• শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আমিরুল মুমিনীন বাদশা হারুনুর রশীদ

সংগৃহীত ছবি

ধর্ম

আমিরুল মুমিনীন বাদশা হারুনুর রশীদ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৬ জুলাই ২০২২

আমিরুল মুমিনীন হারুনুর রশীদ ইবনে আলা মাহদী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল মনসুর তার ভাই হাদীর ইন্তেকালের পরে বাগদাদের সিংহাসনে অধিষ্ঠ হোন। বাদশা হারুনুর রশীদের খেলাফাতকাল ছিল মুসলমানদের উন্নতি সাধনের যুগ। তার শাসনকালে বাগদাদ সভ্যতার শীর্ষ চূয়ায় পৌঁছে যায়। বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির কারণে খ্যাতি লাভ করে। বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়। প্রাসাদের পরপাশে ফুল-ফলের বাগান। দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ গুম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বাগদাদের বিখ্যাত গ্রন্থগার বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসময় ইসলামী শিল্প ও সঙ্গীতের যথেষ্ট প্রসার হয়। বাইতুল হিকমাহ ছিল আব্বাসীয় আমলে ইরাকের বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত একটি গ্রন্থাগার, অনুবাদকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটিকে ইসলামী স্বর্ণযুগের একটি প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাইতুল হিকমাহ এ সময় তা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়।

ব্যবসা-বাণিজ্যে ও চাষাবাদে ব্যাপক উন্নিত করা হয়। যার ফলে দারিদ্র্যতা, অভাব-অনটন দূরীভূত হয়ে যায়। পারস্পরিক ভালোবাসা সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও উন্নতির সুবাতাস বইতে শুরু করে। মোদ্দাকথা বাগদাদ জ্ঞান, সাংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাদশা, উজির ও জনগণ একে অপরের সহযোগী ও হিতৈষী হয়ে আন্তরিকতার সাথে বসবাস করতে থাকে। বাদশা হারুনুর রশীদের শাসনামলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য কর্মাবলির অন্যতম হলো, আরবদের পানির কষ্ট লাঘব করার জন্য ১০ লাখ দিনার ব্যয়ে নির্মিত নাহরে জুবাইদা।

বাদশা হারুনুর রশীদ ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার দানশীল, আমানতদার ও সজ্জন প্রকৃতির লোক। তার দরবারে আলেম-ওলামাদের বেশ সমাদর ছিল। আবুল ফিদা হাফিজ ইবনে কাসির তাঁর রচিত আল-বেদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বাদশা হারুনুর রশীদ প্রতিদিন তার ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে এক হাজার দিরহাম দান করতেন। হজে যাওয়ার সময় একশ জন ফকিহ ও তাদের সন্তানদের হজ করাতেন। আর যে বছর নিজে যেতেন না, সে বছর তিনশ জনকে হজ করাতেন এবং তাদের জন্য উন্নতমানের পোশাক ও প্রচুর অর্থ হাদিয়া প্রদান করতেন। দানে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। ফকিহ ও কবিদের ভালোবাসতেন। তিনি দৈনিক একশ রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন। বিশেষ কোনো অজর ব্যতীত মৃত্যু পর্যন্ত তার ধারাবাহিকতা জারি রাখেন। (আল বেদায়া ওয়ান নিহায়া খ. ১০; পৃ- ৩৭১)

বাদশা হারুনুর রশীদের শাসনামলে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন বড় ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়নি। মাঝে-মাঝে কিছু জায়গায় বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিত। বাদশা দক্ষতার সাথে তা সমাধান করতেন। তবে আফ্রিকায় ইদরিসিয়া নামে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ইদরিস বিন আব্দুল্লাহকে কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছিল না। আর আন্দুলুস পূর্ব থেকে আব্বাসী খেলাফতের আওতামুক্ত ছিল। রোমও বার্ষিক কর আদায়ের শর্তে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। কিন্তু বাদশা ছাকফুর কর আদায়ে অস্বীকৃতি জানায়। সেই সাথে বাদশা হারুনুর রশীদকে ধমকি প্রদর্শন করে পত্র লেখেন যে, যদি মঙ্গল চান তাহলে আমাদের থেকে আদায় করা খাজনাসূমহ দ্রুত ফিরিয়ে দেন। অন্যথায় কালক্ষেপণ করলে তারবারির মাধ্যমে কথা বলবো। পত্র পড়ে বাদশা হারুনুর রশীদ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। উত্তরে লিখলেন, তোমার জবাব দেওয়ার জন্য আমরা রওয়ানা হচ্ছি। নিজ চোখেই উত্তর দেখ! বাদশা হারুনুর রশীদ তৎক্ষণাৎ সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। সৈন্য দল পৌঁছার সাথে সাথে শহরকে নিজেদের
কব্জায় নিয়ে নেয়। বাদশা ছাকফুর প্রতিরোধের সময়টুকুও পায়নি। অবস্থা বেগতিক দেখে আত্মসমর্পণ করে এবং খাজনা পরিশোধের শর্তে শান্তি চুক্তি করে। বাদশা হারুনুর রশীদ শান্তি চুক্তি শেষে বাগদাদে ফিরে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে আবার খবর আসে যে, ছাকফুর আবারো তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। বাদশা হারুনুর রশীদ আবারো সৈন্য নিয়ে ফিরে আসেন। এবারো ছাকফুর তার ভুল স্বীকার করে খাজনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বাদশা হারুনুর রশীদকে বাহলুলের উপদেশ : ১৮৮ হিজরিতে বাদশা হারুনুর রশীদ হজ থেকে ফেরার পথে কুফা অতিক্রম করার সময় বাহলুলের সাথে সাক্ষাত হয়। বাহলুল হচ্ছেন, দুনিয়াবিমুখ আবেদ। পুরো নাম, আবু উহাইব বাহলুল বিন আমর। তিনি হজরত আব্বাস (রা.) এর বংশের মানুষ ছিলেন। তিনি মাজনুন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তবে তিনি ছিলেন, একাধারে হাস্যরসিক, সুসাহিত্যিক, সূক্ষ্মজ্ঞানের অধিকারী।

বাহলুল বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন শুনুন! মনে করেন সমগ্র পৃথিবীর তুমি মালিক হয়েছো এবং সব মানুষ তোমার আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। তাতে কী হলো? আগামীকাল তোমার গন্তব্য কী কবরের গহ্বর নয়? সেখানে মানুষ একের পর এক তোমার ওপর মাটি দিতে থাকবে।
খলিফা বললেন, বাহলুল তুমি উত্তম বলেছো। আরো কিছু বলো! বাহলুল বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ যাকে সম্পদ ও সৌন্দর্য দিয়েছেন, সে তার সৌন্দর্যের পবিত্রতা রক্ষা করলে এবং সম্পদ দিয়ে দুঃখীজনের প্রতি সহমর্মিতা করলে তার নাম আল্লাহর দপ্তরে পুণ্যবানদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে।’ একথা শুনে খলিফা ভাবলেন, বাহলুল কিছু পেতে চায়। তাই খলিফা বললেন, আমি তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করার আদেশ দিচ্ছি! বাহুলুল বললেন এমন করবেন না, হে আমিরুল মুমিনীন। কারণ, ঋণ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা যায় না; বরং হকদারকে হক ফিরিয়ে দিন এবং আপনার নিজের ঋণ নিজে পরিশোধ করুন।

এবার খলিফা বললেন, আমি তোমার জন্য ভাতা জারির আদেশ দিচ্ছি, যা দিয়ে তুমি তোমার খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে পারবে! বাহলুল বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! এসবের প্রযয়োজন নেই! কেননা, আল্লাহতায়ালা আপনাকে দিবেন আর আমাকে ভুলে থাকবেন এমন হবেই না! দেখুন। আমার এই দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে এলাম যখন আপনি ভাতা জারি করেননি। আপনি চলে যান। আপনার ভাতা আমার কোনো প্রয়োজন নেই। খলিফা বললেন, এক হাজার দীনার গ্রহণ করেন। বাহলুল বললেন, এগুলো এর যথাযথ মালিককে পৌঁছে দিন। সেটাই হবে আপনার জন্য উত্তম। আমি এগুলো দিয়ে কি করবো? যাও। এখান থেকে চলে যাও, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো! খলিফা চলে গেলেন। দুনিয়া তার কাছে নিকৃষ্ট অনুভূত হলো।

অন্য এক জায়গায় আছে যে, একদিন বাদশাহ হারুনুর রশীদ তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বাদশাহ তাকে ডাক দিলেন, বাহলুল! ওই পাগল! তোর কি আর জ্ঞান ফিরবে না? বাহলুল বাদশাহর এ কথা শুনে নাচতে নাচতে গাছের ওপরের ডালে চড়লেন এবং সেখান থেকে ডাক দিলেন : হারুন! ওই পাগল! তোর কি কোনোদিন জ্ঞান ফিরবে না? বাদশাহ গাছের নিচে এসে বাহলুলকে বললেন, আমি পাগল নাকি তুই, যে সারা দিন কবরস্থানে বসে থাকে? বাহলুল বললেন, আমিই বুদ্ধিমান। বাদশাহ বললেন, কীভাবে? বাহলুল রাজপ্রাসাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, আমি জানি এই রঙ্গিলা দালান ক্ষণিকের আবাসস্থল এবং এটি (কবরস্থান) স্থায়ী নিবাস। এজন্য আমি মরার পূর্বেই এখানে বসবাস শুরু করেছি। অথচ তুই গ্রহণ করেছিস ওই রঙ্গশালাকে আর এই স্থায়ী নিবাসকে (কবর) এড়িয়ে চলছিস। রাজপ্রাসাদ থেকে এখানে আসাকে অপছন্দ করছিস! যদিও তুই জানিস এটাই তোর শেষ গন্তব্য! এবার বল, আমাদের মধ্যে কে পাগল?

বাহলুলের মুখে এ কথা শোনার পর বাদশাহর অন্তর কেঁপে উঠল, তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তুমিই সত্যবাদী। আমাকে আরো কিছু উপদেশ দাও! বাহলুল বললেন, তোমার উপদেশের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। তাকে যথার্থভাবে আঁকড়ে ধর। বাদশাহ বললেন, তোমার কোনো কিছুর অভাব থাকলে আমাকে বল, আমি তা পূরণ করব। বাহলুল বললেন, হ্যাঁ, আমার তিনটি অভাব আছে, এগুলো যদি তুমি পূরণ করতে পার তবে সারা জীবন তোমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব। বাদশাহ বললেন, তুমি নিঃসংকোচে চাইতে পার। বাহলুল বললেন, মরণের সময় হলে আমার আয়ু বৃদ্ধি করতে হবে। বাদশাহ বললেন, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বাহলুল বললেন, আমাকে মৃত্যুর ফেরেশতা থেকে রক্ষা করতে হবে। বাদশাহ উত্তর করলেন, আমার পক্ষে তাও সম্ভব নয়। এবার বাহলুল বললেন, আমাকে জান্নাতে স্থান করে দিতে হবে এবং জাহান্নাম থেকে আমাকে দূরে রাখতে হবে। বাদশাহর দু-চোখ অশ্রুসিক্ত। গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বাহলুল সতর্কতার ভঙ্গিতে বললেন, তবে জেন রাখ, তুমি বাদশাহ নও বরং তুমি অন্য কারো অধীন। অতএব তোমার কাছে আমার কোনো চাওয়া বা প্রার্থনা নেই।

বাদশা হারুনুর রশীদের মৃত্যু : দীর্ঘ ২০ বছর খেলাফতের স্বর্ণযুগের ইতি টেনে ১৯৩ হিজরি সনের জমদুল উখরায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। বাদশা হারুনুর রশীদ ছিলেন নম্র-ভদ্র ও খোশ মেজাজের মানুষ। দিল ছিল খুব নরম। নসিহত শোনার প্রতি যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। নসিহত শ্রবণকালে আবেগাপ্লুত হয়ে যেতেন। চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতো। অশ্রু গড়িয়ে পড়তো শুশ্রু বেয়ে।

একবার প্রসিদ্ধ আলেম ইবনে সাম্মাক (রহ.) বসে ছিলেন। এমতবস্থায় বাদশা পিপাসার্ত হয়ে পানি চাইলেন। বাঁদি পানি দিলেন। ইবনে সাম্মাক বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে যদি পানি না দেওয়া হয়, তবে কি আপনি আপনার অর্ধেক রাজত্বের বিনিময় হলেও পানি পান করবেন? বাদশা বললেন, হ্যাঁ! বাদশা পানি পান করার পরে ইবনে সাম্মাক আবার বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! এই পানকৃত পানি যদি আপনার শরীর থেকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের না হয়, তাহলে আপনি চিকিৎসার জন্য কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবেন? খলিফা বললেন, আমি চিকিৎসার জন্য বাকি অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে দিব! তখন ইবনে সাম্মাক বললেন, যে রাজত্বের মূল্য এক গ্লাস পানির থেকেও কম সেই রাজত্ব নিয়ে গর্ব করা এবং তার জন্য রক্ত ঝড়ানো কখনো উচিত নয়। ইবনে সাম্মাকের কথা শুনে বাদশা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাদশা হারুনুর রশীদ ছিলেন আব্বাসী খেলাফতের ৫ম শাসক । তিনি ২৫ বছর বয়সে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

লেখক : বাদশা হারুনুর রশীদ

আলেম, প্রাবন্ধিক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads