• শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
এবার বন্যার অবনতি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে

সংগৃহীত ছবি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

এবার বন্যার অবনতি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ২১ জুন ২০২২

সিলেট ও সুনামগঞ্জের পর এবার বন্যাপরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে। এরইমধ্যে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ ও ফরিদপুরের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। বন্যার কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ জেলায় ১০ হাজার ৮৯৪ হেক্টর জমির ধানসহ বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যায় প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্য বিভাগের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম বেসরকারিভাবে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ালেও জেলা প্রাশাসনের দেওয়া তথ্য মতে ৪৯টি ইউনিয়নে ৮৭ হাজার ২৩২ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ৮৫টি মেডিকেল টিম, ৯টি উপজেলায় একটি করে মনিটরিং টিম এবং সিভিল সার্জন অফিসে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে ১৮টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সকালে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৫১ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৪৪ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানায় কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্র।

সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের গারুহাড়া গ্রামমর সবুর মিয়া বলেন, অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছি। কিন্তু বন্যার পানিতে সব মাছ ভেসে গেছে। এতে আমার দেড় থেকে ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ওই ইউনিয়নের মিলপাড়া গ্রামমর শরিফ বলেন, বাড়িতে বন্যার পানি উঠায় গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে এসেছি। এখন রাস্তায় থাকা লাগবে। বাড়ি থেকে পানি নেমে গেলে তারপর বাড়ি যাব।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার জানান, ৪৯ ইউনিয়নে ৮৭ হাজার ২৩২ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। তবে সব উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে তথ্য না আসায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যাবে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কালিপদ রায় জানান, চলতি বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ৭৪২টি পুকুরের ৭০৫ জন মৎস্য চাষির ১১৫ মেট্রিক টন মাছ ভেসে গেছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হাই সরকার জানান, বন্যায় প্রায় অর্ধশতাধিক মুরগি মারা গেছে। এছাড়া গো-চারণভূমি, খড় ও দানাদার শস্য তলিয়ে যাওয়ায় ১১ লাখ ৫২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ১৮টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুর রশীদ জানান, এখন পর্যন্ত বন্যায় ১০ হাজার ৮৯৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে কর্মকর্তারা পরামর্শ দেওয়াসহ তথ্য সংগ্রহ করছেন।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মঞ্জুর-এ-মোর্শেদ জানান, বন্যার্তদের সহযোগিতায় মেডিকেল টিমের সদস্যরা বন্যাকবলিত এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, কলেরা স্যালাইন ও প্রায়োজনীয় ওষুধপত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রাকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, নাগেশ্বরীতে বেড়িবাঁধের ৫০ মিটার ওয়াস আউট হয়ে গেছে। এ ছাড়া দুধকুমর নদীর কালীগঞ্জ, বামনডাঙ্গা ও ধাউরারকুটি এলাকায় বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বন্যার পানি আরও তিন দিন বাড়বে। এরপর কমতে শুরু করবে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বন্যার প্রস্তুতি হিসেবে জেলা প্রশাসক দপ্তরে একটি সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সকল দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রদান করতে বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০ লাখ টাকা এবং ৪০৭ মেট্রিক টন চাল মজুত রয়েছে। এছাড়া আরও ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। জেলার দুই পয়েন্টেই পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চলের একের পর এক এলাকা। জেলার বেলকুচি, কাজিপুর, চৌহালী, এনায়েতপুর ও শাহজাদপুরের চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর পয়েন্টে সোমবার দুপুর ১২টায় যমুনার পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার এবং শহররক্ষা বাঁধ হার্ডপয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার ওপরে রেকর্ড করা হয়।

এতে নিম্নাঞ্চলের মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়ি ছেড়েছেন। কেউ ঠাঁই নিয়েছেন উঁচু বাঁধ বা নির্মাণাধীন ভবনে আবার কেউ রাস্তার ধারে ছাপরা ঘর করে থাকছেন।

দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে পানি বাড়ায় যমুনার চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ফুলজোড়, করতোয়া, বড়াল, হুড়াসগর, ইছামতীসহ চলনবিলের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পানি জমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কাঁচা পাট, তিল, কাউন, বাদামসহ বিভিন্ন শাকসবজি। লোকসানের মুখে পড়েছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনার পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২২ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত পানি বাড়ার আশঙ্কা আছে। এর মধ্যে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। স্বাভাবিক প্লাবন হলেও বন্যা বা আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা কম।

ফরিদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পদ্মার গোয়ালন্দ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। এতে মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের পানি বেড়ে নিম্ন অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গোয়ালন্দ পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ লিডার সালমা খাতুন জানান, গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি গত ২৪ ঘন্টায় ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার সীমায় প্রাবাহিত হচ্ছে। যা বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৭০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রাবাহিত হচ্ছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দুই-এক দিনের মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করবে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে। পানি বাড়তে থাকলে পদ্মার ভাঙন তীব্র হওয়ার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। জেলা সদরের ডিক্রিরচর, চরমাধবদিয়া ও নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন এবং চরভদ্রাসন উপজেলার চার ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে।

ফরিদপুর সদরের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের আইজুদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী এলাকার মাসুদ সরদার জানান, সাত-আট দিন ধরেই পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দুইদিন ধরে পদ্মার পানি হু হু করে বাড়ছে। একই ইউনিয়নের কাইমুদ্দিন ডাঙ্গী এলাকার হাজেরা খাতুন বলেন, দুদিন ধইরা যেমন কইরা পানি বাইড়্যা বাইস্যা অ্যয়ে যাচ্চে তাতে বয়্যে (ভয়ে) আছি। কি থ্যাইকা কি অ্যয়ে (হয়ে) যায়।

ফরিদপুরের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান মুস্তাক বলেন, দুদিন ধরে হু হু করে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় ১ ফুট পানি বেড়েছে। এই ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ এলাকায় বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

চরমাধবদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা সাইফুল ইসলাম আজম বলেন, পদ্মার পানি হঠাৎ বাড়ায় ইউনিয়নের অধিকাংশ বাদাম ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সব ফসল তলিয়ে যাবে। ইউনিয়নের কমপক্ষে সাতশ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চরভদ্রাসন উপজেলার চার ইউনিয়নে তিন শতাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রাকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা জানান, জেলায় হঠাৎ বন্যার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফরিদপুরে পদ্মা, মধুমতি ও আড়িয়াল খাঁর পানি বাড়ে চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রাশাসক (সার্বিক) দীপক কুমার রায় বলেন, ত্রাণ বিতরণের মতো বন্যা এখনো হয়নি। তবে বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রাশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। ফরিদপুরের নয় উপজেলার ইউএনওকে সাত টন করে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৫০ টনের বেশি ত্রাণ মজুত আছে।

জেলা প্রাশাসক অতুল সরকার বলেন, এ অঞ্চলে বন্যায় আতঙ্কিত হবার মতো কিছু হয়নি। তবুও বন্যা পূর্বাভাস ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি টিম গঠন করা হয়েছে। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads