• শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
বাস্কেটবলের যমজ ভাই

সংগৃহীত ছবি

অ্যাথলেটিকস

বাস্কেটবলের যমজ ভাই

  • মাহমুদুন্নবী চঞ্চল
  • প্রকাশিত ০৫ মে ২০২১

পোস্ট প্লেয়ার হিসেবে একজনকেই চোখে পড়তে লাগল বেশি। দুর্দান্ত খেলছে ছেলেটা। হচ্ছে দ্রুত পয়েন্ট। যেন একাই একশ। কীভাবে হচ্ছে? হঠাৎ খটকা লাগল। পরে অবশ্য ভুল ভাঙল। তারা একজন নন, আসলে দুজন। ইয়াসিন ও তাহসিন। যমজ ভাই। বাস্কেটবলের দুই মেধাবী খেলোয়াড়।

বয়স ২২, একই চেহারা, একই উচ্চতা। ফরসা শরীরের রংও। খেলাটা বাস্কেটবল বলেই উচ্চতাও সেই রকম, দুজনই ৬ ফুট দুই ইঞ্চি। তবে বড় ভাই ইয়াসিন একটু লম্বা সাত মিনিটের ছোট তাহসিনের চেয়ে। বড় বলে তা নিয়ে একটু গর্বও আছে তার। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া বাংলাদেশ গেমসে বাস্কেটবল ইভেন্টে দুই ভাই নাম লিখিয়েছিলেন রাজশাহী জেলার হয়ে। প্রত্যাশা ছিল ফাইনাল। কিন্তু হয়নি। সেমিতে দারুণ লড়াইয়ের পরও হারতে হয় নৌবাহিনীর কাছে। তৃতীয় স্থান লড়াইয়ে বিমানবাহিনীকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে তাতেই খুশি যমজ দুই ভাই। ব্রোঞ্জ জেতার লড়াইয়ে ছোট ভাই তাহসিন করেন দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪ পয়েন্ট, বড় ভাই ৯। তাতে ভাটা পড়ল না দুই ভাইয়ের টান, দুজনের খেলাতে দুজনই খুশি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্কেটবল ইভেন্ট কতটা সম্ভাবনাময়। হিসাব কষলে তেমন কিছুই না। তাহলে কেন এই খেলায় আসা? দুজনের উত্তরটা সাদামাটা, নিছক আনন্দের টানেই। জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন আছে দুজনেরই। যদি সেটা ব্যাটে-বলে মিলে যায়। কেন এমন উত্তর। কারণ কোর্টের বাইরেও দুজনের আরেকটা পরিচয় আছে, সেটাও যমজের মতোই। দুজনই প্রবল মেধাবী ছাত্র। পড়াশোনা চলছে তাদের রাজশাহী প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃতীয় বর্ষে পড়া দুজনের সাবজেক্টও এক, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং।

একই বিশ্ববিদ্যালয়, একই সাবজেক্ট। অবাক করার মতোই বিষয়। পেছনের গল্পটা শুনে মনে হলো, একই সাথে চলতে শিখেছে দুজন। ২০১৫ সালে এসএসসি। দুজনই পান গোল্ডেন এ প্লাস, সেন্ট যোশেফ হাইস্কুল। ইন্টারমিডিয়েট নটরডেম কলেজ। সেখানেও দুজন কৃতিত্বের সাথে গোল্ডেন এ প্লাস। এরপর এক সঙ্গে চলছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা। চমকপ্রদের সঙ্গে বিষয়টি ব্যাপক প্রশংসনীয়ও।

লম্বা, দারুণ ফিটনেস। ক্রিকেট বা ফুটবলেও ঝোঁকটা থাকতে পারত দুজনের। কেন বাস্কেটবল? ছোট ভাই তাহসিনের মতে, ‘ফুটবল খেলেছি দুজন অনেক। ক্রিকেট টানেনি। কারণ এই ইভেন্টে সময় বেশি লাগে। তাতে পড়াশোনার ব্যাঘাত হতো। স্কুল লেভেলে আমরা রাগবি খেলতাম। দুজনে বেশ লম্বা বলে ডাক পড়ল বাস্কেটবলে। সেখান থেকেই এই ইভেন্টে ভালো লাগা, নতুন পথচলা শুরু।’

বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব ১৮ দলে খেলেছেন দুজন। স্কুল লেভেলে সব চ্যাম্পিয়ন। ঢাকা লিগে ধূমকেতুর হয়ে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন। বড় কোনো গেমসে এবারই রাজশাহীর হয়ে জিতলেন ব্রোঞ্জ। আনন্দ-তৃপ্তি দুটোই আছে এতে। যমজ ভাই, কোর্টে নামলে এই সম্পর্কটা পায় বাড়তি মাত্রা। দুজনের সমন্বয় ভালো হলে সেদিন সে দল পায় বাড়তি ছন্দ। একজনের নৈপুণ্য প্রভাবিত করে আরেকজনকেও। সেটা বাজে পারফরম্যান্সের বেলাতেও। তবে সেটা খুবই কম। দুজনই সাফল্যেও জন্য মুখিয়ে থাকে সারাক্ষণ, হার জিনিসটা খুবই অপছন্দ তাদের।

বাস্কেটবলে দুজনই পোস্ট প্লেয়ার, ফুটবলের ভাষায় বললে স্ট্রাইকার। মানে দুজনের মূল দায়িত্ব স্কোর করা। পজিশন এক জায়গায় হওয়ায় মাঝে মধ্যে বিপদে পড়েন রেফারিরা। একজনের দোষ পড়ে আরেকজনের কাঁধে। তা নিয়ে আছে দুজনের অনেক মজার কাহিনী।

যমজ হওয়ার আনন্দ-তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে দুজনের স্কুল-কলেজ লেভেলেও। স্যারের কড়া ধমক  ছোট ভাই তাহসিনের জন্য খেয়েছেন বড় ভাই ইয়াসিন। এমন প্রসঙ্গে ইয়াসিন যেমন বলছিলেন, ‘একবার এক টিচার হঠাৎ করে আমাকে খুব বকতে শুরু করলেন। আমার তো  চোখ মুখ লাল। হুট করে এক ফ্রেন্ড বলে উঠল, স্যার ও তো তাহসিন না, ইয়াসিন।’ স্যার অনেকটা বিব্রত তখন। অস্ফুট স্বরে স্যার বলে ওঠেন, তাহলে ওইটা কই।’

যমজ বলে দুজনের মিল যেমন অনেক, অমিলও আছে। বাস্কেটবলে ছোট ভাইয়ের প্রিয় খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের এনবিএর লেবরন জেমস। সেখানে ইয়াসিনের প্রিয় খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রেরই স্টিফেন কারি। আর দেশের কথা বললে দুজনেরই পছন্দের মানুষ কিংবা মেন্টর একজনই, তারেক আজিজ।

দুজনই অবসরে গান শোনেন। মিউজিকে অসম্ভব টান। যদিও পড়াশোনার চাপে অনেকটা করা হয় না তা। তাহসিনের প্রিয় শিল্পী তাহসান। শোনেন ওয়ারফেজ ব্যান্ডের গানও। অন্যদিকে আর্টসেল ব্যান্ডের গান খুব টানে ইয়াসিনকে। বলিউড বলতে আরজিত সিং ও সনু নিগম দুজনেরই খুব পছন্দের। তাহসিনের প্রিয় খাবার গরুর কালাভুনা। ইয়াসিনের মন পড়ে থাকে সেখানে ইলিশ ভাজিতে।

তাহসিনের প্রিয় নায়িকা অনেকটাই বয়স্ক। ৪৫ বছর বয়সি আমেরিকান অভিনেত্রী চার্লিজ থেরন। সেখানে বলিউডে মুগ্ধ ইয়াসিন। তার ভালো লাগে কবির সিং ছবির নায়িকা কিয়ারা আদভানিকে। নায়কের মধ্যে মার্কিন অভিনেতা ভিন ডিজেল বলতে পাগল তাহসিন। সেখানে ৬৮ বছর বয়সি আইরিশ অভিনেতা লিয়াম নেসনের ছবিতে প্রায় ডুব দেন ইয়াসিন।

মেসি না রোনালদো, গোটা বিশ্ব যেখানে দুই ভাগ। সেখানে দুই ভাইয়ের পছন্দ অবশ্য এক বিন্দুতে। দুজনই মেসির পাঁড় ভক্ত। আবার ক্লাব বার্সেলোনারও। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটে? সাকিব না অন্য কেউ। এখানে একটু ব্যতিক্রম রয়েছে। ছোট তাহসিনের প্রিয় খেলোয়াড় হার্ড হিটার তামিম ইকবাল। সেখানে ইয়াসিন সাকিব আল হাসান বলতে পাগল। পড়ালেখার বাইরে দুই প্রিয় ক্রিকেটারের খেলা মিস করেন না।

বাবা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। মা গৃহিণী। বড় ভাই আরিফিন জিলানী নাট্যনির্মাতা। বড় ভাইয়ের হাত ধরে সিনেমা-নাটকেও যেতে পারেন দুজন। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তাদের। বরং বাস্কেটবলে জাতীয় দলের হয়ে খেলা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়েই প্রতিষ্ঠিত করতে চান নিজেদের ক্যারিয়ার। নিজ জেলা নোয়াখালী। তবে খুব একটা যাওয়া হয় না। ফলে ‘নোয়াখালী বিভাগ চাই’ এমন আন্দোলনের সঙ্গেও নেই তারা। হাসতে হাসতে বললেন দুজন।

চলছে রমজান মাস। দুই ভাই সমান তালে রাখছেন রোজা। লকডাউনে বাইরে যান কম। ঘরে বসেই সময় কাটে পড়ালেখা, মিউজিক আর মুভি দেখে। করোনাকালে আর সবার মতো হাঁফিয়ে উঠছেন তারাও। মন যেতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। মিস করেন ক্লাসরুম, বন্ধুবান্ধব। কিন্তু উপায় নেই। দ্রুতই চলে যাক কোভিড-১৯, পৃথিবী প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক আগের মতো, স্বস্তি ফিরুক জনজীবনে- কায়োমনে যমজ ভাইয়ের এমনই চাওয়া।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads