• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

ধর্ম

ভিক্ষাবৃত্তি জায়েজ, তবে নিন্দনীয়

  • প্রকাশিত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

নিজামুল ইসলাম নিজাম

 

 

আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে কাউকে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক বানিয়েছেন। আবার কাউকে করেছেন সম্পদহীন গরিব, মিসকিন, অসহায়। মূলত অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হলেই প্রকৃত ধনী হওয়া যায় না; বরং হাদিসের ভাষ্য মতে, প্রকৃত ধনী হলো ওই ব্যক্তি যে মনের দিক থেকেই ধনী। সুতরাং মহান আল্লাহতায়ালার ফয়সালার উপর অসন্তুষ্টি না হয়ে, তিনি যতটুকু সম্পদ দান করেছেন, তার উপরেই সন্তুষ্টি থেকে জীবনযাপন করাই হলো বান্দার সব  থেকে বড় সফলতা। এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি (জীবনে) সফলতা লাভ করেছে, যে ইসলাম কবুল করেছে এবং তাকে যে পরিমাণ রিজিক তথা সম্পদ দেওয়া হয়েছে তার উপরেই সে পরিতৃপ্ত হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৩১৬)

মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে সময়ের আবর্তনে বিভিন্ন ধরনের পেশা গ্রহণ করে থাকে। কেউবা মাঠেঘাটে কঠোর পরিশ্রম করে হাড় ভাঙ্গা খাটুনির মাধ্যমে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবন নির্বাহ করছে। আবার কেউবা আরাম আয়েশে থেকে খুব জাঁকজমকের সাথে নিজের পরিবার-পরিজনদেরকে নিয়ে জীবনযাপন করছে। কেউবা আবার এক মুঠো খাবারের আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নিজের অসহায়-অক্ষমতার কথা বলে ভিক্ষা করে নিজের জীবন নির্বাহ করছে। দুনিয়াতে যে যেভাবেই জীবন নির্বাহ করুক না কেন; আসলে চরম সত্য কথা হলো, আল্লাহতায়ালাই সব সৃষ্টিকুলের রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। পবিত্র কোরআনুল কারীমে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘জমিনে বিচরণকারী সবার জীবিকার দায়িত্ব একমাত্র (আমি) আল্লাহরই উপরে।’ (সুরা হুদ, আয়াত নং-৬)

শরীয়তে ভিক্ষাবৃত্তিকে জায়েজ করা হয়েছে নিঃস্ব, গরিব, মিসকিন, অসহায়দের কল্যাণার্থে। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা শারীরিকভাবে সক্ষম ও শক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তিকে নিজেদের জীবন নির্বাহের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। যা একেবারেই লাঞ্ছনাকর। আসলে ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে জায়েজ করা হলেও এটি একটি নিন্দনীয় পেশা। কেননা, অন্যের নিকট কিছু চাওয়ার অর্থই হলো নিজেকে অন্যের নিকট ছোট করে পেশ করা। আর সাধারণত ভিক্ষাবৃত্তি পেশাকে সমাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নীচু চোখে দেখা হয়। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি পেশাকে নিরুৎসাহিত করে পবিত্র হাদিসে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন, ‘কষ্ট করে পিঠে বোঝা বহন করে জীবনযাপন করা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে অনেক উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ১৪৭১) অন্য হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-১৪২৭) হাদিস শরিফে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপরের হাত দ্বারা দানকারী ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন এবং নিচের হাত দ্বারা প্রার্থনাকারীকে বুঝিয়েছেন। সুতরাং উপরিউক্ত হাদিসদ্বয় দ্বারা বোঝা যায়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি নিরুৎসাহিত করেছেন এবং কর্মক্ষমতার মাধ্যমে জীবনযাপন করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন।

শরীয়তে ভিক্ষাবৃত্তিকে জায়েজ, তবে কাদের জন্য এবং কোন পরিস্থিতিতে কখন জায়েজ সে ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র হাদিসে স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ সম্পর্কে হজরত আবু বিশর কাবীসা (রা.) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একদা আমি ঋণ পরিশোধে অপারগ হয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে গিয়ে এ ব্যাপারে কিছু সাহায্য চাইলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অপেক্ষা করো। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, ‘হে কাবীসা! তিন ধরনের লোক ছাড়া আর কারো জন্যে (অন্যের নিকট) হাত পাতা তথা ভিক্ষা করা বৈধ নয়। এরা হলো- (১) যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সে ঋণ পরিশোধ করা পর্যন্ত চাইতে পারে। তারপর তাকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বিরত থাকতে হবে। (২) যে ব্যক্তি কোনো কারণে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সেও তার প্রয়োজন মিটানোর উপযোগী সম্পদ চাইতে পারে। (৩) যে ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ কিংবা অভাব-অনটনের খপ্পরে পড়েছে। এ ব্যাপারে তার বংশের অন্তত তিনজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি সাক্ষ্যদান করেছে যে, অমুকের উপর অভাব-অনটন চেপে বসেছে। এরূপ ব্যক্তির পক্ষেও প্রয়োজন মিটানো পরিমাণ সম্পদ প্রার্থনা করা বৈধ। (অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘হে কাবীসা! শুনে রাখ’) এই তিন ধরনের লোক ছাড়া আর কারো পক্ষে অন্যের নিকট হাত পাতা হারাম। যারা এভাবে হাত পাতে আসলে তারা হারাম খায়।’ (মুসলিম, হাদিস নং-২২৯৪)

যে ব্যক্তি নিজের অভাব-অনটনের কথা অন্যের নিকট প্রকাশ করে হাত পেতে ভিক্ষা করে বেড়ায়, প্রকৃতপক্ষে তার অভাব-অনটন কমে না বরং আরো বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের অভাব-অনটনের কথা অন্যের নিকট প্রকাশ না করে মহান আল্লাহর নিকট নিজের অক্ষমতার কথা স্বীকার করে নেয়। আল্লাহতায়ালা তার অভাব-অনটন দূর করে দেন এবং তাকে পূর্ণ সক্ষমতা দান করেন। এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ যদি অভাব-অনটনে পড়ে অতঃপর তা মানুষের নিকট উপস্থাপন করে, তাহলে তার অভাব-অনটন দূর হবে না। আর যে ব্যক্তি অভাব-অনটনে পড়ে, অতঃপর তা আল্লাহতায়ালার নিকট উপস্থাপন করে, তবে অবশ্যই আল্লাহতায়ালা তাকে দ্রুত অথবা বিলম্বে রিজিক দান করেন।’ (তিরমিজি, হাদিস নং-২৩২৬) উল্লেখিত হাদিসে আমাদের জন্য শিক্ষা হচ্ছে, আমরা কখনো নিজেদের অক্ষমতার কথা অন্যের নিকট প্রকাশ করবো না। আমরা আমাদের অক্ষমতার কথা একমাত্র আল্লাহর নিকট প্রকাশ করবো। তাহলেই আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে স্বনির্ভর করে  দেবেন।

যারা সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমাজে ঝঞ্ঝা করে বেড়ায় অর্থাৎ ভিক্ষা করে বেড়ায় তাদের পরকালীন কঠিন শাস্তির ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (অভাবের তাড়না ছাড়াই) নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য মানুষের কাছে সম্পদ ভিক্ষা করে বেড়ায় বস্তুত সে যেন আগুনের ফুলকি ভিক্ষা করছে। কাজেই এখন তার ভেবে দেখা উচিত সে বেশি নেবে না কম নেবে।’ (মুসলিম, হাদিস নং-২২৮৯) যারা অভাবের তাড়না ছাড়াই সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মানুষের নিকট ভিক্ষা করে বেড়ায়, কিয়ামতে তাদের চেহারা এমন বিকৃত হবে যে, তাদেরকে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারবে এরা দুনিয়াতে সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ভিক্ষা করেছিল। তাদের এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সব সময় মানুষের কাছে চেয়ে থাকে, সে কিয়ামাতের দিন এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, তার চেহারায় কোনো গোশত থাকবে না।’ (বুখারি, হাদিস নং- ১৪৭৪)

যারা ভিক্ষাবৃত্তি পেশাকে ছেড়ে দিয়ে কর্ম করে জীবন পরিচালনা করবে, তাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মানুষ যদি তার যথাযথ গুরুত্ব বুঝতো, তাহলে অধিকাংশ মানুষই দুহাতে কর্ম করে জীবন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতো। সে প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে নিশ্চয়তা দেবে যে, সে অন্যের কাছে কিছু চাইবে না, তাহলে আমি তার জান্নাতের জিম্মাদার হবো।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং-১৬৪৩) সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে জায়েজ হলেও তা নিন্দনীয়। কেননা, ভিক্ষাবৃত্তি পেশাকে জীবনধারণের প্রধান উপায় হিসেবে গ্রহণ করতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করছেন। আসলে আমরা যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বর্ণিত উক্ত হাদিসগুলোর মর্মার্থ ভালোভাবে জানতাম, তাহলে কখনো ভিক্ষা করে আমরা জীবনযাপন করতাম না। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে ভিক্ষাবৃত্তি, দারিদ্রতা থেকে এবং বার্ধক্যের চরম পরিণতি থেকে হেফাজত করুন। আমিন!

 

 

শিক্ষার্থী :  ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads