• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
নিয়োগবাণিজ্য বাড়ছে রেলে

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

নিয়োগবাণিজ্য বাড়ছে রেলে

  • রতন বালো
  • প্রকাশিত ২০ মে ২০২২

তদন্ত কমিটির নামে ছোট থেকে বড় সব অপরাধ ঢেকে রাখা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের। এসব কমিটি তদন্তের নামে, কোনো অপরাধেরই গুরুদণ্ড দেয় না। কৌশলে এসব দুর্নীতি আড়াল করে রাখার সংস্কৃতির কারণে রেলে অবৈধ নিয়োগবাণিজ্য ডালপালা ছড়িয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার পর তার এপিএসসহ রেলের কর্মকর্তারা নিয়োগবাণিজ্যের ৭০ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছিলেন পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের সামনের সড়কে।

ওই দুর্নীতির ঘটনায় মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হন প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন। এরপর রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা ইউসুফ আলী মৃধাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের জেল হয়েছে। তারপরও থেমে নেই ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগবাণিজ্য। সম্প্রতি পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা (ডিসিও) নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে লেবার সর্দার নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও হয়েছে। তাকে শোকজও করা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি শোকজের জবাব দেননি ডিসিও।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে তদন্তে নেমে এসব দুর্নীতির প্রমাণও পেয়েছে। যেমন-২০১৬ সালের জুলাইয়ে সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে ২৫৭ জনের নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতি হয়। নিয়োগ তালিকা প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের টেবুলেশন শিট করা হয়নি, কোটা ব্যবস্থারও অপপ্রয়োগ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ কমিটির কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় দুর্নীতিবাজ চক্র কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার বাণিজ্য করে।

এছাড়া প্রার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছেন, উত্তীর্ণও হয়েছেন, সব যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি পাননি এমন অভিযোগও রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রার্থী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকা জোগাড় করেছিলাম, তা দিয়ে চাকরি নিতে চেয়েছিলাম। তারপরও চাকরি হয়নি, কারণ ১০ লাখ টাকা দিতে পারিনি। ক্ষুব্ধ এই চাকরি প্রার্থী অভিযোগ করেন, পূর্ব ও পশ্চিম রেলে নিয়োগ পরীক্ষার আগেই এজেন্ট দিয়ে ঘুষ তোলা হয়ে থাকে।

এদিকে নাসির উদ্দিনের বিষয়ে মন্ত্রী বা মন্ত্রীর পিএস’র আত্মীয়-স্বজনের রেফারেন্সে কোনো অবৈধ সুযোগ-সুবিধা না দেয়ার জন্য গত ১ মে একটি নির্দেশনা দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। এর আগেও যশোর ও সিঙ্গিয়া স্টেশনে ঘুষ নিয়ে লেবার সর্দার নিয়োগ দিয়েছিলেন পাকশী ডিসিও নাসির উদ্দীন। এক সপ্তাহেও ডিসিও পাকশী শোকজের জবাব রেল ভবনে পৌঁছায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) অসীম কুমার তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পাকশীর ডিসিওর এক আত্মীয় মারা যাওয়ার কারণে এখনো তিনি কাজে যোগ দেননি। তাই তার শোকজের জবাব এখনো পায়নি।

এর আগে চার দফা নির্দেশনা দিলেও কোনো কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রীর একান্ত সচিব (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। তিনি জানান, কয়েক মাস আগে আমার রেফারেন্সে এক বন্ধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন থেকে একটি টিকিট সংগ্রহ করেছিলো। এ কথা আমার বন্ধু নিজেই আমাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে। পরে আমি ওই স্টেশন মাস্টারকে এরকম রেফারেন্সে টিকিট দিতে নিষেধ করি। স্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এটা ব্যক্তি পর্যায় বলে করতে পেরেছি।

গত ৮ মে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশনা রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক, সব স্টেশনের ম্যানেজার, স্টেশন মাস্টার ও ট্রেনের পরিচালককের কাছে পাঠানো হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, রেলপথমন্ত্রীর একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের অগোচরে তাদের রেফারেন্সে আত্মীয়, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্টেশনে টিকিট দাবি করা, ট্রেনে উঠে বিশেষ সুবিধা চাওয়া হচ্ছে। এছাড়া অনেকেই মন্ত্রীর একান্ত সচিব, সহকারী সচিব এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে রেলের পরিচালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য মোবাইলে যোগাযোগ করছেন।

এ বিষয় জানার পর তা রেলপথ মন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। এ ধরনের সুবিধা যারা চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এবং যেসব মোবাইল নম্বর থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে সেই নম্বরগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠিয়ে ওই ব্যক্তিদের সঠিক পরিচয় জানার নির্দেশ দিয়েছেন রেলমন্ত্রী। এ ধরনের ক্ষেত্রে রেল কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত না হয়ে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।

পশ্চিমাঞ্চলের রেলওয়ে সূত্র জানায়, ওই অঞ্চলে প্রতিটি বাণিজ্যিক স্টেশনের ভারতীয় পণ্য লোড-আনলোড করা হয়। সেজন্য প্রতিটি স্টেশনে একজন লেবার সর্দার ও তার অধীনে ২০-৫০ জন লেবার থাকে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা সিঙ্গিয়া স্টেশনে গুডস ইয়ার্ডের মালামাল লোডিং ও আনলোডিংয়ের জন্য মোদাচ্ছের আলী নামের এক ব্যক্তিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে লেবার সর্দার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য সিঙ্গিয়া স্টেশন মাস্টারকে নির্দেশ দিয়েছেন ডিসিও পাকশী নাসির উদ্দীন। অথচ যে কোনো স্টেশনের লেবার সর্দার নিয়োগের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টারের। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যস্থাপক (জিএম) অসীম কুমার তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ ব্যাপারে চিফ কমার্শিয়াল অফিসার (সিসিএম) ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার জানামতে লেবার সর্দার নিয়োগ স্থায়ীভাবে হয়। অস্থায়ীভাবে নিয়োগের কোনো সিস্টেম আছে কি না আমার জানা নেই। এছাড়া সিঙ্গিয়ার মতো ছোট স্টেশনে লেবার সর্দার নিয়োগের দরকার হয় না। তবে এগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রভাব খাটিয়ে করে থাকে বলে জানান তিনি।

এ নিয়ে পাকশির ডিসিও মো. নাসির উদ্দীনের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, কোটা না মেনে ফেনী জেলায় তিনজনের স্থলে ছয়জন, রাজশাহী বিভাগে ৩৫ জনের স্থলে ৪০ জন ও খুলনা বিভাগে ৩২ জনের বিপরীতে ৩৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেধার ভিত্তিতে অর্ধশতাধিক নিয়োগ পেলেও বেশিরভাগ নিয়োগ হয়েছে ঘুষে। সূত্রের অথ্যানুসারে, নিয়োগ পেতে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে অনেককে।

জানা গেছে, রেলে শিক্ষানবিশের একটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। তবে পরীক্ষার আগের দিন রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায় এবং তা বাতিল করা হবে বলে নিয়োগ কমিটি থেকে জানানো হয়। বাতিল না করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালের জুনে। এ ক্ষেত্রেও ঘুষবাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরি পেতে রেল ভবনেও তদবিরকারীদের ভিড় ছিল।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমরা দুর্নীতি রোধে সচেষ্ট আছি। রেলে ৪০ হাজার ২৭৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে শূন্য আছে ১৫ হাজার ৫৫৮টি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৩ হাজার শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে মামলার কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত করতে হয় বলে ডিজি জানান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads