• শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
দেশি গরুতে কোরবানির প্রস্তুতি

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

দেশি গরুতে কোরবানির প্রস্তুতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৮ জুন ২০২২

আগামী জুলাই মাসেই পবিত্র ঈদুল আজহা। এরই মধ্যেই দেশি পশু দিয়েই কোরবানির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার। রাজধানীতে নির্ধারণও করা হয়ে গেছে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর স্থান। আর স্থায়ী হাটগুলোতো আছেই।

এবার করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব না থাকায় গত দুই বছরের তুলনায় কোরবানির পশু বেশি বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নগরবাসীরা বলছেন এবার কোরবানির পশু বিক্রি হবে অন্য দুই বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কোরবানির পশুর সংকটও থাকবে না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু মজুত আছে, তাই এ বছরও কোরবানিতে বাইরের দেশ থেকে একটি পশুও আসবে না। আমাদের যে পরিমাণ পশু উৎপাদন হচ্ছে সেটি চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে।

গত বছর কোরবানিতে উৎপাদিত গরুর এক-দশমাংশ পশু বিক্রি হয়নি। এর সঙ্গে চলতি বছরের জন্য উপযুক্ত পশু মিলে অনেক পশু খামারিদের হাতে রয়েছে। দেশের খামারি এবং গৃহস্থের কাছে থাকা গবাদি পশু দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে।’

তিনি আরো বলেন, চলতি বছর করোনা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। গত বছরের মতো খামারিদের গরু নিয়ে ফিরে যেতে হবে না। উপযুক্ত দামেই গরু বিক্রি করতে পারবেন। বর্ডার এরিয়ায় আরো কঠোর হতে বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশনা দিচ্ছি, যাতে আমাদের দেশে বাইরের পশু না আসে। বাইরের পশু রোগ নিয়ে এলে সেটি ছড়িয়ে যেতে পারে। করোনা থেকে যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য আমরা অনলাইনে পশু বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলাম। এবার সেই প্রক্রিয়াও থাকবে, হাট-বাজারেও বিক্রি হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদা বলেন, চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২১ লাখের বেশি, যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। ধারণা করছি গতবারের তুলনায় এবার কোরবানি বেশি হবে। গতবার যেই সিচ্যুয়েশন ছিল তার থেকে কিন্তু আমরা ওভারকাম করেছি। গত বছর অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও কিন্তু প্রায় ৯১ লাখ গবাদি পশু কোরবানি হয়েছে, এবার হয়তো তার চেয়ে বেশিই হবে। এ বছর যেন কোরবানির পশুর অভাব না হয় সেই প্রস্তুতি কিন্তু আমাদের রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিনাত সুলতানা বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য আট বিভাগের ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৩২টি খামারের তথ্য অনুযায়ী পশুর পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

এদিকে, পশুর খামারিরা আশা করছেন, গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর দামও ভালো পাবেন তারা। তাদের আশা গত বছর অনেক পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। সেসব পশুর তারা এবার বিক্রি করতে পারবেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এবারের ঈদে কোরবানির জন্য এক কোটি ২১ লাখ গবাদি পশু প্রস্তুত রয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে দুই লাখের বেশি। সাধারণ নিত্যপণ্যের মতো গো-খাদ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলায় উদ্বিগ্ন খামারি ও পশু পালনকারীরা। ধানের খড়, গমের ছাল, সরিষা, ছোলা, ভূসি, খেসারি, ভূট্টা, ভুট্টা পাউডার, চালের খুদ, খৈল ও চিটাগুড়ও বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। তবে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রপ্তানি চালু রাখা ও গম আমদানি কমে যাওয়ার অজুহাত দিয়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন উৎপাদনকারী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সব গো-খাদ্যের দাম প্রতি মণে অন্তত দুশো টাকা বেড়েছে। এই দাম অব্যাহত বেড়েই চলছে। ঈদের সময় পশু খাদ্যের দাম আরো বাড়ার অশঙ্কা করছেন তারা। তাই এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি তাদের।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজধানীতে মোট ১৯টি কোরবানির পশুর হাট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দুটি হলো স্থায়ী হাট, যেগুলোতে বছরের অন্য সময়ও পশু বিক্রি হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে রয়েছে গাবতলী স্থায়ী হাট আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রয়েছে সারুলিয়া স্থায়ী হাট। এই হাট দুটি ছাড়া ১৭টি অস্থায়ী হাট বসানো হবে। অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবে ১০টি আর উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবে ৭টি। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল হাট চালু থাকবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এবারের ঈদে কোরবানির জন্য ১ কোটি ২১ লাখ গবাদি পশু প্রস্তুত রয়েছে। যা গতবছরের চেয়ে দুই লাখের বেশি। সাধারণ নিত্যপণ্যের মতো গো-খাদ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলায় উদ্বিগ্ন খামারি ও পশু পালনকারীরা। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রপ্তানি চালু রাখা ও গম আমদানি কমে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন উৎপাদনকারী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সব গো-খাদ্যের দাম প্রতি মণে অন্তত দুশো টাকা বেড়েছে। এই দাম অব্যাহত বেড়েই চলছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যে ১০ স্থানে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসবে সেগুলো হলো-লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন আশপাশের খালি স্থানে, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থানে, শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন খালি স্থানে, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার মৈত্রী সংঘের ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি স্থান, হাজারীবাগ এলাকায় ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠসংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা এবং লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গাসহ কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের এলাকায় অস্থায়ী হাট বসবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে সাত স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসবে- ভাটারা (সাইদনগর) পশুর হাট, কাওলা শিয়ালডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বছিলায় ৪০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় অবস্থিত বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা, বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং ব্ল-ই থেকে এইচ পর্যন্ত এলাকার খালি জায়গা এবং ৩০০ ফিট সড়ক সংলগ্ন উত্তর পাশের সালাম স্টিল-যমুনা হাউজিং কোম্পানির খালি জায়গা ও এর পাশে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন খালি জায়গা মিলিয়ে অস্থায়ী পশুর হাট বসবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবার ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানিযোগ্য মোট পশু আছে ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি। প্রশিক্ষিত খামারিদের কাছ থেকেই আসবে ৭৫ লাখ ৯০ হাজার ৪৪২টি। ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৭টি কোরবানিযোগ্য উৎপাদিত পশু গৃহপালিত। কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৩৮৩টি। আর ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৫৯৭। এছাড়া অন্যান্য পশু অর্থাৎ উট, দুম্বার সংখ্যা ১ হাজার ৪০৯টি।

এ বছর সবচেয়ে ভালো পশু উৎপাদন হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯ খামারির কাছ থেকে আসবে ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৬০টি পশু। চট্টগ্রাম বিভাগের ৮৬ হাজার ৩৬ জন খামারির কাছ থেকে আসবে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ১১৪টি পশু। রংপুর বিভাগের ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৪০ খামারির কাছ থেকে আসবে ১০ লাখ ৩ হাজার ২৮১টি পশু। খুলনা থেকে আসবে ৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৫১টি পশু। ঢাকা বিভাগ থেকে আসবে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৬টি পশু। বরিশাল বিভাগ থেকে আসবে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৩টি পশু। ময়মনসিংহ থেকে আসবে ২ লাখ ৯ হাজার ৩৪৪টি পশু এবং সিলেট থেকে আসবে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫৩টি পশু।

গত বছর করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সরকার অনলাইন প্ল্যাটফরমে গবাদি পশু ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম গ্রহণ করে। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আইসিটি বিভাগসহ অন্যান্য দপ্তর-সংস্থা, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ অন্যান্য বেসরকারি সংগঠন ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গবাদি পশুর ডিজিটাল হাট পরিচালনা করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর অনলাইনে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৯টি গবাদি পশু বিক্রয় হয়েছে যার আর্থিক মূল্য ২ হাজার ৭৩৫ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৮ টাকা।
গত বছর অনলাইন প্ল্যাটফরমে গবাদি পশু বিক্রয় হয়েছিল ৮৬ হাজার ৮৭৪টি, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৫৯৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪ হাজার ৮২৯ টাকা, যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি। এ বছরও অনলাইন প্ল্যাটফরমে গবাদি পশু ক্রয়-বিক্রয়ের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

পরিবহন খরচ কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের ট্রাক আগে যেখানে তিন-চারদিন ফেরির অপেক্ষায় থাকত। এবার সেসব সমস্যা আমাদের থাকবে না, নির্বিঘ্নে পশু পরিবহন হবে। পরিবহন খরচটা কিন্তু তাদের মিনিমাইজ হবে। খাদ্যমূল্য বেশি ঠিক, তবে আমাদের ক্রয়মূল্য বেড়েছে। সবকিছুর সমন্বয়ে আমরা আশা করছি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। অনেক মূল্য হবে তা কিন্তু নয়।

গরুর খামারি পলাশ বলেন, আমার ঢাকার যাত্রাবাড়ি এবং রাজধানীর বাইরে একটি করে খামার রয়েছে। দুইটি খামারে প্রায় দুই শতাধিক গরু আছে। পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় দিন দিন খরচ বাড়ছে। তবে এবার ঈদে আশা করছি সবগুলো গরু বিক্রি হলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

পাইকারি পশু বিক্রেতা সজল বলেন, গত দুই বছর করোনার প্রকোপ থাকায় বেশি পশু বিক্রি করতে পারিনি। এবার আশা করছি গত দুই বছরের চেয়ে বেশি পশু বিক্রি করবো। এবার সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে রাস্তায় কোরবানির পশু পরিবহন থেকে যদি আমাদের চাঁদা দিতে হয় সেক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় লোকসানও হয়। এবার যাতে পশু পরিবহন ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি না হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি ব্যবস্থা নেয় তাহলে ভালো হবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads