• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
চাপ বাড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্তে

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

চাপ বাড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্তে

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ২০ মে ২০২২

মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে খুব চাপে আছেন তারা। কিছু পরিবার বিকল্প খাদ্যে ক্ষুধা নিবারণ করছে। কারণ সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতির হার আরো চড়েছে। এপ্রিল মাসে ৬ দশমিক ২৯ উঠেছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। যা দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের মাস মার্চে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। সরকার বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া হিসাবের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বাস্তবে অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বলতে হয় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি আমরা। তাই নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে টানা ছয় মাস বাড়ার পর জানুয়ারিতে কমেছিল এই সূচক। ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার চড়ছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বুধবার রাতে মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) গত এপ্রিল মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের এপ্রিলে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৬ টাকা ২৯ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এই মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বিবিএসের তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসের মতো এপ্রিলে শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে; এই মাসে গ্রামে মূল্যম্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর শহরে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের চেয়ে গ্রাম এলাকায় পণ্যমূল্য বেড়েছে বেশি।

তবে সরকার বা বিবিএসের দেওয়া হিসাবের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বাস্তবে অনেক বেশি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলছে, দেশে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার বিবিএসের চেয়ে দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। গত ৩ মার্চ ‘মূল্যস্ফীতি : সরকারি পরিসংখ্যান বনাম প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সানেম। এতে বলা হয়েছে, শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখন ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর গ্রামে এই হার ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, পণ্যমূল্য নিয়ে সরকারি সংস্থা বিবিএস যে তথ্য দিচ্ছে, তা বাস্তবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ক্ষেত্রে যদি সঠিক তথ্য তুলে আনা না হয়, তবে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। তিনি বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ খুবই চাপে আছে। ভাত না খেয়ে অন্য কিছু খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছে অনেক মানুষ।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিবিএসের মূল্যস্ফীতির হিসাব বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। বাজারের যে অবস্থা তাতে মূল্যস্ফীতি এখন ১২ শতাংশ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। বিবিএস ২০০৫-২০০৬ সালের ভোক্তাদের মাথায় রেখে মূল্যস্ফীতি ঠিক করে। ১৭ বছর পরে সেই মানুষদের পরিবর্তনকে তারা ধরছে না। গ্রামে মূল্যস্ফীতি শহরের চেয়ে বেশি। নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকারের মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। কেননা, বাজারের পণ্যমূল্যের সঙ্গে বিবিএসের তথ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও বিবিএসের তথ্যকে মেনে নিয়ে যদি বলি, তাহলেও বলতে হয় একটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি আমরা। গত কয়েক মাস ধরেই কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে অবশ্য বৈশ্বিক বাজারেরও একটা প্রভাব আছে। বিশ্ববাজারে সব জিনিসের দামই বেশ বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরো বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। তার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়বে। তাই আমার বিবেচনায় মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। নতুন বাজেটে সে বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বিবিএসের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, দেড় বছর পর গত বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ‘ঘর’ অতিক্রম করে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে ওঠে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০ সালের জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এর পর থেকে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচেই অবস্থান করছিল। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছ-মুরগিসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় খাবারের দাম বৃদ্ধির কারণে এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ১৮মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে ২০২০ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ১২ মাসের গড় হিসাবে এপ্রিল শেষে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে এই লক্ষ্য ধরা ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছর শেষ হয় ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে। অর্থাৎ বাজেটের লক্ষ্যের চেয়ে খানিকটা বেশি ছিল গড় মূল্যস্ফীতি।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। তার প্রভাব পড়েছে ছোট-বড় সব দেশে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা পূর্বাভাস দিচ্ছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে।

এদিকে শুধামাত্র মে মাসে নিত্যপণ্যের দাম রোজায় বাড়া দামকেও হার মানিয়েছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ১৮ মে এই এক মাসে শুধু ব্রয়লার মুরগি ছাড়া আর কোনো নিত্যপণ্যের দাম কমেনি। বেড়েছে অধিকাংশ পণ্যের দাম। কিছু নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে বলেও জানা গেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান টিসিবি রাজধানীর বাজারের ৩২ ধরনের খাদ্যপণ্যের দামের হিসাব রাখে। তাদের গত এক মাসের হিসাবে দেখা গেছে, ৩২ খাদ্যপণ্যের মধ্যে ১৯টির দাম বেড়েছে। কেবল একটি পণ্যের দাম কমেছে। আর স্থিতিশীল রয়েছে ১২টির মূল্য।

টিসিবি হিসাব বলছে, এক মাসের ব্যবধানে বাজারে মোটা চাল, আটা, ময়দা, সয়াবিন, পাম অয়েল, মসুর ডাল, ছোলা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, শুকনা মরিচ, হলুদ, আদা, জিরা, তেজপাতা, গুঁড়া দুধ, চিনি ও ডিমের দাম বেড়েছে। শুধু কমেছে ব্রয়লার মুরগির দাম। গত মাসের তুলনায় ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ৫ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।

অপরদিকে, গত একমাসের ব্যবধানে মুগডাল, অ্যাংকার ডাল, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনিয়া, রুই মাছ, ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, খাসির মাংস, খেজুর ও লবণের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ এসব পণ্য রমজানে যে দামে বিক্রি হয়েছে, এখনো সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে। যেসব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তা সর্বনিম্ন দেড় শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এই এক মাসে। এর মধ্যে সবেচেয় বেশি বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। এছাড়া আটা-ময়দা, ভোজ্যতেল, মসুর ডাল, ডিম, আদা, রসুন ও আলুর দাম বেড়েছে ১০-২৯ শতাংশ পর্যন্ত।

গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৩-১৫ টাকা, আটা ৭, ময়দা ১০-১৪, সয়াবিন তেল ৩০-৩৫, পাম অয়েল ৩০-৩২, রসুন ৩০, আদা ৩০, মসুর ডাল ১০-১৫, আলু ৪-৫, ডিম (হালি) ৫-৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ক্রেতারা অভিযোগ করে বলছেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে এসব পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। যেহেতু এসব পণ্য না কিনে চলা যায় না, তাই ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের জিম্মি করে পকেট কাটছেন।

সয়াবিন তেল নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সারা দেশে ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে হাজার হাজার টন ভোজ্যতেল উদ্ধার, তাদেরকে জরিমানা করার পর ক্রেতারা ব্যবসায়ীদের ওপর আরো বিশ্বাস হারিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন, যার অন্যতম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া কিছু পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads