• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৭
ছায়াবাড়ি

প্রতীকী ছবি

ফিচার

ছায়াবাড়ি

  • প্রকাশিত ১৩ মে ২০২১

রাঢ়দেশের এক সম্পন্ন গৃহস্থ মির্জা গালিব একদিন সন্ধেবেলায় অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেলেন। আকাশ এদেশে খুব বড় হয় আর দিগন্ত পর্যন্ত একেবারে ফাঁকা থাকে। সেজন্য দুপুরে নির্মেঘ আকাশের দিকে চাইলে উপুড় করা নীল পেয়ালার কথাই মনে হয় বটে, কিন্তু সন্ধের পর তারা ফুটতে শুরু করলে আকাশ যেন পৃথিবী গিলে নিতে আসে। সন্ধ্যাতারাগুলো তখনো সব দেখা দেয়নি। শীতের আকাশ খানিক বাদেই ঝকঝকে হয়ে উঠবে, কিন্তু তারাদের গায়ে যেন তখনো একটু ময়লা মাখানো আছে। মির্জা গালিব তাঁর নিজের বাস করার মাটির ঘরের বারান্দায় একটা লোহার চেয়ারে বসে ছিলেন। তাঁর সামনেই বিরাট খামারবাড়ি। বারান্দায় বসলে আকাশটা দেখা যায় তো বটেই, গোয়াল থেকে গরুদের কান নাড়ার শব্দও আসে।

মির্জা গালিব এই সময়টায় স্থির হয়ে বসে থাকেন, ঠিক যেন কাঠের মূর্তি। মাথার ওপরে মাটির দেয়াল ভেদ করে একটা তালগাছের খুঁটি বেরিয়ে এসেছে। তাতে নতুন কেনা ঘোড়ার জিনটা চাপানো আছে, মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল সেখান থেকে। একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন তিনি। গায়ের মোটা পশমি চাদরটা দিয়ে নাক পর্যন্ত ঢেকে নিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, তারার আলো অনেকটা বেড়ে গেছে, অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে বিশাল একটি মাটির বাড়ি তার সামনে ভেসে উঠেছে। এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় বাড়িটির আলকাতরা মাখানো বাইরের দিকের দেয়াল। আকাশের অন্ধকারের চেয়ে আলকাতরার রং কয়েক পোঁচ বেশি। মির্জা গালিব হাত বাড়াতে গিয়েই বুঝতে পারলেন ছোঁয়া যাবে না ঐ নিরেট দেয়াল। বাড়িটা যেমন কাছে, তেমনই দূরে। মাটির বাড়ি, কিন্তু তেতলা। প্রত্যেক ঘরে এতো আলো যে ঘরগুলোতে যা আছে তার সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। দেয়ালে পোঁতা পেরেকের গা বেয়ে টিকটিকিটা দুবার লেজ দুলিয়ে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে একটা পোকা ধরল, তা পর্যন্ত দেখা গেল। আসলে আলো মির্জা গালিবের নিজেরই চোখ। এত আলো যে সব খুঁটিনাটি দেখা গেল। কড়ি-বরগা, শালকাঠের দরজা আর মোটা মোটা খুঁটিগুলো, ঘরের ভেতরের মাটির দেয়ালে ধবধবে সাদা চুনকাম, ঘরের চালের নিচে বাঁশের বাতার তৈরি রং করা সিলিং-এসব তাঁর চোখে পড়ল। আকাশে অন্ধকার।

বাড়িটা প্রথমে যেন মাটি থেকেই ভেসে উঠল। খামারের চেয়ে অনেক বড় আকারের। কিন্তু এখন খামারের একটা কোণেই অত বড় বাড়ির বেশ জায়গা হয়ে গেল। মাটি থেকে ভেসে উঠেই কয়েক মুহূর্ত যেন কেঁপেছিল বাড়িটা, তারার দিকে চাইলে যেমন মনে হয়। তবে তা একটু সময়ের জন্যই। মাটি থেকে খানিকটা উঠে, মির্জা গালিবের নজর বরাবর সেটা স্থির হলো। তাঁর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো, লোহার চেয়ারটা এঁটে ধরল তাঁকে, তিনি সমস্ত প্রাণ যেন সারা শরীর থেকে টেনে এনে দুই চোখের মণিতে রেখে বাড়িটা দেখতে থাকলেন।

হারিকেন জ্বালিয়ে বেশ কয়েকজন মাহিন্দার কিষাণ খামারবাড়িতে কাজ করছিল। দুদিন ধরে পেটানো ধান মড়াই-এ তোলার কথা ছিল, খামারের উঠানের চার কোণে চারটি আর মাঝখানে দুটি-এই মোট ছয়টি মড়াইয়ের কোনোটা ভরা, কোনোটা আধভরা, দু-একটি ধান দিয়ে পূর্ণ করে চাল তৈরি করা হয়েছে। আজ ধান তোলা হচ্ছে একেবারে উত্তর-পশ্চিম কোণের আধভরা মড়াইটিতে। মাটির বাড়িটিও সেদিকেই ভেসে রয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার, কিষাণেরা ধানের বস্তা কাঁধে স্বচ্ছন্দে বাড়ির দেয়াল ভেদ করে যাতায়াত করছে। কালো আলকাতরার নিরেট দেয়াল কিংবা সাদা কাফন পরানো মুর্দার মতো স্থির ঘরের ভেতরের চুনকাম করা দেয়ালগুলো, এমনকি লোহার সিন্দুক, কাঁঠালকাঠের চৌকি ইত্যাদি আসবাব কিষাণদের যাতায়াতে বিন্দুমাত্র বাধার সৃষ্টি করছে না। মির্জার মনে হলো, বাড়িটাই নিরেট আর কিষাণগুলোর শরীর ছায়া দিয়ে তৈরি। তারা সব তাদের ছায়াময় শরীর নিয়ে বাড়িটাকে পাশাপাশি, কোনাকুনি যেমন ইচ্ছে ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা মির্জা গালিবকে এতটাই উৎকণ্ঠিত করে তুললো যে যখনই মুনিষদের কেউ ঘাড়ে বস্তা নিয়ে বাড়ির দেয়াল ছুরি দিয়ে জল কাটার মতো পার হচ্ছিল, তিনি তার লোহার চেয়ার থেকে ঝুঁকে এতোটাই সামনে চলে আসছিলেন যে দু-একবার চেয়ারটাও উবু হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি বহু কষ্টে নিজেকে সামলান।

বাড়িটা একবার এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে তার মনে পড়ে গেল তাদের কয়েক পুরুষের রাখা ঝকঝকে হিরেটার কথা। তিনি জানেন কোথায় সেটা লুকনো আছে। একমাত্র তিনিই জানেন, কারণ তিনিই বারবার সেটাকে সরিয়ে রাখেন। কাশ্মীরি কাজ করা ওয়ালনাট কাঠের তৈরি পুরনো বাক্সটায় খুব ঠান্ডা অন্ধকারের মধ্যে সেটা হয়তো ১০০ বছর ধরে ঝকঝক করছে। এখন বাড়িটাও যেন তেমন অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে রাখা উত্তাপহীন সাদা আলো ছড়াচ্ছে। হিরেটায় কতগুলো কোণ আছে, শত চেষ্টা করেও মির্জা কোনোদিন তার সুরাহা করতে পারেননি। এই বাড়ি মোটামুটি চতুষ্কোণ হলেও তিনিও এখন একটি রহস্যের ভেদ খুঁজে পেলেন না।

বেশ বোঝা যাচ্ছিল, ওটা এখনই আকাশ-কুসুমের মতো শূন্যে মিলিয়ে যাবে। শীতের তারা ফোটা কালো আকাশ এখন পৃথিবীর সঙ্গে সংগত হবে। কাজেই শেষবারের জন্য খুঁটিনাটি দেখে নেওয়া দরকার। একটু একটু করে দেখা নয়। চোখ দুটি সম্পূর্ণ বুজিয়ে ফেলে পলকের জন্য তাকালে যে ছবিটা পাওয়া যায়, সমস্ত খুঁটিনাটিসহ গোটাটাকে তেমনি একবারে দেখে নিতে হবে। আর একটুও সময় নেই, সময় এতো কম! অসম্ভব জরুরি কাজ শেষ করার জন্য সময় এতো কম কেন, তা নিয়ে আক্ষেপ হতে থাকল মির্জার। তবু সময়ের এত অপূর্ণতা মেনেই তিনি বাস্তবের মুখোমুখি হলেন। চোখ বুজলেন, পলকের জন্য খুললেন, বাড়িটা মরচে-ধরা একটা সূচক নিজেকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে দিল। চোখ খোলাই রেখেছিলেন, নাকি আবার বুজেছিলেন, তিনি আর কোনো দিনই তা বলতে পারেননি।

সমস্ত বাড়িটা গলা-বরফ আর কুয়াশা হয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। লোকজনের কথা কানে এলো তাঁর-পিঠে অনেক ভারী বস্তার চাপে কোমর থেকে শরীরের সামনের দিকটা মাটির সঙ্গে সমান্তরাল করে কিষাণদের থপ থপ ধীরপায়ের শব্দ আবার শুনতে পেলেন মির্জা। আর কোনো ভয় নেই, শরীরের চামড়ার ওপরে নীল উল্কির মতো বাড়িটার ছবি তার মনে বসে গিয়েছিল। এ জীবনে আর তাকে হারানোর শঙ্কা নেই। এ ছবি যদি একান্তই যায়, তাহলে তাঁর মৃতদেহের সঙ্গেই যাবে মাটির অন্ধকারে মিশে। মির্জা ঘাড় খাড়া করে সিধে হয়ে আবার বসলেন। পাশে হারিকেনের আলোয় কিষাণেরা তাঁর অস্পষ্ট চেহারা দেখতে পেল। তারা বোঝে যে তিনি ওখানেই আছেন তাঁর কালো শীর্ণ মুখ অন্ধকারের দিকে তুলে। কপালে তিনটে আড়াআড়ি আর তিনটে লম্বালম্বি ভাঁজ আছে, যেগুলো তাঁর জন্মদাগের মতো তাঁর মরা মুখের ওপরেও থাকবে। তাঁর বিষণ্নতা, বিরক্তি, অসন্তোষ আর তিরিক্ষে মেজাজ্ত এগুলোকে শারীরিক ব্যাপার করে তুলেছে কপালের এই ভাঁজ আর কপালের দুই পাশে থ্যালানে গর্তের নিচে উঁচু দুটি হাড়।

হারিকেনগুলো এখন আর তেমন আলো দিচ্ছে না। কালো কালি লেপ্টে আছে কাচগুলোতে। কিষাণেরা খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে চায়। খামারের উত্তর-পশ্চিমের মড়াইটা এখন সবাই মিলে ঘিরে আছে, সব কাজ এখন ওখানেই। মড়াই ভরে গিয়ে ধানের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। খুব দ্রুত হাতে কাজ চলছে, খড়ের তৈরি গোল মোটা ‘বর’গুলো সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছে মড়াই। এবার খড় দিয়ে ছাউনি দেওয়ার কাজটুকু বাকি।

একটু পর সবক’টি হারিকেন চলে গেলে, কেরোসিনের পোড়া গন্ধটা যেন একবার নাকে টের পেলেন। পায়ের শব্দগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে। ছায়ায় তৈরি মানুষগুলো আবছা আলোর বৃত্তের মধ্যে থেকে সরে গেলে মির্জা একবারের জন্য নিকষ কালো অন্ধকার দেখতে পেলেন। তারপরে আকাশ ভরা তারার আলো তাঁর চোখে সয়ে এলো। মাথার ওপর থেকে ঘোড়ার নতুন জিনের তাজা চামড়ার গন্ধটা আর একবার ভেসে এলো। মির্জা উঠে দাঁড়ালেন, গরম চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তারপর ছোটখাটো কালো মানুষটি ধীর পায়ে খামারবাড়িটা পার হলেন। সরু গলিটায় ঢুকতে কষ্ট হলো তার। চামড়ার চটি জোড়া ঠান্ডায় লোহার মতো শক্ত। গলির ভেতরটায় অন্ধকার, রাঢ়ের শক্ত সাদা উঁচু-নিচু মাটিতে বারবার হোঁচট খেলেন তিনি।

বাড়িটা পার হয়ে গ্রাম-লাগোয়া রবিশস্যের মাঠে এলেন তিনি। বড় নালাটায় শীতে পানি প্রায় নেই। ডিঙিয়েই পার হওয়া গেল। তারপর প্রদীপ আকারের পুকুরটার কটু বিস্বাদ আমের বাগানটা পেরিয়ে, আট-দশটা শ্যাওড়া গাছের জমাট অন্ধকার পিণ্ডটাকে হাতের বাঁয়ে রেখে বড় মাঠে নেমে পড়লেন।

মির্জা গালিব কোনো দিন আর ফিরে আসেননি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads