• শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮

জাতীয়

এবার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে নজরদারি

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারি ২০২২

স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন বছর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার করতে চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রমও জোরদার করেছে দুর্নীতিবিরোধী এ প্রতিষ্ঠানটি। নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে সেবা দানকারী সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি পূর্বের দায়ের চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর গতি আনতেও কাজ করবে।

সদ্য যোগ দেওয়া দুদক কমিশনার মাহবুব হোসেন বলেন, করোনাকালীন সময়ে দুদকের অনেক কাজেই ভাটা ছিল। এখনো করোনার সেই প্রকোপ যায়নি। কিন্তু দুদক থেমে থাকবে না। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সচরাচর দুর্নীতির অভিযোগ থাকেই। এ সকল প্রতিষ্ঠানে স্পট অপারেশনের জন্য এনফোর্সমেন্ট ইউনিট প্রস্তুতিও নিচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গণপূর্ত, রাজউক, ওয়াসা, এলজিইডি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড অন্যতম।

দুদক বলছে, এ সব প্রতিষ্ঠানে নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর জন্য এনফোর্সমেন্ট ইউনিট রেডি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেকোনো মুহূর্তে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সূত্র মতে, গত বছর আলোচিত মামলার তদন্তে অগ্রগতি ছিল না। এ সময়ে অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার সবই ছিল নিম্নমুখী। দুদক সূত্রে জানা যায়, গত বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দুদকে ১১ হাজার ৮২৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই হিসাবে প্রতিমাসে জমা পড়েছে গড়ে এক হাজার ১৮৩টি অভিযোগ। তবে ২০২০ সালে মাসে গড়ে এক হাজার ৫৪১টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। ওই বছর মোট ১৮ হাজার ৪৮৯ অভিযোগ জমা পড়ে।

২০২০ সালে দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৪৮৭টি অভিযান পরিচালনা করে। তবে চলতি বছরের ১০ মাসে এনফোর্সমেন্ট ইউনিট অভিযান চালায় মাত্র ১১১টি। দীর্ঘদিন ধরে ‘ফাঁদ মামলা’ ও গণশুনানি বন্ধ ছিল। তবে নভেম্বরে কয়েকটি ফাঁদ মামলা ও গণশুনানি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও পুরনো অভিযোগের অনুসন্ধান, তদন্ত ও অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করতেই বেশি সময় কাটছে দুদক কর্মকর্তাদের। মেয়াদোত্তীর্ণ অনুসন্ধান ও মামলার সংখ্যা এক হাজার ৩২২টি, যা মোট অনুসন্ধান ও মামলার এক-চতুর্থাংশ।

দুদক সচিব মাহবুব হোসেন বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন কার্যক্রমে গতি পায়নি। তবে এ বছর সেই রকম আর থাকবে না। আমরা নতুন বছরে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা ঠিক করে কাজও শুরু করেছি। চাঞ্চল্যকর মামলা থেকে শুরু করে নতুন নতুন অভিযান পরিচালিত হবে।

এদিকে, আলোচিত অনেক মামলার নিষ্পত্তি করতে পারছে না দুদক। এর মধ্যে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি সংস্থাটির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছয় বছরেও বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি প্রতিবেদন দিতে পারেনি দুদক। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া ৫৬টি মামলার দৃশ্যমান তেমন অগ্রগতিও নেই।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, ঋণের নামে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। ২০১৫ সালে দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাতের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় ৫৬টি মামলা করে সংস্থাটি। এসব মামলায় আসামি করা হয় ব্যাংকটির কর্মকর্তা, ঋণগ্রহীতাসহ ১২০ জনকে।

বিগত ছয় বছরে বিদায় নিয়েছেন দুদকের দুজন চেয়ারম্যান। তবে বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংককাণ্ডে করা মামলাগুলোর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি দুদক।

জানা যায়, কোনোরকম নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব খাটিয়ে কয়েকশো ব্যক্তিকে হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিলেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যার আবদুল হাই বাচ্চু। মূলত ঋণের নামে এসব অর্থ লুট করা হয়েছে। লোপাটের ঘটনায় আবদুল হাই বাচ্চুসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততাও মিলেছে দুদকের তদন্তে। ২০১৭ সালে দুবার ও ২০১৮ সালে একবার আবদুল হাই বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

আলোচিত এ মামলাটি এ বছর গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এর কার্যক্রমে গতি আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বেসিক ব্যাংকের মতোই দীর্ঘ আট বছর ধরে  আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান ও তদন্তে গতি আনছে দুদক। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি ৪১টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে হলমার্ক নামের অখ্যাত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়।

২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ফান্ডের মোট এক হাজার ৯৫৪ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৩ টাকা আত্মসাতের দায়ে ৩৮ মামলায় ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে সক্ষম হয় দুদক। এরপর থেকে কার্যত স্থবির মামলাটির কার্যক্রম। লোপাট হওয়া টাকার মধ্যে হলমার্ক গ্রুপের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৬৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বাকি টাকা এখনো অনাদায়ী। আলোচিত এ মামলাটিও গতি চলতি বছরে তদন্তে গতি পাবে বলে জানায় দুদক সূত্র।

পি কে হালদারের মামলা : আর্থিক খাতে অনিয়মের আরেক নাম পি কে (প্রশান্ত কুমার) হালদার। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে রিলায়েন্স ফিন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালীন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে কানাডায় পালিয়েছেন পি কে হালদার।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। গত বছরের ৮ জানুয়ারি দুদকের অনুরোধে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করে ইন্টারপোল।

অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় পি কে হালদারসহ ৮৩ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১ জন। জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে। গ্রেপ্তাকৃতদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী ছাড়াও তার সহযোগী শংখ বেপারি, রাশেদুল হক এবং সর্বশেষ পি কে হালদারের বান্ধবী অবান্তিকা বড়াল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তা নিয়ে গত বছর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সংস্থাটি। একইভাবে হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি ও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের তদন্তে চলতি বছর গতি আসবে। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads