• মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮

অপরাধ

এলএসডি উদ্ধারে দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ০১ জুন ২০২১

মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া নতুন মাদক ‘এলএসডি’ নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। তাই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে এখন আলোচনার বিষয় এলএসডি। এ মাদক যেন দেশে বিস্তার করতে না পারে সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এলএসডি উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। গত রোববারও রাজধানীর খিলগাঁও থেকে এলএসডিসহ ৫ যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে।

এদিকে, রাজধানীর একটি বাসা থেকে এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগ। ডিবি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তারা এই মাদকের সন্ধান পেয়েছেন। এরপরই শুরু হয় এ মাদক নিয়ে আলোচনা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত এলএসডি নেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়। তবে হ্যালুসিলেশন, উদ্বিগ্নতা, হতাশায় নিমজ্জিত হওয়া সাধারণ বিষয়। চোখ বন্ধ করেও এরা দেখতে পায়। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের মাদক হ্যালুসিনেশন ঘটায়, ভিন্ন অলীক জগতেও নিয়ে যায়। তাই এই মাদকের সোর্স বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমাদের জানা মতে, বিদেশ থেকে আসে এসব। সেই পথগুলো বন্ধ করতে হবে।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ এলএসডিতে আসক্ত রোগীর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘এটা বাংলাদেশে এর আগেও নানাভাবে এসেছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচার কথা রোগীদের কাছে শুনিনি কখনও।’ এর ভয়াবহতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই মাদক যারা নেয় তাদের কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। একপর্যায়ে এমন হয় যে তারা নিজেকে শেষ করে দেয়।’

এলএসডি মাদকের ভয়াবহতা উল্লেখ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘এই মাদক সেবনে হ্যালুসিনেশনের সৃষ্টি হয়। একবার গ্রহণ করলে প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো কার্যকারিতা শরীরে থাকে।’

তিনি বলেন, এলএসডি মাদক মানুষের মধ্যে বিভ্রম (হেলুসিনেশন) তৈরি করে। এটা সেবন করার পর মস্তিষ্কে অ্যাফেক্ট হয়, যা ব্যক্তির ব্যবহার ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশেষ করে এটা গ্রহণের পর সাধারণভাবে যে ধরনের রং প্রকৃতিতে দেখা যায়, তার থেকেও বেশি রং দেখতে পাওয়া যায়। এ মাদকের ভয়াবহতা অনুধাবন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এটিকে ‘খ’ শ্রেণির মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।’ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে আমরা এ ধরনের মাদক জব্দ করি। এরপর আর এই এলএসডি মাদক দেশে আসেনি, সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে এই মাদক উদ্ধার হয়েছে। এ ধরনের মাদক যেন দেশে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্কতা এবং বিশেষ নজরদারি রেখেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।’

গত রোববার সন্ধ্যায় বিভিন্ন এলাকা থেকে এলএসডিসহ ৫ জনকে আটকের পর পল্টন থানায় সংবাদ সম্মেলন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আব্দুল আহাদ। সেখানে তিনি জানান, ঢাকায় এলএসডি বিক্রিতে ১৪ থেকে ১৫টি গ্রুপ জড়িত। গ্রুপগুলো এক বছর ধরে এলএসডি বিক্রি ও সেবন করে আসছিল। অনলাইনে এলএসডি বিক্রি করত তারা।

পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আটক ব্যক্তিরা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আসক্ত হয়। নিজেরা সেবন ও বিক্রি শুরু করে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা এলএসডি দেশে এনে বিক্রি করছিলেন। এলএসডিসহ গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, সাইফুল ইসলাম সাইফ, এসএম মনওয়ার আকিব, নাজমুস সাকিব, নাজমুল ইসলাম ও বিএম সিরাজুস সালেকীন। এদের সবাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের কাছ থেকে ২০০০ মাইক্রোগ্রাম এলসডি, আইস ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়।

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, এলএসডি নিয়ে ঢাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মাদক উদ্ধারে নিয়োজিত সকল টিমকে সতর্ক করে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারা এ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে বিষয়ে তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। নতুন এই মাদক যেন কোনোভাবেই বিস্তার করতে না পারে সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।   

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, নতুন মাদক এলএসডি নিয়ে ইতিমধ্যে সকল থানা পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। এলএসডির পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, নতুন এলএসডি মাদক নিয়ে র্যাব ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছে। র্যাবের সারা দেশের ইউনিটগুলোকে এ ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এছাড়াও ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও কাজ করছে। র্যাব এর আগেও সারা দেশে মাদক উদ্ধারে বিশেষ সফলতা দেখিয়েছে। এলএসডি উদ্ধারেও র্যাব সফলতা দেখাবে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে ডিএমপির এ নির্দেশনার বিষয়ে কামরাঙ্গীচর থানা পুলিশের অফিসার্স ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পাওয়ার পর এ বিষয়ে সকল অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি।

নজরদারিতে কুরিয়ার সার্ভিস : কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি এ সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বাইরে মাদক পাচারের সময় বড় কয়েকটি চালান আটক করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর নড়েচড়ে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

এসব চোরাকারবারিকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি যেসব কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, কুরিয়ারে পণ্য পাঠাতে হলে ব্যাংকের মতো প্রাপক ও প্রেরকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচার রোধে বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, বিমানবন্দরে পার্সেল কুরিয়ার স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার, কুরিয়ারের পাতায় এনআইডি কপি সংযুক্ত, লাইসেন্সবিহীন কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে আইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডাক বিভাগের কাছে লাইসেন্স এবং লাইসেন্স ছাড়া কতগুলো কুরিয়ার সার্ভিস আছে সে তালিকাও চাওয়া হয়েছে।

নিয়মিত অভিযান চলবে জেনেভা ক্যাম্পে : রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকে মাদকের অন্যতম আখড়া উল্লেখ করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এখান থেকে রাজধানীর প্রায় অর্ধেক এলাকায় মাদক সরবরাহ হয় বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেনেভা ক্যাম্পের বিষয়টি উল্লেখ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, ক্যাম্পটি মাদক মুক্ত করতে হলে, র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। আর র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, জেনেভা ক্যাম্প অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা হওয়ায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে অভিযান চালিয়ে আট লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ক্যাম্পে ৩৪ থেকে ৩৫টি মাদকের আস্তানা রয়েছে। যেখানে অনেক মাদক ব্যবসায়ী ও সশস্ত্র ডাকাত অবস্থান করে। ফেব্রুয়ারি মাসে বিপুল অস্ত্র ও মাদকসহ জকি ডাকাতের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ডাকাতসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়।

পুলিশ জানায়, জেনেভা ক্যাম্প ঢাকা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ মাদক এলাকার মধ্যে অন্যতম। এ ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতা দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads