• রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

ফিচার

একজন নিভৃতচারী লেখক

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ১৩ মার্চ ২০২২

রাশিদা কামাল। পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে লেখক হিসেবেই নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন। তবে  নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন তিনি। এ পর্যন্ত তার ২০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখকের নতুন উপন্যাসের নাম ‘তোমার হাওয়ায় হাওয়ায়’। বইটি এ বছরই প্রকাশ পাবে। লেখক বলেন, ‘আমার লেখার অনুষঙ্গ অতি সাধারণ । চারপাশের ঘটনাই আমার গল্পের উপকরণ । এ জন্যই আমাকে অনেকে বলে আপনার উপন্যাসের সাথে আমার জীবনের অনেক মিল। কথাটা কাকতালীয় হলেও আমার ভালো লাগে এটা শুনতে। মনে হয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। এবারের বই মেলায় আমার কিছু বই ‘প্রিয়জন প্রকাশনী’ স্টলে আছে । আমি যদিও আমেরিকা আছি তবুও আমি এখানে বসে মেলা দেখি। মন পড়ে থাকে ওখানে। মেলায় সবার প্রাণস্পন্দন আমাকে ছুঁয়ে যায়।’ তার ২০তম বই ‘চারুলতা’র মোড়ক উন্মোচন হয়েছিল গত বছরের শেষের দিকে। রাশিদা কামাল তার ক্যারিয়ার শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৮০ সালে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত উদয়নের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি এনসিটিবি (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড)-এ বই লিখতেন। শিক্ষকতা, লেখালেখি, টিভি, রেডিওতে শিক্ষাবিষয়ক অনুষ্ঠান করা এসব নিয়েই সারা দিন ব্যস্ত থাকতেন তিনি। এরপর ২০০৫ সালে হঠাৎ করেই চলে আসলেন উত্তরায়। যোগদান করলেন সাউথ ব্রিজ স্কুলে। এখানে এসে অনেকটাই কাজের চাপ কমে যায় রাশিদা কামালের। একসময়ের ব্যস্ত মানুষটি যেন নিজেকে গুটিয়ে রাখলেন। অফুরন্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে আবার নতুন করে লেখা শুরু করলেন। রাশিদা কামাল বলেন, ‘উত্তরা এসে আমি লিখতে শুরু করলাম। সাউথ ব্রিজে খুব ভালো একটা লাইব্রেরি ছিল। আমি সেখানে বসেই লিখতাম। আমি প্রচুর বইও পড়তাম। একদিন আমার বড় ছেলে  আমেরিকা প্রবাসী তানিম কামাল বলল, আমেরিকায়  বাংলা কমিউনিটিতে যারা আছে তারা একটা ম্যাগাজিন বের করছে। আমাকে একটা লেখা দিতে বলল। আমি লিখলাম ওদের নিয়ে। আমার বড় ছেলে আমার সাথে ছিল। যেদিন ওরা আমেরিকা চলে যায় আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। ওরা যেদিন চলে গেল সেদিনের অনুভূতিটা লিখে পাঠালাম। লেখাটি আমার  প্রচুর আলোচিত হয়। আমার ছেলে আমাকে বলল আমার লেখাটার সবাই প্রশংসা করেছে। এরপর থেকে আমি নিয়মিত লেখা শুরু করলাম। এটা ২০১০ সালের ঘটনা। গল্পটার নাম ছিল ‘অনুভবে তোমরা’। রূপসী বাংলা ম্যাগাজিন ইন ইউএসএ-তে ছাপা হয়েছিল। এভাবেই শুরু। আমার প্রথম উপন্যাস ছিল ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু’। এই উপন্যাসে  মেয়েদের বিভিন্ন বিষয় প্রধান্য দিয়েছি। যেমন মেয়েরা স্বামীর সংসারে গিয়ে ভারত্বে চলে যায়। এমন রকম একটা স্বপ্ন নিয়ে সংসার শুরু করে। পরে তাদের সে স্বপ্ন থাকে না। যেমন-একটি মেয়ে ভালো ব্যাডমিন্টন খেলে, ভালো ছবি আঁকতে পারে। তাদের বিয়ে হয়ে যাবার পর তাদের প্রতিভাগুলো আর বিকশিত হয় না। তখন ওই মেয়েটি হয়ে যায় পরিবারের চাহিদা মেটানোর যন্ত্র। বেশিরভাগ বিবাহিত নারীরই একই অবস্থা।  দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মোহিনী’। এটিও নারীকেন্দ্রিক। এরপর রাশিদা কামাল বিদেশে চলে যান। সেখানে আরো অফুরন্ত সময় পান। কালি ও কলম যেন তার প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠল। একে একে লিখলেন-‘প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস’, ‘সোনামণিদের মিষ্টি নাম’, ‘কতদিন দেখিনি তোমায়’ (উপন্যাস), ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ (উপন্যাস), ‘কেটেছে একলা’ (উপন্যাস), ‘রিমঝিম ঘন বাদলে’ (উপন্যাস), ‘বড় সাধ জাগে (গল্পসমগ্র-১), ‘মন কেমন করে’ (উপন্যাস), ‘কেন দূরে থাক’ (উপন্যাস), ‘আমায় ডেকেছিল’, ‘জানতে ইচ্ছে করে’, ‘যখন এসেছিলে’, ‘বৃষ্টিবিহীন’, ‘বিজন বনে’, ‘বয়ে যায় বেলা’। সর্বশেষ ‘চারুলতা’। জীবনের নানামুখী অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রাশিদা কামাল বলেন, ‘একটা বয়স থাকে যখন মানুষকে ব্যস্ত থাকতে হয়। যেমন প্রথম জীবনে মানুষ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ ছাড়া অনেকে গান শিখে, ছবি আঁকে। আবার বিবাহিত জীবনে আরেক ধরনের ব্যস্ততা। আমার বিষয়টা একটু ভিন্ন। আমি যখন ইন্টারমিডেট পাস করি তখন আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমার বাচ্চা হয়। তারপরও আমি পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। জীবনে আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয় থেকে পড়াশোনা করেছি। প্রথমে হিস্ট্রি, পরে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন করেছি আইইআর থেকে।’ ২০১৪ সালে ‘মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল’ পান রাশিদা কামাল। নিজের ভাবনায় খেয়ালী হয়ে রাশিদা কামাল বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় জীবন বহতা নদী। আনন্দ বেদনার মিশ্রণে তা কেবল বয়েই চলে। আমারও তাই চলছে। মাঝে মাঝে আমার ছেলে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায়। তখন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে ডুবে থাকি। দুচোখ ভরে দেখি ঝরনার রজত ধারা, হাঁসেদের অবাধ সন্তরণ, গাছ পালায় ছাওয়া অরণ্য। মাঝে মাঝে নদীর কাছেও যাই। তখন মনে হয় নদী দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ছৈওয়ালা নৌকা। আর ছৈয়ের ভেতরে বসে আছে ঘোমটা টানা বউ। তখন নস্টালজিক হয়ে পড়ি। বাস্তবতা আর কল্পনার সমন্বয়ে দিন কাটে । মাঝে মাঝেই মনে হয় জীবনটা এতো সংক্ষিপ্ত কেন ! এতো সংক্ষিপ্ত বলেই জীবনের স্বপ্নগুলোও হয় সংক্ষিপ্ত। জীবনটা বড় হলে বেশ মজা হতো। বড় বড় স্বপ্ন দেখতাম! ভোরবেলায় লিখতে আমার ভালো লাগে। কেন যেন ভোরের শান্ত পরিবেশ আমায় লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। আমার এ ভালো লাগা অব্যাহত থাকুক এই আমি চাই।’

জীবনের শেষ অবধি লিখে যেতে চান এই লেখিকা। জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই তার। নেই খ্যাতির মোহ। নীরবে, নিভৃতে কালি ও কলমকে সঙ্গী করে কাগজের পাতায় আজীবন লিখে যেতে চান তার ভাবনার ডালিখানি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads