• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
মহররম মাসের ফজিলত ও আমল

সংগৃহীত ছবি

ধর্ম

মহররম মাসের ফজিলত ও আমল

  • প্রকাশিত ১১ আগস্ট ২০২১

হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম আল্লাহতায়ালার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাবান মাস। চন্দ্র মাসের বারোটি মাসই আপন আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। পবিত্র কোরআনে চারটি মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা ‘সম্মানিত মাস’  হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । এগুলো হলো মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ।

মহররম শব্দের অর্থ হলো সম্মানিত বা নিষিদ্ধ। এটি আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জনের মাস এবং অন্তরকে বিকশিত করার মাস। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহররমকে  ‘শাহরুল্লাহ’ বা আল্লাহর মাস বলেছেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি।  যেদিন থেকে তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। তম্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা (এই মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে) নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সুরা তওবা, আয়াত-৩৬) উক্ত আয়াতে বর্ণিত আল্লাহতায়ালার বাণী-‘তোমরা নিজেদের ওপর অত্যাচার করোনা’-এর ব্যাখ্যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘এই বারো মাসের কোনোটিতেই তোমরা  অন্যায়-অবিচারে জড়িত হইও না। অতঃপর আল্লাহতায়ালা চারটি মাসকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করেছেন, পাশাপাশি উক্ত সময়ে কোনো গুনাহ করলে তার পরিণতিও মারাত্মক বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি উক্ত মাসগুলোতে নেক আমলের সাওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন।’ হজরত আবু জার (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম রাতের কোন অংশ এবং মাসগুলোর মধ্যে কোন মাস উত্তম? তিনি বলেন, রাতের মধ্যে উত্তম হলো গভীর রাত্রি, আর মাসগুলোর মধ্যে উত্তম হলো আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মহররম বলে থাকো।’ (নাসাঈ, হাদিস নং-৪৬১২)

হজরত ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন, সম্মানিত মাসসমূহের মধ্যে কোনটি উত্তম তা নিয়ে ওলামায়ে কেরামগণ বিভিন্ন মত দিয়েছেন। হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, এই মাসগুলোর মধ্যে উত্তম হলো মহররম। তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা সম্মানিত মাস দিয়ে বছর শুরু করেছেন এবং সম্মানিত মাস দিয়ে শেষও করেছেন। রমজানের পর উত্তম মাস হলো মহররম। অত্যধিক সম্মানের কারণে এটিকে বধির মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ (লতায়েফুল মায়ারিফ, পৃষ্ঠা-৭৭,৭৮) ইমাম আবু বকর জাসাস (রাহ.) বলেন, ‘এ মাসের এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, এতে ইবাদত করলে বাকি মাসগুলোতে ইবাদতের তৌফিক লাভ করা যায় অনুরূপভাবে কেউ এ মাসে পাপাচার থেকে বিরত থাকতে পারলে বছরের বাকি মাসগুলোতেও  পাপাচার থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।’ (আহকামুল  কোরআন)

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) বলেন, রমজান মাস অধিক ফজিলতপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মহররম মাসকে আল্লাহর মাস বলে সম্বোধন করার কারণ হলো চন্দ্রমাসসমূহের মধ্যে একমাত্র মহররম মাসকে ইসলাম আগমনের পর নামকরণ করা হয়েছে। অন্যান্য মাসগুলোর জাহেলিয়া যুগের নামের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। জাহেলিয়া যুগে এই মাসকে বলা হতো ‘সফর আউয়াল’-এর পরের মাসকে বলা হতো ‘সফর সানী’। বর্তমানে যাকে সফর মাস বলা হয়। (শহরে মুসলিম, ইমাম সুয়ূতী, তৃতীয় খণ্ড,পৃষ্ঠা-২৫১)

সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ : ইসলামের একটি অন্যতম ফরজ বিধান হলো পবিত্র হজ পালন। সাধারণত জিলকদ মাসে হজযাত্রা শুরু হতো। জিলহজ মাসে হাজি সাহেবগণ শান্তিপূর্ণভাবে হজের বিধি-বিধান পালন করতেন। মহররম মাসে হাজিগণ  নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য এই  মাসগুলোতে সেই আদিকাল থেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ  ছিল। আর রজব মাসে নিরাপদে আল্লাহর ঘরে উমরা করার সুবিধার্থে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা মুশরিকরা আপনাকে হারাম মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলে দিন তাতে যুদ্ধ করা বড় অন্যায় ও গুনাহের কাজ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত- ২০৭) 

মহররম মাসের আমল : মহররম মাস হলো নফল রোজা ও ইবাদত-বন্দেগির মাস। এই মাসে রোজা পালনের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, রমজানের পর সবচাইতে ফজিলতপূর্ণ রোজা হচ্ছে মহররম মাসের রোজা আর ফরজ সালাতের পর উত্তম সালাত হলো গভীর রাতের সালাত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৮১৩) দ্বিতীয় হিজরিতে রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মহররম মাসের দশ তারিখে রোজা রাখা ওয়াজিব ছিল। রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর এই বিধানটি রহিত হয়ে যায়।

হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা রমজানের পর সবচাইতে বেশি রোজা রাখব কোন মাসে? তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি রমজানের পর কোনো মাসে রোজা রাখতে চাও তবে মহররম মাসে রাখ। কেননা এটি আল্লাহর মাস এই মাসে এমন একটি দিন রয়েছে যেদিন আল্লাহতায়ালা পূর্বের এক সমপ্রদায়ের তওবা কবুল করেছেন এবং পরবর্তীদের তওবাও কবুল করবেন।’ (মুসনাদে আহমদ-১/১৫৪, তিরমিযি ৩/১০৮) হজরত সালমা ইবনে আকওয়া (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা এক ব্যক্তিকে লোকজনের মধ্যে এই মর্মে ঘোষণা দিতে আদেশ করলেন যে, ‘যে ব্যক্তি খাবার খেয়েছে সে যেন দিনের বাকি অংশে সওম পালন করে, আর যে খাবার খাইনি সেও যেন সাওম পালন করে। কেননা আজকের দিন আশুরার দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২০০৭)

আশুরার দিনের আমল : পৃথিবীতে মানব জাতির আগমনের সূচনালগ্ন থেকে বহু স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনার কারণে মহররম মাসের দশ তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাদের উম্মতদেরকে আল্লাহতায়ালা এই দিনে বিভিন্নভাবে নেয়ামত দান করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘ফজিলতপূর্ণ দিন হিসেবে আশুরার দিন এবং এই মাসের (রমজান) রোজার ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যত বেশি আগ্রহী দেখেছি অন্য রোজার ব্যাপারে তদ্রূপ দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-১৮৬৭) উক্ত হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাওয়াবপ্রার্থী ও আগ্রহের কারণে তিনি এই রোজার প্রতীক্ষায় থাকতেন। অপর হাদিসে রয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিনে নিজে  রোজা রেখেছেন এবং অন্যদেরকে রোজা রাখতে আদেশও করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-১১০৫,২০০৪, মুসলিম, হাদিস নং-২৭১৪) হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার দিন রোজার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি এই রোজা রাখলে আল্লাহতায়ালা বিগত এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-১৯৭৬)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর দেখতে পেলেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কি? তারা বলল, এই দিন পুণ্যময় দিন। আল্লাহতায়ালা এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং তার ওপর বিজয়ী দান করেছেন। তারই শুকরিয়া হিসেবে এই দিনে হজরত মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন তাই আমরাও এই দিনে রোজা পালন করি। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি তোমাদের চাইতে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-১৯০৬, মুসলিম, হাদিস নং- ২৬৫৩)

আশুরার রোজা পালনের নিয়ম : আশুরার দিন যেহেতু ইহুদিরা রোজা পালন করে তাদের রোজার সাথে যেন মুসলমানদের রোজার সাদৃশ্য না হয় সেজন্য মুসলমানরা আশুরার রোজার সাথে নয় তারিখ অথবা এগার তারিখ আরো একটি রোজা বৃদ্ধি করে মোট দুইটি রোজা রাখবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল হে আল্লাহর রাসুল! এটি এমন দিন যাকে ইহুদি-খ্রিস্টানরা বড় মনে করে সম্মান জানায়। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আগামী বছর আসলে আমরা নবম দিনেও রোজা রাখব ইনশাআল্লাহ।’ (মুসলিম, হাদিস নং- ১৯৪৬, ২৭২২) তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ এবং এর পূর্বে বা পরে অতিরিক্ত একটি রোজা রেখে ইহুদিদের ব্যতিক্রম করো।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস নং-৮১৮৯) অর্থাৎ, প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবাদতের  মধ্যে ইহুদি-খ্রিস্টানদের সামঞ্জস্য হওয়াকে পছন্দ করেননি।

শিশুদের আশুরার রোজা রাখতে উদ্বুদ্ধকরণ : হজরত রুবাইয়া বিনতে মুআউবিজ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন সকালে মদিনার আশেপাশে বিভিন্ন বস্তিতে খবর পাঠান যে, যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় সকাল করেছে সে যেন রোজা সম্পন্ন করে, আর যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সেও যেন বাকি সময়ে (রোজা) পূর্ণ করে দেয়। এরপরে আমরা রোজা পালন করতাম এবং আমাদের সন্তানদেরকে রোজা রাখাতাম। আমরা তাদের জন্য তুলোর খেলনা তৈরি করতাম এবং তাদেরকে মসজিদে নিয়ে যেতাম।  অতঃপর তাদের কেউ যখন খাদ্যের জন্য কান্নাকাটি করত এই খেলনাগুলো তাদেরকে দিতাম যতক্ষণ পর্যন্ত না ইফতারের সময় হতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-১১১২, ১৯৬০; মুসলিম, হাদিস নং-২৭২৫) সুতরাং মহররম মাসের ফজিলত বিবেচনা করে এই মাসের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির- আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দান-সদকা, দরুদ শরিফ পাঠ ইত্যাদি সারা বছরের ন্যায় ফজিলতপূর্ণ আমল। কিন্তু মহররম মাসকে কেন্দ্র করে আশুরার দিনে তাজিয়া মিছিল বের করা, কান্নাকাটি করা, মাতম মর্সিয়া করা, শরীরের রক্ত বের করা, আতশবাজি শরিয়তসম্মত নয়, বরং ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ।

 

লেখক : মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান

সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads