• বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮
দেশের প্রথম সুকুক সম্পর্কে তথ্য স্মারক প্রকাশ করলো বেক্সিমকো

সংগৃহীত ছবি

পুঁজিবাজার

দেশের প্রথম সুকুক সম্পর্কে তথ্য স্মারক প্রকাশ করলো বেক্সিমকো

  • বাসস
  • প্রকাশিত ১৭ জুলাই ২০২১

দেশের প্রথম সুকুক সম্পর্কে তথ্য স্মারক প্রকাশ করেছে বেক্সিমকো লিমিটেড। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন  গত বৃহস্পতিবার তিন হাজার কোটি টাকার এই গ্রীণ সুকুক অনুমোদন দেওয়ার পর অনলাইনে স্মারক প্রকাশ করে বেক্সিমকো। 

তথ্য স্মারকে বলা হয়েছে, ৫ বছর মেয়াদী সম্পদ-নির্ভর এই সুকুক বিনিময়যোগ্য, পুনরুদ্ধারযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক। প্রাইভেটট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে সুকুকের ৫০ শতাংশ ছাড়বে বেক্সিমকো, ২৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারধারীদের জন্য, বাকি ২৫ শতাংশ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। প্রাইভেট¬ প্লেসমেন্ট করা হবে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। ২২ আগস্ট প্রাইভেট-প্লেসমেন্ট অংশ নেওয়ার সময় শেষ হবে। বেক্সিমকোর শেয়ারধারী ও জনসাধারণের জন্য এই সুকুক নেওয়ার সুযোগ শুরু হবে ২৫ আগস্ট, শেষ হবে ২৭ আগস্ট।

সুকুকের বিক্রয়ালব্ধ অর্থ থেকে ২ দুই হাজার ২শ’ কোটি টাকা গাইবান্ধা ও পঞ্চগড়ে যথাক্রমে ২০০ মেগাওয়াট ও ৩০ মেগাওয়াটের দু’টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অর্থায়ন করবে বেসরকারি খাতের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি। এই দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। দুই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে মুনাফা অর্জনের বিষয়টি সরকারের সঙ্গে বেক্সিমকোর ২০ বছর মেয়াদী ক্রয় চুক্তিতে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। 
উল্লেখ্য, সরকার সম্প্রতি বেশ কয়েকটি কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। পাশাপাশি, সৌরবিদ্যুতের মতো জলবায়ু-বান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। জলবায়ু-বান্ধব প্রকল্প উৎসাহিত করতে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুবিধার সুযোগ নিতে চায় বেক্সিমকো। তথ্য স্মারকে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প ২০৩৪ সাল পর্যন্ত কর আওতা মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি, শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা এবং কিছু ট্যারিফ ও ভ্যাট ছাড়ের সুবিধাও পাবে এই সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প।  

অবশিষ্ট ৮শ’ কোটি টাকা বেক্সিমকোর টেক্সটাইল বিভাগের বিদ্যমান পরিবেশ-বান্ধব কারখানার আধুনিকায়ন ও বিস্তৃতকরণ এবং নতুন জ্বালানিবান্ধব যন্ত্রপাতি কেনার পেছনে ব্যয় করা হবে। 

বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডের বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বএিসইসরি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বাসস’কে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যারা ইসলামী শরীয়াভিত্তিক বিনিয়োগ পছন্দ করে। তাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্র কম। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এসএলআরের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে। একইসাথে যারা সুদ নিতে চায় না, তাদেরও অনেক টাকা পড়ে আছে। এ ধরনের বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায়, তারা এখন শরীয়াভিত্তিক সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে।’ 

তিনি মনে করেন এই সুকুক বন্ড ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে যে বিপুল অলস টাকা পড়ে আছে, সেই টাকা বিনিয়োগে নিয়ে আসতে পারবে, যা জাতীয় উন্নয়ন ও পুঁজির সংস্থানে ব্যবহৃত হবে। তখন এই অলস টাকা দেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে অবদান রাখবে। 

তিনি বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বেক্সিমকোকে দিয়ে শরীয়াভিত্তিক বন্ডের সূচনা হলো। আশ করি ভবিষ্যতে দেশের বাইরে থেকেও এক্ষেত্রে আরও বড় বিনিয়োগ আসবে। 

এ বিষয়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কে চৌধুরী বাসস’কে জানান, এই সুকক নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন তারা। তার ভাষ্য, ‘অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সম্পদশালী ব্যক্তিবিশেষ, বিদেশী বিনিয়োগকারি ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই সুককের প্রাইভেট প্লেসমেন্টের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন।’

সুুকুকটির মুনাফা প্রদানের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ ভিত্তি হার ধরা হয়েছে। তবে সুকক-ধারীরা অতিরিক্ত মুনাফাও পাবেন। বেক্সিমকো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে যে ডিভিডেন্ড বা লাভ্যাংশ ঘোষণা করবে, তার সঙ্গে ভিত্তি হারের পার্থক্যের ১০ শতাংশ হিসাবে এই অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়া হবে।

উদাহরণ হিসেবে তথ্য স্মারকে বলা হয়, যদি কোনো বছর বেক্সিমকো ২৫ শতাংশ লাভ্যাংশ ঘোষণা করে, তাহলে ভিত্তি হারের সাথে এর পার্থক্য হলো ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে সুকুক-ধারীরা ভিত্তি মুনাফা হার ৯ শতাংশের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ মোট ১০ দশমিক ৬ শতাংশ মুনাফা পাবেন।

ইসলামি শরিয়া-সম্মত সুকুকটি বেক্সিমকোর একটি শরিয়া বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। গতানুগতিক সুদ-ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি দেশের অসংখ্য ধর্মভীরু মানুষের মধ্যেই অস্বস্তি রয়েছে। তাদের পছন্দ ইসলামী পণ্য। এই জনগোষ্ঠীকেই গ্রাহক হিসেবে পাওয়ার লক্ষ্য বেক্সিমকোর। 

বেক্সিমকোর সুুকুক বন্ডের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন,‘আমাদের দেশের পুঁজিবাজার মূলত ইক্যুইটি নির্ভর। বিনিয়োগকারিদের সুরক্ষার জন্য পণ্যের বহুমূখীকরণের বিশেষ প্রয়োজন। বর্তমান সরকার অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে এর উপর খুব জোর দিয়েছেন। সেটার ভিত্তিতে প্রাণের দুটি বন্ড ইস্যু হয়েছে, এখানে বিদেশীরা পর্যন্ত যুক্ত আছেন। এটার সাথে এখন যুক্ত হলো গ্রিন সুকুক বন্ড, কারণ এখন অনেকে ইসলামী পণ্য পছন্দ করে।’

তিনি মনে করেন গ্রিন সুকুক বন্ডের বাড়তি সুবিধা হচ্ছে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ গতানুগতিক বন্ডের পরিবর্তে শরীয়াভিত্তিক বিনিয়োগ পছন্দ করে। তিনি বলেন, বেক্সিমকো বন্ডের বিশেষ সুবিধা হলো-এটি বিনিময় বা রুপান্তরযোগ্য। ভবিষ্যতে চাইলে শেয়ার রুপান্তর করা যাবে। এ ধরনের সুবিধা থাকার কারণে চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণ আবেদন জমা পড়বে বা  অনেক বেশি সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। 

জায়েদ বখত বলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রিন বন্ডের ক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংক দু’টো জিনিস করেছে। প্রথম হলো আইন অনুযায়ী আমরা এর আন্ডার রাইটিং করেছি, যদি কোন কারণে এর আন্ডার সাবসক্রাইব হয় বা আবেদন কম জমা পড়ে। তবে আমি নিশ্চিত দেশের প্রথম সুকুক বন্ডের ক্ষেত্রে আন্ডার সাবসক্রাইব হবে না বরং চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আবেদনকারি থাকবে। দ্বিতীয়ত আমরা কো-ইস্যুয়ার হয়েছি। এদিকে থেকে আমরা কিছু কমিশন পাবো।’ 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারিখাতের প্রথম ইসলামী সুকুক বন্ড বেক্সিমকোর মত স্বনামধন্য নামী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে, সেখানে অগ্রণী ব্যাংকের থাকাটা সুনাম অর্জণের দিক থেকে ভাল। সুকুক বন্ড  পুঁজিবাজারে বিশেষ করে ইসলামী পণ্য প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। তিনি মনে করেন,আগামীতে বেক্সিমোর আর্থিক প্রতিবেদন দেখে অন্য প্রতিষ্ঠান বাজারে বন্ড আনার ব্যাপারে উৎসাহিত হবে। প্রাণ এবং বেক্সিমকোর মত নামকরা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বাজারে বন্ড ছাড়া শুরু করায় তিনি বিএসইসিকে ধন্যবাদ জানান। 

এ বিষয়ে দেশের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ওয়াসেক মোহাম্মদ আলি বলেন, ‘সুকুক বহু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক মানুষ রিবা বা সুদ রয়েছে এই ধরণের লেনদেন বা আর্থিক কার্যক্রমে জড়াতে চান না। ফলে প্রচলিত সঞ্চয় মাধ্যমের বিকল্প হিসেবে সুকুকটি এই ঘরানার গ্রাহককে আকর্ষণ করবে।’

গ্রীণ সুকুকের আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এটি বিনিময় বা রুপান্তরযোগ্য। সুকুক-ধারীরা প্রতিবছর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সুকুক বেক্সিমকো লিমিটেডের সাধারণ শেয়ারে রুপান্তর করতে পারবেন। এক্ষেত্রে রুপান্তর হারের উপর ২৫ শতাংশ ডিসকাউন্ট রাখা হবে। বিনিময় করার নির্দিষ্ট দিনের আগের ২০ কার্যদিবসের গড় মূল্যই হবে রুপান্তর রের হার।

এই মার্চেন্ট ব্যাংকার আরও বলেন, ‘যদি একজন সুকুকধারী শেয়ারে রুপান্তর করেন, আর যদি বেক্সিমকো ২৫ শতাংশ লাভ্যংশ ঘোষণা করে, তাহলে তিনি ৩ বছরে আনুমানিক ২১ থেকে ২৭ শতাংশ রিটার্ন পেতে পারেন।’

সুকুকের প্রতিটি এককের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। একজন ব্যক্তিকে কমপক্ষে ৫০০০ টাকার সুকুক কিনতে হবে। এটি একটি সম্পদ-ভিত্তিক সুকুক, যা বেক্সিমকোর সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, এর যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল বিভাগের যন্ত্রপাতি দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি বেক্সিমকো তাদের কর্পোরেট গ্যারান্টি প্রদান করবে।

এই সুকুকের ক্রেডিট রেটিং করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে ‘এ’। গ্রীণ সুকুকের ট্রাস্টি ও ট্রাস্ট ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ। সিটি ব্যাংকের ক্যাপিটাল রিসোর্স লিমিটেড থাকবে ইস্যু উপদেষ্টা, যা ইস্যু আয়োজক ও ইস্যু ব্যবস্থাপক। অগ্রনী ইক্যুইটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থাকবে যুগ্ম ইস্যু ব্যবস্থাপক হিসেবে। এইআইএল, এবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও এআইবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এক্ষেত্রে আন্ডার রাইটারের দায়িত্ব পালন করবে।

আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ খান বলেন,‘বিনিয়োগকারিদের জন্য এই সুকুক বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। এই বাজারে উচ্চ-মুনাফার সঞ্চয়ের মাধ্যম এমনিতেই সীমিত। সেই হিসেবে এই সুকুক নতুন বিনিয়োগের পথ খুলে দিল। ব্যাংকিং খাতে অত্যাধিক তারল্য যেহেতু আছে, তাই এই বিনিয়োগ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads