• সোমবার, ৮ আগস্ট ২০২২, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

জাতীয়

সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ

  • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
  • প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর ২০২১

১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী তিনটি পাক-ভারত যুদ্ধ, একটি অঘোষিত যুদ্ধ (কার্গিল যুদ্ধ) এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় সহযোগী রাজাকার বাহিনী, আলবদর ও আলশামসের হাতে ৩০ লাখ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকার বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার এই আত্মসমর্পণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণের ঘটনা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের সেনাবাহিনীর মধ্যকার পূর্বাপর ঘটনা তাদেরই উত্তরজাত বলে মনে হয়েছে।

একাত্তরের প্রস্তুতিবিহীন যুদ্ধে পূর্ববঙ্গে অবস্থানকারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বস্ব পণ করে যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে কেউ কেউ যোগ দিয়েছেন যুদ্ধে; কিন্তু যুদ্ধের পরে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারির সেই সহযোদ্ধারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। শত্রুতাও দেখা দিয়েছে পারস্পরিক। যুদ্ধক্ষেত্রে খালেদ মোশাররফ ও জিয়াউর রহমান কেবল সহযোদ্ধা নন, বন্ধুও ছিলেন একে অপরের। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে খালেদের ছিল অতুলনীয় সাহসী এক বিদ্রোহ। আর দেশবাসীর একটি অত্যন্ত সংকটময় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান বেতারে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ভীষণ রকমের প্রয়োজনীয় যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন ইতিহাসে তা লেখা রয়েছে। যুদ্ধের কিছুদিন পরেই কিন্তু দেখা গেল খালেদ মোশাররফ শিকার হচ্ছেন অবিশ্বাস্য রকমের নির্মম এক হত্যাকাণ্ডের এবং সেটা ঘটছে তার বন্ধু জিয়াউর রহমানের অনুরাগী সৈন্যদের হাত দিয়ে। এরপরে জিয়া নিজেই নিহত হলেন আরেক ষড়যন্ত্রে, যার ভেতর অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে পড়েছেন আবুল মঞ্জুর, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যিনি যুদ্ধ করেছেন এবং জিয়ার সঙ্গে যার অত্যন্ত গভীর নৈকট্য ছিল। মঞ্জুর নিজেও নিহত হলেন তারই অধীনস্থ সৈনিকদের হাতে। মঞ্জুর-হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যুদ্ধের যিনি ধারেকাছেও ছিলেন না, যার বিরুদ্ধে উল্টো গুঞ্জন ছিল পাকিস্তানিদের সঙ্গে সহযোগিতার। মঞ্জুর-হত্যা নিয়ে মামলা একটা হয়েছিল; কিন্তু বিচার হয়নি। যুদ্ধ করবেন বলে পাকিস্তান থেকে ছুটে এলেন আবু তাহের; যুদ্ধ করলেনও, যুদ্ধে একটি পা হারালেন। যুদ্ধশেষে তিনি তৎপর হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর ভেতর বিপ্লবী কর্মে; পরিণামে তাকে অভিযুক্ত হতে হলো সেনাবাহিনীর অফিসার ও তাদের পরিজনদের হত্যার প্ররোচনাদানকারী হিসেবে। তাহেরের আশা ছিল জিয়ার সাহায্যে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠনের কাজকে এগিয়ে নেবেন; পরিণতি দাঁড়াল তিনি ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিলেন; এবং প্রাণদণ্ডাদেশটি দিল যে আদালত সেটি বসালেন জিয়াউর রহমান নিজে। এম এ জলিল যুদ্ধ করেছেন দেশের ভেতরে থেকেই; যুদ্ধের পরে তিনি গ্রেপ্তার হলেন ভারতীয় বাহিনীর কিছু সদস্যের লুণ্ঠন তৎপরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে। জিয়াউদ্দিন আহমদ একজন দক্ষ সামরিক অফিসার ছিলেন, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে নেমেছিলেন। যুদ্ধশেষে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন সরকারের নীতি সঠিক নয় বলে প্রবন্ধ প্রকাশ করে এবং চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগ দিলেন সর্বহারা পার্টিতে।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এসব ঘটনাতে বোঝাই যাচ্ছিল যে রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা পায়নি। যুদ্ধের সময় কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি যে স্বাধীন বাংলাদেশে আবার সামরিক শাসন আসবে। কিন্তু সেই অপ্রত্যাশিত ও অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে। একবার নয়, কয়েকবার। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই যে, দেশ স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় নি। কথা উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য কোনো সামরিকবাহিনী থাকার আদৌ দরকার আছে কি না তা নিয়েই। থাকলেও সেটা কেমন ধরনের ও কোন মাত্রার হবে সেটা নিয়েও। কিন্তু সে বিষয়ে ভাববার সময় পাওয়া যায় নি। নতুন শাসকদের উদ্বেগ ছিল পুরাতন ব্যবস্থাটাকে আপৎকালীন বন্দোবস্ত হিসেবে হলেও চালু রাখা যায় কি না তা নিয়ে। সেটা সম্ভব হয়েছিল, এবং সেটা করতে গিয়ে পুরাতন আইনকানুন, আদালত, আমলাতন্ত্র সবই চালু থাকল। সামরিকবাহিনীও আগের ধরনেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনাবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশ বাহিনীর ভেতর দিয়ে নেওয়া হলো। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ-নেওয়া এবং না-নেওয়া, এই দুই ভাগের ভেতর নীরব ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলো। সদ্য গঠিত রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সামরিকবাহিনীর একটি দ্বন্দ্বও দেখা দিল। সংবিধান প্রণীত হলো, কিন্তু দেখা গেল তাতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্বের স্বীকৃতি নেই। বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বের কথা ভুলে তাকে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করা হলো। অনেকটা পাকিস্তানি কায়দাতেই। যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুজিববাহিনীর দ্বন্দ্ব ছিল, যুদ্ধের পরে সেটা প্রকট হলো এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমে প্রধানমন্ত্রিত্ব, পরে মন্ত্রিত্ব থেকেই অপসারিত হলেন। অব্যবস্থাপনার দরুন দেশে দুর্ভিক্ষের মতো একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল। তাতে দুই লক্ষের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটল। চোরাচালান, হত্যাকাণ্ড, পরীক্ষায় নকল, সম্পদ লুণ্ঠন—এসব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে, এমন আশা ছিল সর্বজনীন। সে আশা পূরণ হবার সম্ভাবনা ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকল। যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, এমন যুদ্ধাপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো। অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। অল্প পরে ১৯৭৫-এর শুরুতে এলো একদলীয় শাসন। কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটল না। শুরুতে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী, আর সেটা ছিল সরকারের জন্য বিরাট এক মূলধন। কিন্তু সময় যতই এগুতো থাকল, সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকল।

সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং একেবারেই অবিশ্বাস্য যে ঘটনা ঘটল, সেটি হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর প্রাণ হারানো। সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের নেতৃত্বে এটা ঘটল। এই অফিসাররা সুযোগ নিয়েছে সরকারের জনবিচ্ছিন্নতাকে। সরাসরি না হলেও, ঘটনার পেছনে যে আমেরিকার সমর্থন ছিল, এই ধারণা অন্যায্য নয়। ক্ষমতায় এলেন আওয়ামী লীগেরই মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ; তিনি যে মার্কিনপন্থি ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমেরিকা বাংলাদেশের অভ্যুদয় সমর্থন করেনি, তবে মেনে নিয়েছিল। এবং চেষ্টা করেছিল নিজের প্রভাব বলয়ের ভেতরে তাকে দ্রুত নিয়ে আসতে। বঙ্গবন্ধুর জায়গাতে মোশতাকের ক্ষমতাপ্রাপ্তিতে আমেরিকার জন্য সন্তুষ্ট হবার কারণ ছিল। মোশতাক সরকারের চারিত্রিক ঝোঁকটা কোন দিকে সেটা বোঝা গিয়েছিল ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই, তারা যখন ‘জয় বাংলা’র জায়গাতে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ নিয়ে এলো, বাংলাদেশ বেতারের নাম দিল রেডিও বাংলাদেশ, রেডিও পাকিস্তানের আদলে, তখনই।

মোশতাকের সেই ‘বিপ্লব’ অবশ্য টেকসই প্রমাণিত হয়নি, তিন মাস হতে না হতেই তিনি এবং তার ‘সূর্য-সন্তানরা’ উৎখাত হয়েছেন। তবে ব্যাপার সুবিধার নয় দেখে জেলখানায় লোক পাঠিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের বন্দি চার শীর্ষ নেতাকে হত্যা করিয়েছেন। তারপরে ক্যু, পাল্টা ক্যু ঘটেছে। জিয়াউর রহমান এলেন, সংবিধান থেকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের অপসারণ ঘটালেন। তারপরে এরশাদ। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তারপরে ‘গণতন্ত্রে’র প্রত্যাবর্তন। মাঝখানে ছদ্মবেশী সেনাশাসন। এরপরে ভোটারবিহীন নির্বাচন। সবকিছুই হলো, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানা এলো না জনগণের হাতে। অধরাই থেকে গেল ‘সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ’। আজো তাই বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতাকেই খোঁজে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads