• শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
মুমিন কখনো হতাশ হয় না

সংগৃহীত ছবি

ধর্ম

মুমিন কখনো হতাশ হয় না

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ৩১ আগস্ট ২০২২

হাফেজ আবু ইউসুফ

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন ‘অবশ্যই বিশ্বাসীরা সফল হয়েছে ।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত-০১) একজন মুমিন, একজন ঈমানদার, একজন আল্লাহপ্রেমী মানুষ কখনোই হতাশ হতে পারে না। হতাশা মুমিনের সাথে যায় না। সবসময় আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে তাঁর করুণা, দয়া এবং স্নেহের যে আলোকধারা মুমিনের ওপর বর্ষিত হচ্ছে, তা থেকে আপনি (মুমিন) কীভাবে নিরাশ হবেন? ইহকালীন ব্যর্থতা, পরাজয়ে আপনার কী আসে যায়?

যারা আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তারা হতাশ হয় না। দুনিয়ার অপূর্ণতা তাদের আঘাত দেয় না; বরং তারা প্রতিক্ষার প্রহর গোনে মহা সফলতার। সেই সফলতা, যার ওয়াদা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। আপনার আত্মা যখন আল্লাহর ভরসায় পরিপূর্ণ তখন সিজদায় গিয়ে বলুন-‘হে আল্লাহ আমি আমার নিজের ওপর জুলুম করেছি আমাকে তোমার রহমত থেকে নিরাশ করোনা।’ ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে নবী,) বলে দাও, হে আমার বান্দারা যারা নিজের আত্মার ওপর জুলুম করেছো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (আয-যুমার, আয়াত-৫৩)

আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্টি এ মহাবিশ্বকে বানিয়েছেন একটা বিশাল পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন- আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এব তোমাদের জানমাল ও ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৫৫) মুমিনদের জন্য পরীক্ষা আসবেই। যে পরীক্ষা থেকে বাদ পরেননি কোনো নবী ও রাসুলগণ।

আমরা যদি মানবতার মুক্তির দূত মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে তাকাই- তার তিন তিনটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। কিন্তু কেউ এ ধরনীর বুকে ছিল না। সবাইকে আল্লাহরাব্বুল আলামিন নিয়ে গিয়েছিলেন। কই তিনি তো হতাশ হন নি। যে মক্কাবাসী তাকে আল-আমিন উপাধি দিয়েছিল। তারাই তো তাকে সিহাবে আবু তালিবে বন্দি রেখেছিল তিন তিনটি বছর। তাদের জুলুম নির্যাতন এতটাই তীব্র ছিল যে শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে আল্লাহর হুকুমে জন্মভূমি থেকে হিজরত করতে হয়েছিল। তারপরেও হতাশ হননি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

আমরা যদি মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.)-এর দিকে তাকাই। আমরা দেখতে পাই- তিনি আল্লাহতায়ালার দরবারে দোয়া করলেন-‘হে আমার প্রভু! আমাকে এক সৎ ছেলে সন্তান দান করুন।’ (সুরা সাফফা, আয়াত-১০০) তখন আল্লাহতায়ালা তাকে সুসংবাদ দিলেন-‘সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০১) যার নাম হজরত ইসমাইল (আ.)। প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র সন্তান যখন বাবার সাথে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন বাবাকে কোরবানি করার নির্দেশ করা হলো। তিনি হতাশ হননি। বরং তিনি রবের ওপর ভরসা করে পুত্র ইসমাইলকে স্বপ্নের কথা বললেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতপর যখন সে পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহীম তাকে বলল, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি? সে (ইসমাইল) বলল, হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে সবরকারী (সহনশীল) পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০২)

পিতা-পুত্রের কেউ তো হতাশ হয়নি; বরং তারা রবের ওপর ভরসা করে আল্লাহতায়ালাকে রাজি খুশি করার জন্য পুত্র ইসমাইলকে জবেহ করার জন্য শায়িত করেন, কোরআনের ভাষায়-‘তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ ‘নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০৫, ১০৬)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর ভরসা করে আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি কাউকে কখনো হতাশ করেন না। এমনকি ইবলিশ শয়তানকে যখন আল্লাহতায়ালা চিরস্থায়ী জাহান্নামি হিসেবে ঘোষণা করলেন, তখন ইবলিশও হতাশ হয়নি। সে আল্লাহতায়ালার ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে আল্লাহতায়ালার কাছে চেয়েছিল-তাকে যেন কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে-‘আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও, যখন এদের সবাইকে পুনর্বার ওঠানো হবে’। তিনি বললেন- ‘তোকে অবকাশ দেওয়া হলো।’ (আল-আরাফ, আয়াত-১৪, ১৫) মানুষের শিরায় শিরায় যাওয়ার ক্ষমতা চাইলে আল্লাহ তাকে তাও দিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘অবশ্যই শয়তান আদম সন্তানের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ১২৮৮)

সর্বশেষ বলতে বলা যায়, ‘দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কারাগার।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৯৫৬) সুতরাং কারাগার শান্তি কিংবা আরাম আয়েশের জায়গা না। এটা দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-যন্ত্রণার জায়গা। থাকা খাওয়ার কষ্ট, ভালো না লাগা প্রিয় মানুষ হারানোর যন্ত্রণা, নিজের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করতে না পারার অসীম বেদনা মনের গহীনে লুকায়িত সুপ্ত যন্ত্রণা যা হয়তবা এ পৃথিবীর কেউ জানে না।

অতএব যারা মুমিন আল্লাহর প্রকৃত মুমিন বান্দা তাদের জন্য তো দুনিয়া কারাগার। আর কারাগার মানেই তো দুঃখ আর কষ্টের জায়গা। মুমিনের জন্য দুনিয়াতে দুঃখ কষ্ট থাকবে এটাই স্বাভাবিক তবুও মুমিনে কখনো হতাশ হবে না। মুমিন এই সমস্যাগুলোকে সাথে নিয়েই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার ওপর ভরসা করে হতাশ না হয়ে আমৃত্যু জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। আর এটাই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads