• বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জৈষ্ঠ ১৪২৮
ফেসুবকে নজর গোয়েন্দাদের

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

ফেসুবকে নজর গোয়েন্দাদের

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ১২ মে ২০২২

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে যে কোনো সময় অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এমন প্রতিবেদন দিয়েছে গোয়েন্দারা। এজন্য ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলো কঠোরভাবে মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের এমন নির্দেশনার পর কয়েক হাজার আইডি চিহ্নিত করে পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব আইডি পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হতে পারে। পরিস্থিতি গভীর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ওই প্রতিবেদনে বলেছেন, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় গণবিক্ষোভের বিষয়টি নিয়ে সরকারবিরোধী একটি পক্ষ ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে। সে দেশের গণবিক্ষোভের বিভিন্ন ছবি আইডিতে দিয়ে উস্কানিমূলক নানা পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে গণবিক্ষোভের বিষয়টি সামনে এনে অরাজকতা পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে এ ধরনের উস্কানি বা গুজব তৈরি করে সহিংসতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন আইডি থেকে একের পর এক পোস্ট করা হচ্ছে। এমনকি মন্ত্রী-এমপি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে কুৎসা রটনামূলক শত শত পোস্ট করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় ওই আইডি ও মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশ ও দেশের বাইরে এ ধরনের কয়েক হাজার আইডি এ কাজে লিপ্ত রয়েছে। আইডিগুলোকে শনাক্ত করে তাদের ওপর পর্যবেক্ষণের মাত্রা আরো বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মতামত দেওয়া হয়েছে।

সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু চিহ্নিত আইডি থেকে সরকারবিরোধী নানা পোস্ট করা হয়। এছাড়া সমসাময়িক বিষয় নিয়েও উস্কানিমূলক পোস্টও দেওয়া হয় ওই আইডিগুলো থেকে। ওই আইডিগুলোকে চিহ্নিত করে মাঝে মাঝে অপারেশন চালানো হয়। গ্রেপ্তার করা হয় আইডি পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের।

কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারবিরোধী বা উস্কানি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে এমন পোস্ট দেখামাত্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর রয়েছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত রয়েছি। পরিস্থিতির ওপরও নজর রাখা হয়েছে। কোথাও কোনো ইনসিডিন্ট হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে ব্যাপারেও আমরা কাজ করছি।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল আলম বলেন, গুজব, উস্কানি ও উগ্রবাদীদের অনলাইন কার্যক্রমের বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক। এ ধরনের প্রায় প্রায় হাজারের মতো আইডি চিহ্নিত করে শতাধিকের ওপর আমরা মামলা ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি বলেন, মূলত দেশের বাইরে থেকেই এ ধরনের পোস্ট বেশি হয়ে থাকে। তারপরও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সতর্ক রয়েছি। কিছু আইডিগুলোর কার্যক্রম গভীরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কোথাও কোনো ইনসিডিন্ট হওয়া মাত্রই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশনা এসেছে। নির্দেশনার আলোকে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সে ব্যাপারে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার সুদিপ্ত কুমার চক্রবর্তী জানান, আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক রয়েছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার মতো আশঙ্কা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে নওগাঁর মহাদেবপুরে জাতীয় সংগীত চলাকালে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনী পাল স্কুলড্রেস পরে না আসায় কয়েকজন ছাত্রীকে মারধর করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদিউল আলম অষ্টম শ্রেণির তিন ছাত্রীকে মারধর করেন। পরে হিজাব পরায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়েছে ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয়। এ ঘটনার জেরে বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে আসবাব ভাঙচুর করে স্থানীয়রা।

ঘটনাটি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গুজব ছড়ানোর অপরাধে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশে কয়েকবার সামপ্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। চক্রান্ত করে একটি চক্র বারবার গুজব ছড়িয়ে এ ধরনের ফায়দা লুটেছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলার রামুতে ফেসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করা নিয়ে বাধে তুলকালাম কাণ্ড। বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের এক যুবকের ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার জের ধরে রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা হয়। দশটিরও বেশি বৌদ্ধ বিহার ও প্রায় ২৫টি বাড়িতে চলে হামলা-ভাঙচুর।

পরের ঘটনা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। রামুর কায়দাতেই ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর আক্রান্ত হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সে সময় অভিযোগ করা হয় রসরাজ নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে ইসলামবিদ্বেষী ছবি প্রকাশ করে। অথচ আড়াই মাস পর জানা যায় রসরাজ ফেসবুকে চালাতে জানেন না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসিরনগরে হামলার এক বছর পর ২০১৭ সালের ১০ই নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়াতে ফেসবুক থেকে ছড়ানো গুজবের জের ধরে এক জনের মৃত্যু হয়। অভিযোগ সেই একই, হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ।

২০১৯ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একটি কথিত বক্তব্য দিয়ে তৈরি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ঘটে সহিংস বিক্ষোভ। এই ঘটনায় চারজন নিহত হন। আহত হন ১০ পুলিশসহ প্রায় দেড়শোরও বেশি।

২০২০ সালের নভেম্বরে কুমিল্লার মুরাদনগরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তির ফেসবুকে কমেন্টের জের ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়ে হামলা এবং ভাংচুর হয়। হেফাজত নেতা মামুনুল হককে উদ্দেশ্য করে দেওয়া এক হিন্দু ব্যক্তির স্ট্যাটাসের কারণে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে হামলা ভাংচুর ও লুটপাট চালায় কয়েক হাজার মানুষ। কুমিল্লায় নানুয়ার দীঘি এলাকার একটি পূজামণ্ডপের প্রতিমাকে ঘিরে ধর্মীয় বিতর্কিত ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads