• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯

ফিচার

পান্তাভাতের গল্প জড়িয়ে আছে বাঙালির অস্তিত্বে

  • প্রকাশিত ০৩ এপ্রিল ২০২২

শাহীনা নদী

গরম এলেই বাংলার মাঠে-ঘাটে-ঘরে প্রায়ই দেখা যেত পান্তাভাত। এককথায়, গরমের ঠান্ডা হওয়ার আদি প্রথা। রাতের গরম ভাতে পানি ঢেলে মাটির হাঁড়িতে রাখা হয়। বাংলাদেশে একে বলা হয় পানি ভাত। পানিতে ভাত ভেজানো হয় বলে এর নাম ‘পান্তাভাত’ হয়েছে। একে আবার ভাত সংরক্ষণের প্রাচীন পন্থাও বলা যেতে পারে। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এই ভাত গরমে যেমন তাদের শরীর ঠান্ডা রাখে, পাশাপাশি শক্তিও জোগায়। দিনের প্রধান খাবার হিসেবে গ্রামের মানুষ পান্তা খেয়ে থাকে। পান্তাভাতের সঙ্গে থাকে কাঁচালঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা পোড়া, কাঁচা পেঁয়াজ, সরষের তেল ও লবণ। থাকে ডালের বড়া অথবা মাছ ভাজা বা তরকারি।

গ্রীষ্মের রাতে টিমটিম করা লণ্ঠনের আলোয় মাটির দাওয়ায় বসে মাঝখানে মাটির হাঁড়িতে পান্তাভাত গ্রীষ্মকালে গ্রামবাংলার একটি পরিচিত দৃশ্য। নিছক রসনা তৃপ্তিই নয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত, গরম ভাতের তুলনায় পান্তার উপকারিতা বেশি। অনেক পুষ্টিবিদদের দাবি, পান্তাভাতের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে এবং গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম পান্তাভাতে ১২ ঘণ্টার পর ৭৩ দশমিক ১১ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। এছাড়া ১০০ গ্রাম পান্তাভাতে ৩০৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৮৩১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ৮৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। গরমে শরীরে জলের অভাব দূর করে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। দীর্ঘক্ষণ ভাত ভিজিয়ে রাখার ফলে সহজপাচ্য হয় এর ফলে পেটের রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ভারতের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূমের মানুষও পান্তা খেতে ভালোবাসেন। তারা পান্তার সঙ্গে মাছের টক, পোস্তবাটা অথবা বড়া খায়। কুড়তি কলাইবাটা, কলাইগুড়ো, শাকভাজা, গন্ধরাজলেবু এবং ডালের বড়া দিয়ে পান্তা ভাত খুব উপাদেয় লাগে খেতে। পূর্ববঙ্গে পান্তাভাতের সঙ্গে শুঁটকি মাছের ভর্তা খাওয়ার প্রচলন আছে। পান্তাভাত সাধারণত খেটে খাওয়া মানুষের খাবার বলে পরিচিত হলেও হিন্দুশাস্ত্র ভগবানের ভোগ হিসাবে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। চণ্ডীমঙ্গলে পান্তাভাতের উল্লেখ আছে। পান্তাভাতের আরেক নাম কাঞ্জী। বৈষ্ণবরা রাধাকৃষ্ণকে পান্তা ভোগ দেন জ্যৈষ্ঠ মাসে। এর নাম পাকাল ভোগ। এতে থাকে পান্তাভাত, দই, চিনি, কলমিশাক ভাজা এবং দুই-এক রকমের নিরামিষ তরকারি। দুর্গাকেও দশমীতে পান্তা ভোগ দেওয়া হয়। কথিত আছে গ্রামের মেয়ে উমা অনেক দূর পেরিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেন। তাই সহজপাচ্য ও শরীর ঠান্ডা করার জন্য এই ভোগ দেওয়া হয়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে যাতে ছেলেপুলেরা শ্মশানবাসী বাপের কাছে ঐতিহ্যপূর্ণ খাবারের গল্প না করতে পারে, তার জন্য দেওয়া হয় পান্তাভোগ।

আবার অনেকের মতে, মেয়ে চলে যাচ্ছে। এই দুঃখে মা-বাবা আগের দিনের রান্না করা খাবার খায়। অনেক বনেদি বাড়িতে এখনো এই রীতি মানা হয়। একই ভোগে থাকে পান্তাভাত, ইলিশ মাছ, কচুরলতি বাসি, তেঁতুল অথবা আমসির চাটনি এবং মাছের মাথা দিয়ে অম্বল। বাঙালির প্রিয় এই পান্তাভাতের সঙ্গে কী থাকবে, তা নিয়ে অঞ্চলভেদে পার্থক্য দেখা যায়। মাটির হাঁড়িতে রাখা পান্তাভাত পরিবেশন করা সময় পানি ছেঁকে নেওয়া হয়। দরিদ্র মানুষের কাছে সঙ্গের উপাদানে বাহারি আইটেম সাধারণত দেখা যায় না। কাঁচালঙ্কা অথবা শুকনো লঙ্কা পোড়া, কাঁচা পেঁয়াজ, নুন আর সরষের তেল। কখনো শাকভাজা অথবা তেঁতুল।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads