• শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আরাফা দিবসের ফজিলত

ফাইল ছবি

ধর্ম

আরাফা দিবসের ফজিলত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৮ জুলাই ২০২২

মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি

মাস, দিন, সময় এগুলোর সূচনা পৃথিবীর সৃষ্টি হতে শুরু হয়েছে। জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত অন্য যেকোনো মাসের যেকোনো দিনের চেয়েও বেশি। এ দশ দিনের মধ্যে ৯ জিলহজ ইয়াওমে আরাফা। এ দিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে মুসলমানগণ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়। এ দিনের ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম। এ দিনকে মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন, আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত এবং গুনাহ থেকে পরিত্রাণের দিন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আজকের প্রবন্ধে আরাফা দিবসের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ্।

আরাফা দিবসের পরিচয় : আরাফা শব্দের অর্থ হলো পরিচিতি, হজরত দ্বাহহাক (র.) বলেন, হজরত আদম (আ.) কে হিন্দুস্তানে এবং হাওয়া (আ.) কে জেদ্দায় বেহেশত থেকে অবতরণ করা হয়েছিল। অবতরণের পর তারা পরস্পর পরস্পরকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একদিন উভয়ে আরাফাতের ময়দানে আরাফার দিনে মিলিত হলেন এবং একে অপরের মধ্যে পরিচয় ঘটলো। এ কারণে ওই স্থানের নাম হলো আরাফাত আর ওই দিনের নাম হলো আরাফার দিন।

আরাফা দিবসের ফজিলত : আরাফার দিনের ফজিলত সম্পর্কে বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে, ইহুদিগণ হজরত ওমর (রা.) কে বললো যে, আপনারা এমন একটি আয়াত পড়ে থাকেন তা যদি আমাদের ওপর নাজিল হতো, তবে আমরা সেটাকে ঈদ হিসেবে উদ্যাপন করে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতাম। হজরত ওমর (রা.) বললেন, এটা কখন এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে আর নাজিলের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথায় ছিলেন তা আমি জানি। আল্লাহর শপথ! আমরা সবাই এ সময় আরাফাতে ছিলাম। এ দিন আমাদের জন্য দুইটি ঈদ ছিল, প্রথমত সেদিন ছিল জুমাবার যাকে আমরা ঈদ হিসেবে উদ্যাপন করি, দ্বিতীয়ত সে দিন ছিল ইয়াওমে আরাফা যাকে হাদিসে ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (বুখারি, হাদিস-৪২৫১)

জুমার দিন ও আরাফার দিন ঈদের দিন : জুমার দিন ও আরাফার দিন ঈদের দিন। কেননা, হাদিসের মধ্যে এ দুই দিনকে ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। হজরত ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, এ আয়াত আরাফাতের ময়দানে জুমার দিন নাজিল হয়েছিল। আল্লাহর শোকর যে, এ উভয় দিন (জুমা ও আরাফা) আমাদের জন্য ঈদের দিন। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলমানও পৃথিবীতে থাকবে ততোদিন এ দুটি দিন মুসলমানের জন্য ঈদের দিন হিসেবে গণ্য থাকবে। একটি হলো জুমার দিন, আরেকটি হলো ইয়াওমে আরাফা তথা আরাফার দিন। (আবু দাউদ: হাদিস নং-২৪১৯)

আরাফার দিন সর্বোত্তম দিন : হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আরাফা দিবসের চেয়ে উত্তম কোনো দিন নেই। এই দিনে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীবাসীকে নিয়ে গর্ব করে বলেন, তোমরা আমার ওইসব বান্দাদেরকে দেখো, যারা বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো চুল নিয়ে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে আমার রহমতের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে আমার কাছে এসেছে। সুতরাং আরাফা দিবসের চেয়ে বেশি দোজখ থেকে মুক্তির আর কোনো দিন নেই। এই দিনে যে পরিমাণ লোক দোজখ থেকে পরিত্রাণ লাভ করবে অন্য কোনো দিন করবে না। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস-৩৮৫৩)

আরাফা দিবস গুনাহ মাফের দিন : হজরত নাফে (রা.) হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালা আরাফার দিন স্বীয়  বান্দার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। যার অন্তরে বিন্দুমাত্র ঈমান থাকবে তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেওয়া হবে। হজরত নাফে (রা.) বলেন, আমি ইবনে ওমর (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, এই ক্ষমা কি সকল ঈমানদারের জন্য নাকি শুধু আরাফাবাসীদের জন্য খাস? উত্তরে তিনি বলেন, এই ক্ষমা সকল ঈমানদারের জন্য। (ইবনে রজব হাম্বলী (র.), লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা-৪৭১)

আরাফার দিন জাহান্নামিদের মুক্তির দিন : আরাফার দিনে অসংখ্য মানুষদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আরাফা দিবসের চেয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভের জন্য অন্য কোনো দিন নেই। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, ৪/৪৪২) সহিহ মুসলিম শরিফে আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, আরাফা দিবসে রোজা রাখলে আশাকরি আল্লাহতায়ালা রোজাদাহরের এক বছরের আগের ও এক পরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস-১১৬২)

আরাফার দিনে হাজীদের রোজা রাখা মাকরুহ : বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফা দিবসে হাজীদেরকে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হওয়ার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (হুলিয়াতুল আউলিয়া : ৩/৩৯৭) অনেকেই হাজী সাহেবানদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা মাকরুহ বলেছেন। কারণ এই দিন তাদেরকে অধিকারে জিকির, দোয়া ও মুনাজাতে লিপ্ত থাকতে হয় এবং অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। রোজার কারণে যাতে তারা দুর্বল হয়ে না যায় সে কারণে হাজিদের সে দিন রোজা রাখা থেকে বিরত থাকার জন্য বলেছেন। তবে যারা সামর্থ্যবান তথা রোজার কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার আশংকা না থাকবে না, তাদের জন্য রোজা রাখাই উত্তম।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ফরজ। আরাফাতের ময়দানে হাজীগণ হাজির হয়ে আল্লাহর রহমত তালাশ করে। সমবেত সকলে এবাদত-বন্দেগি ও গুনাহ মাফের জন্য কান্নাকাটি করে আল্লাহর জিকির, দোয়া, মুনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে। আর আল্লাহতায়ালাও বান্দাদের ইবাদত-বন্দেগি এবং কান্নাকাটি বিনিময় হিসেবে তাদেরকে ক্ষমা ও জান্নাতলাভের ঘোষণা দেন। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে জীবনে অন্তত একবার হলেও আরাফাতের ময়দানে হাজির হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : সহকারী মাওলানা, চরণদ্বীপ রজভীয়া ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম

এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads