• রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৭

ধর্ম

সুন্নাত ও বিদআতের পরিচয়

  • প্রকাশিত ২০ মার্চ ২০২১

মোহাম্মদ শরীফ

 

 

 

আল্লাহতায়ালা এই ধরার মাঝে মানবজাতিকে সৃষ্টি করার পর তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। সেই সুমহান ধারার সর্বশেষ পয়গম্বর হলেন রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করা, তার অনুসারী হওয়া, তাকে পরিপূর্ণভাবে সম্মান করা মুসলিম উম্মাহর ওপর আল্লাহপাক ফরজ করে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে নবী আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও , তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মাফ করে দিবেন।’ এ আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মহব্বতলাভের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য অপরিহার্য। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামকে যে যতো বেশি মুহাব্বত করবে তার অনুসরণ-অনুকরণে অগ্রগামী হবে, সে ততো বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে। এক হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, ‘আমার সকল উম্মতই‌ জান্নাতে প্রবেশ করবে।  তবে যারা আমাকে অস্বীকার করে তারা ব্যতীত। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন হে আল্লাহর রাসুল! কারা আপনাকেও স্বীকার করে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যারা আমার আনুগত্য করে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যারা আমার আনুগত্য করে না তারা আমাকে অস্বীকার করে।’

আল্লাহ‌ ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্তর শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। মহান আল্লাহকে তার রুবুবিয়্যাত এবং রাসুলুল্লাহকে আল্লাহর বান্দা ও রাসুলের আসনে সমাসীন রেখেই মহাব্বত-অনুসরণ করতে হবে। কেননা কোরআন ও হাদিসে এবং সাহাবাদের আসার থেকে নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। তাই কোরআন ও সুন্নাহর রাস্তা ব্যতিরেকে মনগড়াভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত প্রকাশের অপচেষ্টা করা নিতান্তই বোকামি বৈ কিছু নয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উম্মতে মুসলিমার কিছু বিদআতপন্থি লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সীমালংঘন করে। আল্লাহর রবুবিয়্যাতের বিভিন্ন গুণাবলিকে রাসুলের জন্য সাব্যস্ত করার মতো স্পর্শকাতর কাজ প্রতিনিয়তই করছে। এমনিভাবে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার নামে এমন কিছু ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে যা সরাসরি শিরক বা বিদআত । নবীজির সাল্লাহু সাল্লামের জন্মবার্ষিকী, মিলাদের নামে ভুল পদ্ধতিতে দরুদ পাঠ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাজির-নাজির বিশ্বাস করে মিলাদের মজলিসে কিয়াম করাসহ অসংখ্য শরিয়ত বহির্ভূত শিরক-বিদআত আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার নিমিত্তে করা হচ্ছে। যা খুবই নিন্দনীয়!

দীন ইসলাম আল্লাহর সর্বশেষ পরিপূর্ণ ধর্ম ও জীবনবিধান। তাই এই তালাবদ্ধ পরিপূর্ণ জীবনবিধানে কোনো প্রকার সংযোজন-সংকোচন, সংশোধন কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোনো অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ দশম হিজরি সনের ৯ জিলহজ্জে  বিদায় হজ্জের দিনে সোয়া লক্ষ সাহাবা (রা.)-এর সম্মুখে ইসলামকে পরিপূর্ণতার ঘোষণা দেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। আর তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করলাম।’ (সুরা মাযয়িদাহ, আয়াত-৩) সুতরাং দীন-ইসলাম পরিপূর্ণ। আকিদা ও আমলের সমষ্টির নাম হচ্ছে দীন। তাই আমল ও আকিদা উভয়ের মধ্যে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোনো সুযোগ নেই। দিনের প্রয়োজনীয় সব বিষয়াদি পবিত্র কোরআন ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম হাদিস শরিফে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। শরিয়তের অকাট্য দলিল দ্বারা সমর্থিত নয় এমন কোনো বিষয়াদি দিনের মধ্যে সংযোজন করলে তা হবে স্পষ্ট বিদআত। আর এই সংযোজনকারী ব্যক্তিকে বলা হবে বিদআতী।

সুন্নত ও বিদআত দুই বিপরীতার্থক আরবি শব্দ। ইসলামী তাহজীবের  যতগুলো মৌলিক পরিভাষা রয়েছে, সেসব পরিভাষার ওপর ইসলামী জীবনব্যবস্থার সম্যক অনুধাবন নির্ভরশীল। এ দুটো শব্দ তার‌ই মধ্যে গণ্য। এ দুটো শব্দের সঠিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ এবং শব্দ দুটোর দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহর আকিদা ও আমল আখলাক যাচাই ও পরখ করা একান্তভাবে জরুরি। আসল কথা হচ্ছে সুন্নত ও বিদআত সম্পর্কে সম্যক অবগতির অভাবে দীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে যেতে হয়। অপরদিকে দীনের কাজ নয় বা কোনো প্রকার সাওয়াবের  কাজ নয় এমন বিষয়কেও পুণ্যের কাজ বলে অভিহিত করা হয়। তাই জেনে রাখতে হবে সুন্নত কাকে বলে? সুন্নতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পথ। সুন্নত মানে আদর্শ। নবীজি সাল্লালাহ সালামের সুমহান আদর্শ‌ই সুন্নত নামে পরিচিত। সুন্নতের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কার্যকলাপ ও আচার-আচরণ আদত, অভ্যাস এবং তিনি যা নিজে করেছেন ও করতে বলেছেন, এবং তাঁর সামনে কোনো কাজ করা হয়েছে তাতে তিনি কোনোরূপ আপত্তি করেননি। উল্লিখিত সব কাজই হচ্ছে সুন্নত। সেই সাথে সাহাবা (রা.), তাবেঈন ও তাবে- তাবেঈন (রহ.)গণের দীন সম্পর্কীয় কথা, আকিদা-বিশ্বাস, আমল-আখলাকও রাসুলের বাণী অনুযায়ী সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, ‘আমার সুন্নত ও আমার সত্যানুসারী খলিফাগণের সুন্নাত, তোমাদের জন্য পালন করা আবশ্যকীয়।’ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘রাসুল যা আদেশ করেছেন তোমরা তা ধারণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো।’ (সুরা হাশর)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামকে ভালোবাসা মুমিনের ঈমান। আর সুন্নতের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করাই হচ্ছে ভালোবাসার প্রমাণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে ভালোবাসে সে অবশ্যই আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-২৭২৬) অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে জিন্দা করবে সে আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (মুসলিম শরিফ)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘সুন্নতের অনুসারীদের চেহারা শ্বেতবর্ণ ও উজ্জ্বল হবে। পক্ষান্তরে বিদআতপন্থি ও মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিকারীর চেহারা কৃষ্ণবর্ণ বা মলিন হবে।’ সুতরাং রাসূলুল্লাহ সুন্নত পালনের মধ্যেই মুমিনের কল্যাণ নিহিত। ইসলাম জাগতিক ও পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও মুক্তির শিক্ষা দেয়। কল্যাণময় রাষ্ট্র ও সুখী-সমৃদ্ধশীল সমাজ বিনির্মাণে প্রয়োজন মহামানবের সুমহান আদর্শের অনুশীলন। সমাজের সর্বস্তরে এই সুন্নত বাস্তবায়নে প্রয়োজন সৃজনশীল ভাবনা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সালামের জীবন দর্শন ও কর্মে যে যতটুকু অনুসরণ করবে সে ততটুকু সফলতা ও কল্যাণ লাভ করবে। অতএব শান্তি ও নিরাপত্তায় সুন্নত অনুসরণের বিকল্প নেই।

বিদআতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘কোনোরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কিছুর অনুকরণ-অনুসরণ না করেই কোনো কাজ নতুনভাবে সৃষ্টি করা। শরিয়তের পরিভাষায় বিদআত বলা হয়-এমন কোনো বিষয় নব আবিষ্কার করা যার অস্তিত্ব পূর্বে (তিন জামানায় অর্থাৎ সাহাবা, তাবেয়ীন তাবে-তাবেয়ীন) ছিলনা  এবং যার প্রতি শরিয়তে কোনোরূপ অনুমোদন নেই। এমন কাজকে শরীয়তের নিয়ম হিসাবে বা সওয়াবের কাজ হিসাবে করাই বিদআত। বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম নববি (রহ) বলেন : শরিয়তে এমন সব কাজ করা বিদআত যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। আল্লামা মোল্লা আলী কারী (রহ) বলেন,  রাসুল্লাহর যুগে ছিল না এমন রীতি-নীতি ও পথকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রবর্তন করাকেই শরিয়তের পরিভাষায় বিদআত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার দীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা এই দ্বীনের মধ্যে নেই তা বাতিল বলে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি) মুফতি কেফায়াতুল্লাহ (রহ) বলেন, বিদআত ওই বিষয়গুলোকে বলা হয়, যার ভিত্তি শরিয়তে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ কোরআন ও হাদিসে যার দলিল পাওয়া যায় না এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের যুগে যার অস্তিত্ব ছিলনা। অথচ দিনের কাজ মনে করে তা পালন করা হয়।

বিভিন্ন হাদিসে বিদআতীদেরকে কঠোরভাবে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম হিদায়াত হল  মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ নির্দেশনা। আর সর্বনিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। অনন্তর প্রতিটি বিদআত গোমরাহি এবং প্রতিটি গুমরাহি জাহান্নামের মধ্যে পড়বে।’ (সহিহ বুখারি) অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! তোমরা নব-আবিষ্কৃত কাজসমূহ থেকে দূরে থাকবে। কারণ প্রতিটি নব-আবিষ্কৃত কাজ‌ই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে গুমরাহি।(সুনানে আবু দাউদ) আল্লাহতায়ালা উম্মতে মুসলিমার সব ভাই ও বোনদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুমহান আদর্শকে বুকে ধারণ করে সকল প্রকার নব আবিস্কৃত বিদআত থেকে বেঁচে পরিপূর্ণ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

 

 

লেখক : শিক্ষার্থী, আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউসসুন্নাহ মেখল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads