• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জৈষ্ঠ ১৪২৯

ফিচার

বীথির 'ওমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি'

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ৩১ অক্টোবর ২০২১

রংপুর নগরীর নূরপুরের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে বীথি। চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। দারিদ্র্যের বেড়াজালের মাঝেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও বীথির পরিবারের জন্য ছিল কষ্টসাধ্য। যা ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যেতে থাকে আত্মহত্যার মতো অপরাধের দিকে। কিন্তু বীথিকে সে অপরাধ করতে দেননি মা ও বড় বোন। তাকে ফিরিয়ে এনেছেন মৃত্যুর মুখ থেকে, দিয়েছেন উৎসাহ।

শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম। বাড়ির সামনেই মায়ের সঙ্গে মুদি দোকান দিয়ে শুরু করেন পথচলা। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন বীথি। এক পা-দু পা করে সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০১০ সালে রংপুর জেলার হয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নেন বীথি। ওপেনিংয়ে ভালো করায় ঢাকার ক্রিকেটেও চলে আসেন তিনি। খেলেছেন ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব, লেজেন্ড অব ভাওয়াল ক্রিকেট একাডেমি, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমি ও রায়েরবাজার অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে। ক্রমাগত ভালো খেলতে থাকায় বীথির লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন হাতের মুঠোয় চলে আসে। কিন্তু সেই সময় বাধা হয়ে আসে শারীরিক অসুস্থতা। ২০১৭ সালে উইমেনস প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ চলাকালে অপ্রত্যাশিতভাবে নাকের ইনজুরিতে পড়েন। নাক থেকে ঝরতে থাকে রক্ত। চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও বীথির নাক থেকে রক্তপড়া সারেনি। একসময় জানতে পারেন, ক্রিকেট খেলা না ছাড়লে তার ৮০ শতাংশ ক্যানসার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই জলাঞ্জলি দেন ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন।

ক্রিকেটার হতে না পারলেও খেলা থেকে দূরে যেতে পারেননি বীথি। নিজেকে তৈরি করেন নতুন করে। এবার আত্মপ্রকাশ করেন প্রশিক্ষক হিসেবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ হুইলচেয়ার নারী ক্রিকেট টিমের ছয়দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোচিং জীবনের শুরু। এরপরই মাঠের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে সম্ভাবনাময় নারী ক্রিকেটার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড় তোলেন নারী ক্রিকেট একাডেমি।

২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে ক্রিকেট একাডেমির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন আরিফা জাহান বীথি। নিজের জমানো ১০ হাজার ও এনজিও থেকে মায়ের ঋণ নেওয়া ২০ হাজার টাকায় প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ব্যাট, বল, প্যাড, হেলমেটসহ ক্রিকেটের সব সামগ্রী কেনা হয়। বর্তমানে বীথির ক্রিকেট একাডেমিতে বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ২৫০ জন তরুণী। এখান থেকে চলতি বছর ১১ জন ক্রিকেটার বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) পরীক্ষা দিয়ে আটজন টিকে যায়। তারা সবাই নিম্ন আয়ের এবং অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে।

সম্প্রতি এই একাডেমির ২ বছর উপলক্ষে রংপুরে অনুষ্ঠিত হলো প্রথমবারের মতো টি-টুয়েন্টি মহিলা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। মহিলা ক্রিকেটার আরিফা জাহান বিথীর ব্যবস্থাপনায় এ টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। গত বুধবার রংপুর ক্রিকেট গার্ডেনে আয়োজিত টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বেগম রোকেয়া দল এবং রানার্সআপ হয়েছে সুফিয়া কামাল দল।

টুর্নামেন্টে মোট ৬টি দল অংশগ্রহণ নেন। এসব দলে অধিনায়কত্ব করেন জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ৬ খেলোয়াড়। খেলা শেষে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের হাতে ট্রফি তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রংপুর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মাহমুদুর রহমান টিটু।

ক্রিকেট প্রশিক্ষণের পাশপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন আরিফা জাহান বীথি। করোনা পরিস্থিতিতে অক্সিজেন ও খাবার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন অসহায় ও অন্তঃসত্ত্বাদের পাশে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে দরিদ্র্যদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন খাবার। বর্তমানে নিয়মিত অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বীথি।

নারীদের জন্য বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের আয়োজন, করোনা পরিস্থিতিতে সাহসী ভূমিকা পালন, বিভিন্ন সময় খাবার-ওষুধ নিয়ে হাজারো অসহায়-দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ‘ইন্সপায়ারিং ওমেন ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২১’ সম্মাননা পান আরিফা জাহান বীথি।

প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বীথি বলেন, কারো অসুবিধার কথা শুনলে চুপ করে থাকতে পারি না। আবার সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সহযোগিতাও করতে পারি না। আমার ফেসবুক পোস্টে সাড়া দিয়ে যারা প্রতিনিয়ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আগামীতেও সবাইকে এভাবেই পাশে নিয়ে অসহায়দের উপকার করে যেতে চাই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads