• বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭ আশ্বিন ১৪২৮

ধর্ম

আলোকিত জীবনের পাথেয়

  • প্রকাশিত ২৭ জুলাই ২০২১

আব্দুল্লাহ আল মামুন আশরাফী

 

 

হজরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় একজন সাহাবি। যাকে তিনি হূদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। একদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয (রা.)-এর হাত ধরে  বলেন, ‘মুআয! আল্লাহর কসম! আমি তোমায় ভালোবাসি’!!

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘোরবিরোধীরাও তার কথার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে হূদয় থেকে কখনো আপত্তি তুলত না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি কথাকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করত। সেখানে তাঁর নিবেদিতপ্রাণ একজন সাহাবি তাঁর মুখনিঃসৃত পবিত্র কথামালাকে কতটুকু হূদয় দিয়ে গ্রহণ করবে তা বলাইবাহুল্য। মুআয (রা.) এক আকাশ ভালোবাসা আর মুগ্ধতা মিশিয়ে উত্তর দেন, ‘আপনার জন্যে আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আমিও আপনাকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি...’। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় মুআয (রা.)-কে লক্ষ করে বলেন, ‘তুমি প্রত্যেক নামাজের পরে অবশ্যই এ  দোয়াটি পড়বে। ‘হে আল্লাহ!  আপনি আমায় সাহায্য করুন আপনার জিকিরের ক্ষেত্রে, আপনার শোকরের ক্ষেত্রে এবং আপনার উত্তম ইবাদতের ক্ষেত্রে...’। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২২১১৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-১৫২৪) হাদিসের শিক্ষা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। আল্লাহতায়ালার জিকির ও তাঁর ইবাদতের ন্যায় শোকর ও কৃতজ্ঞতা আদায়ও আমাদের ধর্ম ইসলামে  একটি পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয়।

 

আল্লাহ বিশ্বাসী একজন মুমিন হূদয় থেকে এ কথা উপলব্ধি করে যে, একজন প্রাসাদের মালিক আল্লাহর ইচ্ছায় মুহূর্তেই পথের ফকির হয়ে যায়। আর একজন নিঃস্ব সহায়সম্বলহীন হয়ে যায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক। তাই একজন মুমিন কখনো ভেঙে পড়ে না। ‘আল্লাহর ইচ্ছায় সবকিছু হয়’ এই কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে সে বলে উঠে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

হজরত ইসা (আ.)কে আল্লাহতায়ালা বলেছিলেন, তোমার পরে এক উম্মত আসবে যারা পছন্দের কিছু পেলে শোকর আদায় করবে। আর অপছন্দনীয় কিছু পেলে সাওয়াবের আশায় সবর করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২৭৫৪৫) উম্মতে মুহাম্মদীর এই চরিত্র এভাবেই আল্লাহতায়ালা হজরত ঈসা (আ.)-এর নিকট প্রকাশ করেন। একটি হাদিসে এ বিষয়টি আরো প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। হজরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইব ইবনে সিনান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মুমিনের বিষয়টি বড় আশ্চর্যের! প্রতিটি অবস্থায়ই তার জন্যে কল্যাণ বয়ে আনে। এটা কেবলই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কোনো আনন্দকর পরিস্থিতিতে সে যখন শোকর আদায় করে তখন সেটা তার জন্যে কল্যাণ বয়ে আনে। পক্ষান্তরে যখন সে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হয়ে সবর করে তখন সেটাও তার জন্যে সওয়াব বয়ে আনে।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-২৯৯৯)

 

শোকর আদায় যে শুধু একটি কাঙ্ক্ষিত বিষয় এমন নয়। শোকর আদায় না করলে কোরআন মাজীদে শাস্তির ধমকি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা (নেয়ামত পেয়ে) শোকর আদায় কর তাহলে আমি আমি অবশ্যই অবশ্যই নেয়ামত বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে জেনে রেখ আমার শাস্তি বড় কঠিন।’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত-৭) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষ কত নেয়ামত উপভোগ করে থাকে তা গুণে শেষ করা অসম্ভব। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে থাক তাহলে তা গণনা  করে কখনো শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত-৩৪)

 

এই যে সুস্থতা; কত বড় নেয়ামত। একটু অসুস্থ হলেই তার মূল্য বুঝে আসে। সুরুচির সাথে তৃপ্তিসহকারে খেতে পারা কত বড় নেয়ামত তা একজন অরুচিতে ভোগা খেতে না পারা লোককে জিজ্ঞেস করে দেখুন। এই যে আপনি আরামে সারা রাত দিব্যি ঘুমে কাটিয়ে দিলেন তা যে কতটা আনন্দের তা একজন অনিদ্রায় ভোগা অসুস্থ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করুন। দেখুন, ঘুমাতে না পারা কতটা কষ্টের। তাই তো আমাদের গর্বের ধন পবিত্র সুন্নাহর পরতে পরতে রয়েছে শোকরের  অমলিন শিক্ষা। রাতভর আপনি তৃপ্তিসহকারে ঘুমালেন। ঘুম থেকে জেগে আপনি আপনার মালিক আল্লাহতায়ালার শোকর আদায় করুন। পড়ুন- ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বাদামা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর’। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে মৃত্যুতুল্য ঘুম থেকে জাগিয়ে আবার জীবন দান করেছেন এবং  তাঁর দিকেই পুনরুত্থান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ৩১১২)

 

আপনি সুস্বাদু খাবার খেলেন। তৃপ্তিসহকারে, পেটপুরে। আপনি রিজিকদাতা আল্লাহরাব্বুল আলামিনের কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। পড়ুন- আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়া সাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন। প্রশংসার মালিক কেবল তিনি, যিনি আমাদেরকে খাবার খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (জামে তিরমিযি, হাদিস নং- ৩৪৫৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৩৮৫০) এভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শোকরের পবিত্র এ চেতনা জাগরুক রাখার আয়োজন সত্যিই অতুলনীয়।  শোকরের নির্মল আলোয় স্নাত একজন মুমিনের জীবন। শোকর আদায় করা একজন মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

একটি গল্প দিয়েই লেখাটির ইতি টানছি। অনেক অনেক দিন আগের কথা। বনী ইসরাইলের তিন ব্যক্তির জীবন ছিল অনেক কষ্টের। একজন কুষ্ঠ রোগী, একজনের মাথায় টাক এবং আরেকজন অন্ধ। আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করার মানসে তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন।

 

ফেরেশতা : তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী?

কুষ্ঠরোগী : সুন্দর ত্বক এবং সুদর্শন শরীর কাঠামো। মানুষ আমায় বড় ঘৃণার চোখে দেখে। আমি এ অসহ্য  জীবন থেকে মুক্তি চাই।

ফেরেশতা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। এতে তার সকল অস্বস্তি দূর হয়ে যায়। তার শরীর হয়ে যায় সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন। এরপর ফেরেশতা তাকে তার পছন্দসই একটি গর্ভবতী উটনী দিয়ে বরকতের  দোয়া করে দেন। এরপর ফেরেশতা টাকবিশিষ্ট লোকটির কাছে গেলে সে তার কষ্টের কথা তুলে ধরে। ‘আমার মাথায় টাক। চুল নেই। লোকেরা বড় ঘৃণাভরে আমার দিকে তাকায়। বড় কষ্টে আছি ভাই’। ফেরেশতা লোকটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এতে তার মাথায় চুল গজায়। এরপর ফেরেশতা লোকটির চাহিদামতো একটি গাভী দিয়ে বরকতের দোয়া করে চলে যান অন্ধ লোকটির কাছে।

তোমার কী চাহিদা বল?

আমার চোখ নেই। সুন্দর এই পৃথিবীর কিছুই দেখতে পাই না। হায়!  আল্লাহ যদি আমার চোখের জ্যোতি দান করতেন। তাহলে আমি প্রাণভরে আল্লাহর সৃষ্টি অবলোকন করতাম। ফেরেশতা লোকটির চোখে হাত বুলিয়ে দেন। লোকটি চোখের জ্যোতি পেয়ে যায়। অতঃপর ফেরেশতা তাকে তার পছন্দসই একটি গর্ভবতী বকরী দিয়ে বরকতের দোয়া করে চলে যান। তাদের তিনজনের জীবনেই প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তারা তিনজনেই ধনকুবেরে পরিণত হন।

বেশ কয়েক বছর পরের কথা। ফেরেশতা একজন মুসাফিরের বেশে প্রথমে ওই কুষ্ঠরোগীর কাছে গিয়ে বলেন, দেখুন, আমি একজন মুসাফির। সফর করতে করতে আমি সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েছি। আমায় কিছু পাথেয় দিয়ে সহায়তা করুন। লোকটি বলল, ‘যান তো এখান থেকে। যত্তসব ফকিরের দল...’। দিন না কিছু...। শুনেছি আপনি নিঃস্ব ছিলেন। আপনার কোনো সহায়সম্পত্তি ছিল না। আল্লাহ আপনাকে দয়া করে ধনী বানিয়েছেন... মুসাফির বললেন। লোকটি রেগে গিয়ে বলল, ‘কী! এত বড় স্পর্ধা!  যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা...।  আমি পূর্ব থেকেই ধনী ছিলাম। বাপ-দাদার কাছ থেকেই এ সম্পত্তি পেয়েছি’। মুসাফির তখন বলেন, যদি আপনি মিথ্যা বলে থাকেন তাহলে আল্লাহ যেন আপনাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।

এরপর ফেরেশতা টাকবিশিষ্ট লোকটির কাছে এসে পূর্বের লোকটির মতো আচরণ করেন। লোকটিও কুষ্ঠরোগীর মতো আচরণ করে। এতে ফেরেশতা তার জন্যেও বদ-দোয়া করে অন্ধ লোকটির কাছে চলে আসেন। অন্ধ লোকটি আল্লাহর শোকর আদায় করে বলে, আপনার যা ইচ্ছা আপনি নিয়ে যান। আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ দয়া করে আমায় চোখে আলো দিয়েছেন। ফেরেশতা লোকটির ওপর খুশি হয়ে দোয়া করেন এবং বলেন, আমি সম্পদ নিতে আসিনি। তোমার সম্পদ তোমার কাছেই রেখে দাও । আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে এসেছিলাম। আল্লাহ তোমার শোকর ও কৃতজ্ঞতা আদায়ের মানসিকতায় তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তোমার অপর দুই সাথীর অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামি দেখে তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৩৪৬৪) তাই আসুন আমরা শোকর আদায়ের মানসিকতা তৈরি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। আলোকিত সুখময় জীবন গড়ে তুলি।

 

লেখক :  খতীব, আউচপাড়া জামে মসজিদ, টঙ্গী, গাজীপুর  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads