• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

ফিচার

বায়জিদ বোস্তামী ও আজকের বালক

  • প্রকাশিত ৩১ মে ২০২১

মাসুম আলভী

 

“কহিল মা, মরি মরি! বাছারে আমার, পানি হাতে করে সারা রাত্রটি ধরি দাঁড়াইয়া আছো? ঘুমাওনি আজ? চোখে এলো জল ভরি।” কবি কালিদাসের কবিতায় মায়ের আবেগ মাখানো কথা পৃথিবীময় মানুষের মুখে ভাসছে। বায়জিদ বোস্তামীর মাতৃভক্তির গল্প কে না জানে। মা বড় ধন আমূল রতন, বুঝলো বায়জিদ। বুঝলে না হায় তুমি! একদিন বায়জিদ বোস্তামীর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ওস্তাদকে বলে মাদরাসা থেকে ফিরার পথে বন্ধুর সাথে দেখা। বন্ধু খেলার আহ্বান করে। বায়জিদ বললেন আরেক দিন খেলবো। বন্ধু তখন বলল, তুমি হেরে গেছো। বায়জিদ হেসে বললেন, অনেক সময় বিজয়ের চেয়ে হেরে যাওয়াই কল্যাণকর। বাড়িতে মা অসুস্থ। আমি চললাম। 

মায়ের অবস্থা দেখে বায়জিদ বললেন, কিছু চিন্তা করো না মা। আল্লাহ সব ঠিক করে  দেবেন, ইনশাল্লাহ। হেকিমের খুঁজে ছুটে গেলেন বায়জিদ। বাড়িতে হেকিমকে না পেয়ে আশপাশে খুঁজতে লাগলেন। একটু এগিয়ে যেতেই হেকিম সাহেবের সাথে দেখা। হেকিমকে নিয়ে বাড়িতে আসলেন। হেকিম দেখে ওষুধ দিলেন এবং যাওয়ার সময় বললেন, বিশ্রামের যেন কোনো ব্যত্যয় না ঘটে। গভীর রাতে মা ঘুম থেকে জেগে বললেন, বাবা বায়জিদ পানি পান করবো। বায়জিদ পানি নিতে গিয়ে দেখলেন কলসে একটুও পানি নেই। কনকনে শীতের রাত। বায়জিদ পানির জন্য বেরিয়ে পড়লেন। পানি নিয়ে দেখলেন মা ঘুমিয়ে গেছে। হেকিমের পরামর্শ অনুযায়ী মাকে আর ডাকলেন না। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেল। বায়জিদের চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভর করলো। তিনি ভাবলেন পানি রেখে ঘুমিয়ে যাবেন কিন্তু আবার ভাবছেন যদি ঘুম ভেঙ্গে গেলে মা পানি খুঁজে না পান। এমনি করে ভাবতে ভাবতে রাতের কালো রেখা সরতে শুরু করে। মুয়াজ্জিনের মধুর আযানে মায়ের ঘুম ভাঙ্গে। চোখ খুলেই দেখলেন ছোটো বায়জিদ হাতে পানির পেয়ালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের চোখ অশ্রুসিক্ত হলো। মা বায়জিদকে জড়িয়ে ধরলেন, জিজ্ঞেস করলেন; ঘুমাওনি? বায়জিদ বললেন,  আপনি জেগে যদি আবার পানি না পান। মা অজু করে আল্লাহর কাছে অশ্রুবিসর্জন দিতে লাগলেন। হে আল্লাহ! আমার বায়জিদকে সুলতানুল আরেফিন বানিয়ে দিও। আল্লাহ তাঁর মায়ের দোয়া কবুল করলেন। বায়জিদ বোস্তামী জগদ্বিখ্যাত সুফিসাধক হলেন।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যুগকে গালি দিওনা। কারণ, আল্লাহই হচ্ছেন জামানা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২২৪৬) আজকের বালকরা বলে, আধুনিক যুগে সেকেলের নিয়ম, ভক্তি এখন চলে না। তাই আনিস আনসারি বলেছেন, ‘মানুষ সব পাল্টে গেছে জামানা ঠিকই আছে।’ আধুনিকতার উষ্ণ হাওয়ায় হারিয়েছে নিজের স্বকীয়তা। সোনালী  অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ ধুলোয় মলিন। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে নিষ্পাপ বালকদের হূদয়গুলোকে বিষিয়ে তুলছে। তারা ভাবছে আজকেই জীবন; নাচো গাও ফুর্তি করো। আর আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘অবিশ্বাসীরা বলে, শুধু দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি, জামানা ব্যতীত অন্য কিছুই আমাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না।’ (সুরা জাসিয়া, আয়াত নং-২৪)

পাবজি কিংবা ফ্রি ফায়ার গেমস হলে দিন দুনিয়ার খবর কে রাখে? মা যদি ডাকে, আসছি মা বলেই শেষ, আর আসা হয় না। ‘খাবার টেবিলে আছে, ঘুম থেকে উঠো, যাবে স্কুলে’ মা ডেকে ডেকে হয়রান। যদি বলে মা, দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসো গিয়ে। বালকের রাগের ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির লেলিহান শিখা দাউদাউ করে ওঠে। আমাকেই দেখো শুধু বাসায় আর সবাই কি মরেছে। মা অসুস্থ হলে ফেসবুকে পোস্ট করে। আমার মা খুব অসুস্থ আপনারা সবাই দোয়া করবেন। তারপর লাইক, কমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের খবর নেওয়ার সময় কই। ইরশাদ হয়েছে-‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাদের প্রতি উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো। আর তাদের প্রতি মমতাবশে নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া কর যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াপরবশে লালন-পালন করেছিলেন।’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত- ২৩, ২৪) আজকে হাজারও মায়ের চাপাকান্না হিমালয়ের মতো হয়ে আছে। কোনো দিন যদি মায়ের অশ্রুধারা নেমে আসে তবে জগৎ-সংসার হবে মহাসমুদ্র।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, তিনি আবারও বললেন ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক। এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল কার ব্যাপারে এ কথা বললেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘যে ব্যক্তি পিতা-মাতার একজন বা দুজনকে তাদের বৃদ্ধ বয়সে পেল অথচ জান্নাত অর্জন করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ২৫৫১) হে বালক, মিছে মায়ার খেলায় বিভোর হইও না। জান্নাত যদি পেতে চাও, মা-বাবাকে ভুল না। আধুনিকতার সাথে গা ভাসিয়ে ঈমান দিয়ো না।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads