যের মধ্যে সিআরআরে থাকা অলস অংশ বাদে বাকি অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হিসেবে থাকে। এ টাকা সরকারকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। এটা বাদ দিলে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকে আর্থিক হিসাবগুলো প্রস্তুত হয় তিন মাস অন্তত। ডিসেম্বর শেষে আবার হিসাব পাওয়া যাবে কার হাতে কত উদ্বৃত্ত টাকা আছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads