• শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

ধর্ম

ইসলামের দৃষ্টিতে তামাক ও মাদক

  • প্রকাশিত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

এম. আতহার নূর

 

 

 

পবিত্র ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাও। যেটি একটি যৌথ সনদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই পবিত্র সনদটি হলো কোরআন এবং হাদিস। মানবজাতির জন্য কোনটি কল্যাণকর আর কোনটি অকল্যাণকর, সে বিষয়টি কোরআন ও হাদিসকে সূক্ষ্মভাবে গবেষণা করে আমাদের সামনে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুবাহ, হালাল-হারাম ইত্যাদি শরিয়তের বিষয়াবলিকে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরেন দ্বীনের ফকিহ, ইমাম, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ। পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই যার সুন্দর সমাধান আল-কোরআনে নেই। মহান আল্লাহতায়ালা সমস্ত খাদ্যদ্রব্যকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- হালাল ও হারাম। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হালাল ও হারাম কখনো এক নয়।’ (সুরা আল-মায়েদাহ : ১০০ )। নু’মান বিন বাশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহজনক কিছু বস্তু।’ অন্যত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়ে পতিত হলো, সে যেন হারামেই পতিত হলো।’ (আবু দাউদ : ৩৩৩০, ইবনে মাজাহ : ৩৯৪৮)।

বর্তমানে সবাই অবগত যে, ধূমপান, মদপান ও মাদকসেবন সর্বনাশা এক নেশা। যা মানুষের শারীরিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক দিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের অবর্ণনীয় ক্ষতিসাধন করে থাকে। এসবে অভ্যস্তের আখেরে পরিণাম মৃত্যু জেনেও মানুষ নিজ হাতে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ক্ষতিকারক উপাদানগুলোর নিয়মিত সেবনে কতগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করে, যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গিয়ে আঘাত করে। এগুলোর প্রভাবে দেহের প্রতিটি অঙ্গের কার্যক্ষমতা ক্রমশ বিপন্ন হতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে একসময় শরীরে বাসা বাঁধে হাজারো রোগব্যাধি। তাই তো দেখা যায় মাদক ও ধূমপানে আসক্ত ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে বেশি অসুস্থ হয়ে থাকেন। মাদক মানুষকে বেকারে পরিণত করে দেয়। ধূমপান ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির জন্ম দেয়। হূদক্রিয়া বন্ধসহ হাজারো মারাত্মক ধরনের ক্ষতি করে। অনেকে মনে করেন, ধূমপান করলে দেমাগ সতেজ হয়। এটি একটি ভুল ধারণা। ধূমপানের দ্বারা ধীরে ধীরে দেমাগ অকেজো হয়ে যায়। একসময় দেমাগে আর কোনো কাজ করে না। ফলে মানুষ স্ট্রোক করে থাকে। মানুষের জন্য ক্ষতিকর সর্বপ্রকারের নেশাদার বস্তু পানাহার ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এই প্রসঙ্গে বর্তমান যুগের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা শায়েখ ইবনে বাজ (র.) ফতোয়া দিয়েছেন, মাদক, ধূমপান তো অপবিত্র, নিকৃষ্ট এবং অসংখ্য ক্ষতির কারণ। এসবে আসক্তরা ধীরে ধীরে রোগাক্রান্ত হয়। তাদের অন্তর দুর্বল ও শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়। এগুলো যে ‘নীরব ঘাতক’ এ ব্যাপারে এখন কারো দ্বিমত নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সর্বজনীনভাবে এটি স্বীকৃত যে, ধূমপান ও মাদকদ্রব্য যক্ষ্মা, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্ত ও ধূমপায়ীরা সাধারণত একথা বলে যে, কোরআন ও হাদিসে নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। অথচ কোরআনের একাধিক আয়াত ও হাদিসের একাধিক ভাষ্যমতে প্রমাণিত হয় যে, মাদক ও তামাক জাতীয় সব দ্রব্য নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন : ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের সম্মুখীন করো না।’ (সুরা বাকারাহ : ১৯৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করো না।’ (সুরা নিসা : ২৯)। উক্ত আয়াতগুলোতে আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার মানে নিজেকে মেরে ফেলো না। আর জেনেশুনে ধূমপান করা, মাদকদ্রব্য সেবন করা মানে এক ধরনের আত্মহত্যা। যেহেতু এগুলো ধীরগতিসম্পন্ন বিষক্রিয়া, তাই এটা আত্মহত্যা করার মতোই একটা পাপ। তাছাড়া এগুলো কোরআনে বর্ণিত নিষিদ্ধ ‘খবিস’ বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহতায়ালা বান্দার ওপর পবিত্র খাদ্য-পানীয় হালাল করেছেন। অপবিত্র ও খারাপ বস্তু তিনি বান্দার ওপর হারাম করেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যাবতীয় নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৩৯০, মিশকাত : ৩৬৩৮)।

বর্তমান বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা এখন অবগত যে মদ, গাঁজা, মাদক, ধূমপান জিনিসগুলো আসলে এক ধরনের ধীরগতির বিষক্রিয়া। যেভাবেই সেবন করুক না কেন এগুলোর অন্তিম পরিণাম ভয়াবহ ও মারাত্মক। একটা পরিসংখ্যান বলছে, ফুসফুস ক্যানসারে যারা মারা যায়, তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি মৃত্যুর কারণ মাদক, ধূমপান, সিগারেট, গাঁজা, মদ বা এরকম কিছুর কারণেই। জাতিসংঘের মাদকবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধূমপান ও মাদকাসক্তের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। এরপরও মানুষ ধূমপান ছাড়তে রাজি নয়। অথচ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(তোমরা) নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)। পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের দেশে মাদক, ধূমপান ও মাদকদ্রব্য সকল দেয়াল পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সয়লাব ঘটেছে এবং ঘটছে। মাদক, তামাক, ধূমপান একটি বড় ধরনের মহামারীর মতোই একটি মহামারী। যে মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নেশাদার বস্তুর ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। নেশার দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। আর এই দাসত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানো। একজন ধূমপায়ী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ইচ্ছা করে যে, ‘এখন থেকে সে আর সেবন করবে না’ বলে খালেছ দিলে তওবা করে তাহলে মনে রাখবেন, ‘আল্লাহতায়ালা তওবাকারীদের তওবা কবুল করেন।’ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, নিশ্চয়ই তোমরা সফলকাম হবে।’ (সুরা আন-নূর : ৩১)।

 

লেখক : ফাজেল, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

mdatharnur@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads