• সোমবার, ৮ আগস্ট ২০২২, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৭ মে ২০২১

লকডাউনের আতঙ্ক কাটিয়ে পুঁজিবাজারে উত্থানের যে চিত্র তাতে শুরুতে কেবল বীমা খাতের শেয়ার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়লেও পরে প্রায় সব খাতেই দেখা গেছে ইতিবাচক প্রবণতা। তলানিতে থাকা ব্যাংক, বস্ত্র ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতে অল্প অল্প করে দাম বাড়ছে, সেই সঙ্গে অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া বীমা খাতে দর সংশোধন হয়ে কিছুটা কমেছে।

অথচ লকডাউনের ঘোষণা দেওয়ার পর তা শুরু হওয়ার আগেই এক দিনে প্রায় ২০০ পয়েন্ট সূচক পড়েছিল। তবে ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরুর পর বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

পরে ৬৬ শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বা ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পর কয়েক দিন বাজার পতন হলেও পরে মার্জিন ঋণের হার বাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে টানা এক মাস ধরেই বাজারে চাঙাভাব দেখা দিয়েছে।

শুরুতে সাধারণ বীমা খাতের শেয়ারগুলোর দাম ঢালাও বাড়লেও পরে খাত ধরে প্রথমে মিউচুয়াল ফান্ড, পরে ব্যাংক খাত এবং সবশেষ ব্যাংকের সঙ্গে বস্ত্র খাতে দেখা দিয়েছে চাঙাভাব।

বিধিনিষেধে পতনের আশঙ্কা থাকলেও পাঁচ সপ্তাহে সূচক বেড়েছে ৫৭৩ পয়েন্ট। লেনদেন বেড়েছে বহুগুণ। আর নিয়মিত হাতবদল হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি। গত ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরুর দিন বাজারে মূল্য সূচক ছিল ৫ হাজার ১৭৭ পয়েন্ট। আর বাজার ঈদের ছুটিতে গেছে ৫ হাজার ৭৫০ পয়েন্টে। এক দশক ধরেই ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রবণতা চলছে। এর মধ্যে গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাবের পর এই খাতের শেয়ারের দাম একেবারে তলানিতে নেমে আসে।

তখন কথা ছড়িয়েছিল যে, করোনায় ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে এবং লভ্যাংশ পাওয়া যাবে না। তবে বছর শেষে দেখা গেল করোনাকালে মুনাফা বেশি করার পর লভ্যাংশও বেশি দিয়েছে কোম্পানিগুলো।

চলতি বছর ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত যে ২৭টি ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে ২৩টি কোম্পানি ২ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা কেবল নগদে বিতরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি আছে বোনাস শেয়ার। চলতি বছর প্রথম তিন মাসের আয়ও গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যে ২০টি ব্যাংক প্রান্তিক ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে ১৫টিই আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি আয় করেছে। একটি ব্যাংক প্রায় তিন গুণ, একটি দেড় গুণ, একটি দ্বিগুণ এবং আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি আয় করেছে।

এই পরিস্থিতিতে এক সপ্তাহের মধ্যে হাতে গোনা এক-দুটি ছাড়া বেশির ভাগ ব্যাংকের শেয়ারদর ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

এর আগে নানা সময় ব্যাংক খাতে দুই-একদিন দাম বাড়লেও পরে আবার পতন দেখা গেছে। কিন্তু এবার বাড়তি দামে কয়েক দিন স্থিতিশীল থাকার পর আবার বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই পরিস্থিতি বস্ত্র খাতে। করোনার প্রাদুর্ভাবে এই খাতেও আয় ভালো হবে না ভেবে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের আশপাশে বা তার চেয়ে নেমে গেছে। প্রান্তিক প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে এবার গত বছরের চেয়ে বেশি আয় করছে অনেক কোম্পানি। তবে এটাও ঠিক যে, এই খাতেই লোকসানি কোম্পানি অনেক।

ঘুমিয়ে থাকা বস্ত্র খাতও ঈদের আগে হঠাৎ একদিন লাফ দিয়ে এরপর দুই দিন স্থিতিশীল থেকে আবার লাফ দেয়। দাম ও মূল্য সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও বাড়ছে। লকডাউনে সময় কমলেও এখন নিয়মিত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ঈদের আগে পুঁজিবাজারের লেনদেন যেভাবে শেষ হয়েছে তা পরবর্তীকালে বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থাশীল করবে।

ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক গবেষণা কর্মকর্তা দেবব্রত কুমার সরকার বলেন, ঈদের আগে এমন পুঁজিবাজার সচরাচর দেখা যায় না। মূলত এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে টাকা উত্তোলনের কারণে মন্দাবস্থা থাকে। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন চিত্র।

এতে ভালো যেটা হয়েছে, ঈদের পর যখন পুঁজিবাজার লেনদেন শুরু হবে তখন কেউ আতঙ্কে বিনিয়োগ করবেন না। তখন যেসব খাতের শেয়ারের দর এখনো কম, সেগুলোতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম হবে।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আনম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, ঈদের আগে যেভাবে পুঁজিবাজারের লেনদেন শেষ হয়েছে, তাতে সব খাতের বিনিয়োগকারীরা কম-বেশি মুনাফা পেয়েছেন। তবে বীমা খাত নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও সজাগ থাকা উচিত ছিল। তিনি বলেন, লকডাউনের মধ্যে যেভাবে লেনদেন হয়েছে তা আমরা ভাবতে পারিনি। কারণ লকডাউন শুরু হওয়ার আগে আতঙ্কে অনেকে শেয়ার বিক্রি করেছেন। কিন্তু লকডাউন শুরু হওয়ার পর পুঁজিবাজারের অবস্থা পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই আবার পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আচরণ বিশ্লেষণে তিনি বলেন, আমাদের বিনিয়োগকারীরা যেকোনো সিদ্ধান্তে দ্রুতই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। হয় শেয়ার বিক্রি করে, না হয় শেয়ার ক্রয় করে। এ সময় বিএসইসি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও তাতে বিশেষ কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা এ সময়ে খুবই যৌক্তিক আচরণ করেছেন বলে মনে হয়।

লকডাউনের শুরুতে আতঙ্ক কাজ করলেও প্রায় এক মাসের লকডাউনে স্বস্তিতে ছিল পুঁজিবাজার। ৫ মে লকডাইন শুরু হওয়ার আগের দিন এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সূচকের পতন হলেও লকডাউন শুরু হওয়ার পর সূচক বেড়েছে। এদিন প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বাড়ে ৮৮ পয়েন্ট। ৬ এপ্রিল বাড়ে আরো ১০৩ পয়েন্ট। ৭ এপ্রিল বাড়ে ৫৫ পয়েন্ট।

এদিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের ৬৬ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়।

এরপর ৮ এপ্রিল ও ৯ এপ্রিল পর্যায়ক্রমে ৮২ পয়েন্ট ও ৯০ পয়ন্টে কমে আসে সূচক। কিন্তু কেন ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটি ব্যাখ্যা আসার পর অনেকটা স্থিতিশীল হয় ১১ এপ্রিল থেকে। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির পর লেনদেনে সূচক বাড়ে ৯০ পয়েন্ট। তারপর টানা ১০ কার্যদিবস ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত উত্থান ছিল সূচকের।

দুই সপ্তাহ উত্থান শেষে ২৬ এপ্রিল একদিন বেশ বড় দরপতনই দেখে পুঁজিবাজার। সেদিন সূচক হারায় ৬৩ পয়েন্ট।

এরপর আবার তিন কার্যদিবস যথাক্রমে ৩৯, ১৮ ও ৪১ পয়েন্ট বাড়ার পর একদিন সূচক কমে ছয় পয়েন্ট।

এরপর দুই-একদিন ওঠানামা হলেও ঈদের আগে টানা বেড়েছে সূচক। ৪ মে থেকে চার কার্যদিবসে যথাক্রমে ২৪, ৫৩, ১৮, ৩৯, ৭৯ ও ২৬ পয়েন্ট বেড়ে ঈদের ছুটিতে যায় পুঁজিবাজার।

লকডাউনের এ সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন বেড়েছে পাঁচ গুণ। লকডাউন শুরু হওয়ার পর ৫ এপ্রিল পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছিল ২৩৬ কোটি টাকা। ঈদে পুঁজিবাজার বন্ধ হওয়ার আগে ১২ মে লেনদেন হয় ১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এই সময়ে টানা ৯ দিন হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে পুঁজিবাজারে।

প্রথম দিকে ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর কমলেও এমন উত্থানে দর ঘুরে দাঁড়ায় প্রায় প্রতিটি কোম্পানির।

নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রথম দুদিন যে ৫০ শতাংশ করে শেয়ার দর বাড়তে পারবে তা বাতিল করা হয় এ লকডাউনে।

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) শেয়ার এপ্রিল মাস থেকে আনুপাতিক হারে বণ্টনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু এ সময়ে নতুন কোনো কোম্পানি না আসায় তা চলতি মে মাস থেকে কার্যকর হচ্ছে। এজন্য একজন বিও হিসাব থেকে ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ থাকলেও কেবল এ সুবিধা পাওয়া যাবে। বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এমন ধারণা করা হলেও যেদিন এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, সেদিনই সূচক বাড়ে ১৮ পয়েন্ট। আর লেনদেন আরো ৪ কোটি টাকা বেড়ে হয় প্রায় ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

টানা ৯ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads