• সোমবার, ৮ আগস্ট ২০২২, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯
উত্তরে বাড়ছে বন্যা, উদ্বিগ্ন লাখো মানুষ

সংগৃহীত ছবি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

উত্তরে বাড়ছে বন্যা, উদ্বিগ্ন লাখো মানুষ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২২ জুন ২০২২

ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার। গতকাল মঙ্গলবার লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপৎসীমা ছুঁয়েছে। তবে ধরলার পানি বিপৎসীমার খানিকটা নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু গাইবান্ধার চার উপজেলার ২০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। আর ফরিদপুরে পদ্মানদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সৃষ্ট হয়েছে তীব্র স্রোত। এ কারণে নদী রক্ষাবাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এদিকে সিরাজগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে যমুনা নদীর পানি বাড়ায় তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক এলাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, তিস্তা নদীর পানি গতকাল সকালে ডালিয়া পয়েন্টে ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলা নদীর পানি শিমুলবাড়ি পয়েন্টে গতকাল কমে ৩১ দশমিক শূন্য ৪ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি বিপৎসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফা-উদ-দৌলা জানান, সোমবার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার তা বিপৎসীমা বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে।

অন্যদিকে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, ধরলা নদীর পানি গত দুই দিন ধরে ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সোমবার তা কমে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের আংশিক প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষের জন্য ১৫০ টন জিআর চাল ও ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমরা খোঁজ রাখছি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।

এদিকে, ফরিদপুরের পদ্মানদীবেষ্টিত চরভদ্রাসনে চর হরিরামপুর ইউনিয়নের সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী এলাকায় এ ভাঙন দেখা দিয়েছে। পদ্মানদীর লোহারটেক কোলের সংযোগ বাঁধেও দেখা দিয়েছে ভাঙন। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়টি। ইউনিয়নের সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী গ্রামে নদীর বাঁধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বালুভর্তি জিওব্যাগের ডাম্পিংকৃত প্রায় ১০ মিটার জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, পদ্মানদী ও লোহারটেক কোলের সংযোগ স্থলে তীব্র স্রোত দেখা দেয়। এরপরই বালুভর্তি ডাম্পিংকৃত জিওব্যাগ নদীতে তলিয়ে যেতে থাকে। লোহারটেক গ্রামের বাসিন্দা রহমত খান বলেন, বাঁধের কাজ শুরু হওয়াতে আশা ছিল আর হয়তো ভাঙবে না। কিন্তু হঠাৎ ভাঙন দেখা দেওয়ার পর চিন্তায় আছি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় যাব।

সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল্লাহ বলেন, হঠাৎ পদ্মায় পানি বেড়ে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাঙন বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তিনি বিদ্যালয়ের ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চলমান রাখতে ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।

চর হরিরামপুর ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ খান জানান, পদ্মানদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র স্রোতের কারণে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এ এলাকায় একটি প্রাইমারি স্কুল ও প্রায় সাড়ে তিন-শ পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙনরোধে কাজ চলছে। বালুভর্তি জিওব্যাগের ডাম্পিং করা হচ্ছে। একেকটি বালুভর্তি জিওব্যাগের ওজন প্রায় তিনশ মণ। সেটাও ফেলার সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে। কাজের পরিমাণ ও গতি বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম সাহা বলেন, ভাঙনরোধে কাজ চলছে। সবুল্লা শিকদারের ডাঙ্গী গ্রামে দুইশ মিটার স্থায়ী বাঁধের কাজটি পুরোপুরি সম্পন্ন করা যায়নি। এবছর পূর্ব সতর্কতামূলক প্রকল্প হিসেবে এলাকা ঢালু করে তার ওপর জিওব্যাগের ডাম্পিং করা হয়েছে। ওই স্থানে ভাঙনের খবর তিনি পেয়েছেন। পদ্মানদীর ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতে গাইবান্ধার চার উপজেলার ২০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার পরিবারের ৪০ হাজার মানুষ।

তীব্র স্রোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায়। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে শহর রক্ষাবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ বহু সরকারি স্থাপনা। ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির পাট, কাউন ও সবজি ক্ষেত। কিছু কিছু নিম্নাঞ্চলের কাঁচা সড়কসহ তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বন্যা আর ভাঙন দুইয়ে মিলে চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কে অনেকে বসতভিটা সরিয়ে নিচ্ছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আশওয়কেন্দ্রসহ উঁচু স্থানে ছুটছেন কেউ কেউ।
গত ২৪ ঘণ্টায় ঘাঘট নদীর পানি শহর পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ও করতোয়ার পানি ১১৩ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কন্ট্রোলরুমের দায়িত্বরত অপারেটর খায়রুন্নাহার বেগম।

এছাড়া গাইবান্ধায় পানিবন্দি হয়ে গেছে ৪০ হাজার মানুষ। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পানির প্রবল স্রোতে সদর উপজেলার গোঘাট, সৈয়দপুর, লঞ্চঘাট ও কামারজানি বন্দর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আরো প্লাবিত হয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলসহ শ্রীপুর, বেলকা, কাপাসিয়া, চণ্ডিপুর ও তারাপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম।

ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদের পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় পানি ঢুকে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর, উড়িয়া, গজারিয়া ও এরেন্ডাবাড়িসহ কয়েকটি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোতে। তাছাড়া সাঘাটা উপজেলার পবনতাইড়, মুন্সিরহাট, বাঁশহাটা ও হলদিয়াসহ প্রায় ২০টির বেশি গ্রামের মানুষ বন্যার কবলে পড়েছে।

ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের মধ্য উড়িয়া গ্রামের আবদুল হাই বলেন, এই বয়সে তিন ফিরে বাড়ি পাল্টাইছি। আবার যে, নদী ভাঙতিছে; এবার কোটে যাম। এই বন্যা আসছে; সব পাকেই কষ্ট। কোটে যাম; কি করমো আর কি-বেই খাম।

বালাসীঘাটের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এলাকার কাইয়ারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যার পানিতে ডুবেছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেকোনো সময় পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বিদ্যালয়সংলগ্ন কাইয়ারহাট গুচ্ছগ্রামটি ।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান বলেন, সরকারিভাবে সদর উপজেলায় ২টি ও সাঘাটা উপজেলার ১টি আশ্রয়কেন্দ্রে চার শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্গত এলাকার মানুষজন তাদের গবাদি পশু নিয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।

বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এসএম ফয়েজ উদ্দিন। তিনি বলেন, চার উপজেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তালিকা করে এসব চাল বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সিরাজগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে যমুনা নদীর পানি বাড়ায় তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক এলাকা। বাড়িতে পানি ঢোকায় মানবেতর জীবনযাপন করছে মানুষ। এখনো এসব এলাকায় পৌঁছায়নি ত্রাণ। জেলার দুই পয়েন্টেই যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় কাজিপুর পয়েন্টে ৫৪ সেন্টিমিটার ও শহররক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্টে ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হয়।

যমুনার নিম্নাঞ্চলের পাশাপাশি ফুলজোড়, করতোয়া, বড়াল, হুড়াসগর, ইছামতীসহ চলনবিলের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পানি জমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কাঁচা পাট, তিল, কাউন, বাদামসহ বিভিন্ন শাক-সবজি। লোকসানের মুখে পড়ছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা।

ঘরে পানি ঢোকায় অনেক বাড়িতেই জ্বলছে না চুলা। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়ি ছেড়েছেন। কেউ ঠাঁই নিয়েছেন উঁচু বাঁধ বা নির্মাণাধীন ভবনে আবার কেউ রাস্তার ধারে ছাপরা ঘর করে থাকছেন।

জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আক্তার হোসেন বলেন, সোমবার বিকেলে জেলার পাঁচ উপজেলার জন্য ১৪০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে চৌহালী উপজেলায় ৩ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হবে। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে ৭৭১ টন চাল ও ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা মজুত আছে। দুর্ভোগে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো এই সহায়তা পৌঁছে যাবে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনার পানি দ্রুত বাড়ছে। ২২ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত পানি বাড়ার আশঙ্কা আছে। এর মধ্যে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। স্বাভাবিক প্লাবন হলেও বন্যা বা আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা কম। ভাঙনকবলিত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গোমতী নদীর পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি রয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ওই এলাকার পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পাচ্ছে গোমতীর পানি।

জানা গেছে, পানি বৃদ্ধির ফলে সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকার বাড়ির আঙিনা ডুবে গেছে। ফলে এসব এলাকায় মানুষদের মধ্যে বন্যা আতঙ্ক বিরাজ করছে। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, এখনো ভয়ের কিছু নেই। এদিকে বুড়িচং উপজেলার মিথিলাপুর ও কামারখাড়া এলাকায় নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। রাত সাড়ে ১২টায় এসব এলাকায় মসজিদে মাইকিং করে বাঁধ পাহারা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান ওয়ালিউজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। পানি এখনো বিপৎসীমার ২৫ সেমি নিচে রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়েছি। ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো স্থানীয় লোকজন মিলে সংস্কার করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads