• বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯
পাহাড়ে ফের তৎপর সশস্ত্র সংগঠন

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

পাহাড়ে ফের তৎপর সশস্ত্র সংগঠন

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ৩০ জুন ২০২২

পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অপতৎপরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পিজেএসএস (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি) ও ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) পর কথিত নতুন আরেক সংগঠনের আবির্ভাব ঘটেছে- কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট)। ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ২৫ বছর আগে। কিন্তু শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী জেএসএস এবং শান্তিচুক্তির বিরোধী ইউপিডিএফ অব্যাহতভাবে পাহাড়কে অশান্ত করে রেখেছে। শুধু তা-ই নয়, আঞ্চলিক এই দুটি দলের নীতিনির্ধারকরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার দুঃস্বপ্নও দেখে আসছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাহাড়ে নিরীহ মানুষের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নজর এড়িয়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলো অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব বিষয় শুনে আসছেন বলে স্বীকার করলেও কেএনএফ’র অস্তিত্ব আদৌ কতটুকু তা নিয়ে সন্দিহান। এ সংগঠনের কয়েক ক্যাডার ইতিমধ্যে কয়েক দফায় অবৈধ অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ ওপারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রমতে, সেনাবাহিনী ওই এলাকার বেশকিছু ক্যাম্প তুলে নেওয়ার পর এসব সংগঠন মাথাচড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে নতুন করে এসব এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি।

স্থানীয় সূত্রমতে, জেএসএস এবং ইউপিডিএফ দু’ভাগ হয়ে চার গ্রুপে বিভক্ত। আর কেএনএফ রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বান্দরবানের রুমা রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা ও থানচি উপজেলা নিয়ে পৃথক রাজ্য করতে চায়। এসব সংগঠনের নেপথ্যে প্রতিবেশী দেশের ইন্ধন রয়েছে বলে সূত্রের ধারণা। জেএসএস ও ইউপিডিএফ মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর আধিক্যে গড়া। আর কেএনএফ ক্ষুদ্র ছয় নৃ-গোষ্ঠী অর্থাৎ বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং সম্প্রদায়ের অপেক্ষাকৃত সব দিক থেকে এগিয়ে থাকা সদস্যদের নিয়ে গড়া বলে নিজেদের প্রচার রয়েছে।

পাহাড়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোর জেএসএস এবং ইউপিডিএফের নজিরবিহীন চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে বিপর্যস্ত। বর্তমানে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে কেএনএফের সঙ্গে জড়িতদের চাঁদাবাজি ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করছে। মূলত ২০০৮ সালে কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-কেএনডিও নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটির জন্ম। পরে ২০১৭ সালে হয়েছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্স-কেএনভি। আরো পরে হয়েছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ। এর সশস্ত্র উইংয়ের নাম কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি-কেএনএ। শুরুতে এদের ভারতের মণিপুর এবং মিয়ানমারের চীন রাজ্যের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। ওই সব রাজ্যে এদের ক্যাডারদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই তিন সংগঠনের পুরো কার্যক্রমই মূলত সন্ত্রাসী তৎপরতার অংশ। দিন যতই গড়াচ্ছে, এসব সংগঠনের অপতৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। জেএসএস যেমন আলাদা জুম্মল্যান্ড করার দুঃস্বপ্ন নিয়ে পতাকা, মুদ্রা এমনকি জাতীয় সংগীতও প্রণয়ন করেছে। একইভাবে কেএনএফও তৈরি করেছে তাদের মানচিত্র, পতাকা, মুদ্রা ও লোগোর চিত্র।

গত ২২ জুন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম বড়থলি ইউনিয়নে সশস্ত্র হামলায় চারজন নিহত হওয়ার দাবি করছেন ওই এলাকার চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ইউনিয়ন সভাপতি আতুমং মারমা। বিলাইছড়ি উপজেলায় কুকি চীন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) হামলায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) সদস্য তারা। নিহতরা হলেন- বৃষচন্দ্র ত্রিপুরা (৫২), তার ছেলে ধনরাম ত্রিপুরা (১৬), সুভাস চন্দ্র ত্রিপুরা (২৩) ও বীর কুমার ত্রিপুরা (২০)।

এর আগে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) তিন সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে নিজেদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে বিবৃতি দিয়েছে কেএনএফ।

তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে বিবৃতিতে জানায়, সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে উল্লেখ করে জানিয়েছে, ২১ জুন সন্ধ্যায় বিলাইছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম বড়তলী ইউনিয়নের জাইজাম পাড়ায় সদ্য গঠিত জেএলএর সশস্ত্র বেসমেন্ট ক্যাম্পে কেএনএফের স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স হেড-হান্টার টিম সফলভাবে হামলা চালায়। এতে জেএলএর তিনজন সশস্ত্র সদস্য ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আর আহত অবস্থায় জেএলএর বেশ কয়েকজন সদস্য পালিয়ে পালিতে যায়। কেএনএফ আরো দাবি করছে, দীর্ঘদিন ধরে জাইজাম এলাকায় স্থানীয় নিরীহ বম, খিয়াং, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। কিন্তু জেএলএ ওই গ্রামবাসীকে সেখান থেকে চলে যেতে হুমকি দেয় এবং নির্যাতন করে। যে কারণে ভয়ে স্থানীয়রা তাদের সহায়-সম্পদ ফেলে পালিয়ে যান। জেএলএর এসব অপকর্ম বেশ কয়েকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করেছে কেনএফ বাহিনী।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে কিছু সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতায় সেখানে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের তৎপরতা বাড়িয়ছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে এ সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads