• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
নতুন রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে দেশ

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

নতুন রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে দেশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারি ২০২২

আবারো শুরু হয়েছে করোনা সংক্রমণের রেকর্ড ভাঙাগড়ার নতুন খেলা। রোগী আর সংক্রমণের হার প্রতিদিনই ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগের দিনকে। দৈনিক সংক্রমণের হার এখন ৩০ শতাংশের উপরে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ১৮০ শতাংশ আর মৃত্যু ৮৮ শতাংশ। পরিস্থিতিকে ‘আকাশচুম্বী’ মন্তব্যের পরও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা প্রাপ্ত পরিসংখ্যানের চাইতেও অনেক বেশি। কিন্তু তারপরও সাধারণ মানুষ মানছে না বিধিনিষেধ। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারকে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। এদিকে ব্যাপক সমালোচনার পর বাণিজ্যমেলা বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। আর এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি অমর একুশে গ্রন্থমেলার বিষয়ে।

ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে করোনার অতি সংক্রমণশীল ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট তাণ্ডব চলছে। দুই বছর ধরে চলা মহামারিতে বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের ত্রাসকে এতদিন ‘ঢেউ’ বলা হলেও ওমিক্রন তাণ্ডবকে বলা হচ্ছে ‘সুনামি’। সারা বিশ্বেই আগের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলছে করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট, বাংলাদেশেও ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, গত জুন-জুলাই ও আগস্টে ডেল্টা-তাণ্ডব চললেও এবার ওমিক্রন গড়বে নতুন রেকর্ড। যদিও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে রোগী বাড়তে থাকলে মৃত্যুও বাড়বে।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে রোগী সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। এ কথা স্বীকার করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। তারা বলছে, এভাবে রোগী বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে সময় লাগবে না। রোগী বাড়ার কারণে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে আবারো কোভিড ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জানিয়েছে, সেখানেও বাড়ছে রোগীর চাপ।

এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগীর হিসাব দেওয়া হয়, সেটা প্রকাণ্ড হিমবাহের সামান্য অংশ। প্রকৃত রোগী তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি। শনাক্ত না হওয়ার বড় কারণ নমুনা পরীক্ষার সংকট।

বেসরকারি পর্যায়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ফি আর সরকারি পর্যায়ে নানা হয়রানি ও বিলম্বের কারণে মানুষ পরীক্ষা করাচ্ছে কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন অধিদপ্তরের ভার্চুয়াল বুলেটিনে বলেছেন, বর্তমানে রোগী শনাক্তের ঊর্ধ্বগতির হার শুধু যে বাড়ছে তা নয়, এটা ‘প্রোগ্রেসিভলি’ বাড়ছে। এটা অ্যালার্মিং। তিনি আরো বলেন, অনেকেই টেস্ট করছেন না। উপসর্গযুক্ত রোগীদের সবাইকে টেস্ট করালেও সংখ্যাটা আরো বাড়তো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৩৩ জনে শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এ সময় মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। আর শনাক্ত হার দুই বছর আগের রেকর্ড ছুঁইছুঁই করছে। এর আগে গত ৩ আগস্ট ১৫ হাজার ৭৭৬ জন শনাক্ত হয়েছিলেন। ওই ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা গত ছয় মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২৪ জুলাই শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ওটাই ছিল মহামারিকালে সর্বোচ্চ শনাক্তের হার।

গত সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত যত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩২ দশমিক ৩০ শতাংশ নমুনায় ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। গত বছর দেশের ইতিহাসে পরীক্ষার বিপরীতে সর্বোচ্চ সংক্রমণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৫৫, যা লকডাউন চলাকালে গত ২৪ জুলাইয়ের চেয়ে বেশি সংক্রমণের হার পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে এ পর্যন্ত করোনা ধরা পড়েছে ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৯৯৭ জনের দেহে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৮ হাজার ২৫৬ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে করোনায় নতুন শনাক্ত রোগী বেড়েছে ১৮০ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। গত সোমবার অধিদপ্তর জানায়, গত সপ্তাহে (১৭-২৩ জানুয়ারি) করোনায় নতুন শনাক্ত হয়েছেন ৬৭ হাজার ৪২৫ জন। এর আগের সপ্তাহে হয়েছেন ২৪ হাজার ১১ জন। অর্থাৎ আগের সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে রোগী বেড়েছে ১৮০ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই সংখ্যাও প্রকৃত চিত্র নয়। টেস্ট যত বাড়বে, রোগীও তত বাড়বে। শনাক্ত রোগী কম হলে সেটা কখনোই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান। তিনি বলেন, সংক্রমণ আকাশচুম্বী। আর যেহেতু ব্যাপকভাবে দেশে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে না, সেজন্য সংক্রমণের হার এবং শনাক্তের প্রকৃত চিত্র আমরা পাচ্ছি না।

সরকারি পর্যায়ে নানা ভোগান্তি, বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ ফির কারণে মানুষ টেস্ট বিমুখ হচ্ছে। অথচ ঘরে ঘরে রোগী, যারা টেস্ট করাচ্ছে না। এ অবস্থা পরিবারে, বন্ধুমহলে। এসব রোগীরা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক আর্সলান বলেন, আমরা যদি না জানি প্রকৃত রোগী কত, তবে কোন পদক্ষেপ নিতে হবে, কী করে এলাকা ধরে এগোতে হবে সেটাও বুঝতে পারবো না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এখন যে রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন পাচ্ছি, সেটা হচ্ছে টপ অব দ্য আইসবার্গ। চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়, আনরিপোর্টেড কেস কত। তিনি আরও বলেন, যেহেতু ওমিক্রনের লক্ষণ মারাত্মক নয়, হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে না অনেককে, তাই ৯০ ভাগ মানুষই পরীক্ষার বাইরে থাকছে। যে ১০ ভাগ মানুষ পরীক্ষা করছে, তাদের ভেতর থেকেই হাজার হাজার মানুষ শনাক্ত হচ্ছে। এতে বাকি চিত্রটা সহজেই অনুমান করা যায় বলে জানান ডা. বে-নজির। এ হিসাবে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা হাজার নয়, লাখের ঘরে থাকবে বলেই ধারণা তার।

ডা. বে-নজির বলেন, বাজার, শপিং মল, সবই স্বাভাবিক। তবে ওমিক্রনের মতো সংক্রমণশীল ভাইরাসের সংক্রমণ যে থেমে থাকবে, সেটা বিজ্ঞান স্বীকার করবে না।

এদিকে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বাণিজ্যমেলা বন্ধ এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা পেছানোর সুপারিশ করেছে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কারিগরি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি করোনা নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সরকারকে আরও কঠোর হতে সুপারিশ করেছে।

অধ্যাপক সহিদুল্লা বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সরকারকে আরও কঠোর হওয়া উচিত। আমরা কয়েকবার বিধিনিষেধ যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করেছি। শুধু বিধিনিষেধ দিলে হবে না। তা যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। অফিস-আদালতে যে অর্ধেক জনবল নিয়ে কাজ করার সুপারিশ করা হয়েছে, এগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে পরিবহনে অর্ধেক যাত্রী ও বাণিজ্য মেলা বন্ধ এবং বইমেলা পেছানো উচিত।

এর আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত সোমবার থেকে অর্ধেক জনবল নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস চালানোর নির্দেশনাসহ রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

দেশে দৈনিক সংক্রমণের হার ৩০ শতাংশের কোটায়। এ অবস্থায়ও বিধিনিষেধও তেমন মানছে না মানুষজন। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারকে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কারিগরি কমিটি। করোনার তৃতীয় ঢেউ নিশ্চিতের পর ২১ জানুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে ক্লাস বন্ধের আদেশ আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাণিজ্য মেলার মতো আয়োজনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম চালু রাখায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। এদিকে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে বইমেলা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পিছিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি আয়োজনের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads