• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
শাহনাজ পারভীন-একজন আলোর দিশারি

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

শাহনাজ পারভীন-একজন আলোর দিশারি

  • প্রকাশিত ১১ এপ্রিল ২০২২

শাহনাজ পারভীন অদম্য এক নারীর নাম। যার স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। ছোটবেলা থেকেই যিনি স্বপ্ন দেখতেন আদর্শ জাতি গড়ার। স্বপ্নটা তার পারিবারিক পরিবেশ থেকেই  সৃষ্ট।  তার পিতা-মাতা দুজনেই শিক্ষক। সমবয়সীরা যখন পুতুল খেলা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেসময়ে তিনি খেলতেন ‘ছাত্র, শিক্ষক’ খেলা। দুপুরে যখন সবাই ভাতঘুমে, শাহনাজ তখন বাড়ির বৈঠকখানার সামনে কাঠি দিয়ে মাটিতে গোল দাগ দিতেন। বৃত্তাকার সেই দাগের ভেতর কাল্পনিক নাম লিখে ‘ছাত্র’ বানাতেন আর নিজে শিক্ষক  সেজে ‘নামতা, ছড়া’ গল্প  ইত্যাদি পড়াতেন। কাণ্ড দেখে মা-বাবা হাসতেন। ছাত্রী হিসেবেও ছিলেন মেধাবী। প্রথম হওয়াটা যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছিল তার। ফলে সদাহাস্যেজ্জ্বল  এই মেয়েটিকে স্নেহ করতেন সবাই।

‌ক্লাসে ভালো ফলাফলকারী এই মেয়েটিকে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে ১৯৯১ সালে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। স্বামী  মোহাম্মদ আলী পেশায় ছিলেন  মাদ্রাসা শিক্ষক। তখন সবে ১৫-তে পা দিয়েছেন শাহনাজ! কিছু বুঝে উঠার আগেই সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন শাহনাজ। রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হওয়ায় স্বামী ছাড়া শ্বশুরবাড়ির কেউই চায়নি তিনি পড়াশোনা করুক। যৌথ পরিবারের বড় বউ হয়ে সকল দায়িত্ব পালনের পর নিজের জন্য সময় পেতেন খুবই কম। সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যান শাহনাজ। বিয়ের পরবর্তী বছর, ১৯৯২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আলিম পাস করেন তিনি। সেবছর মাদরাসা বোর্ডে সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় হন। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময় শাহনাজের কোল আলো করে এলো কন্যাসন্তান। এদিকে সামনে পরীক্ষা। পড়ার টেবিলের কাছেই ছিল দোলনা। দোলনার এক কোনায় দড়ির একটা প্রান্ত বাঁধতেন, অন্য প্রান্ত বাঁধতেন পায়ের বুড়ো আঙুলের সঙ্গে। এভাবে মেয়েকে দোলাতেন আর বই পড়তেন শাহনাজ । এভাবেই শত প্রতিকূলতার উপেক্ষা করে বগুড়া সরকারি আজুিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে  ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ১৯৯৬ সালে স্নাতক ও পরের বছর স্নাতকোত্তর করেন। এবং দুটোতেই প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। পিতা-মাতা ও স্বামী তিনজনেই শিক্ষক। ফলে পেশাটার প্রতি শাহনাজের অন্য রকম টান ছিল। নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ২০০৩ সালে শেরপুর উপজেলা সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকেই বাচ্চাদের কীভাবে আরো ভালো করে পড়ানো যায় যে বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। অল্পদিনেই বাচ্চাদের সাথে দারুণ সক্ষমতা গড়ে উঠে তার। শাহনাজ বাচ্চাদের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন।  কোনো বাচ্চা একদিন বিদ্যালয়ে না এলে তিনি খোঁজখবর নিতেন।  প্রয়োজনে তার সাথে দেখা করতে বাড়িতে চলে যেতেন। এভাবেই সবার প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেন তিনি। কয়েক বছরের শিক্ষকতা পেশায় তিনি অনুধাবন করলেন দারিদ্র্যতা, পড়াশোনার প্রতি অনীহা, পারিবারিক সমস্যা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। শাহনাজ তখন নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৩ সালে নিজের বাসার একটি কক্ষে সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুদের ডেকে এনে পড়াতে শুরু করেন। স্কুলটির নাম ‘শেরপুর শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর পাশাপাশি বই-খাতা-কলম, পোশাক, ব্যাগ, টিফিন সবই ফ্রি-তে বিতরণ করেন তিনি। ২০১৭ সালে শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তার এই স্কুলটি অনুমোদন প্রাপ্ত হয় এবং বর্তমানে সরকারি সহায়তায় স্কুলটির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে এ স্কুলের পাঠদান। এখন এ স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০জন।  নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন এবং সেইসাথে সমাজের প্রতি অবদান রাখায় ২০০৯ সালে উপজেলা, ২০১০ সালে জেলা পর্যায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কারে ভূষিত হন শাহনাজ পারভীন। ২০১৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (নারী) হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছেন তিনি । এছাড়াও  ২০১৬ সালে তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কাব (স্কাউট) লিডার হন। ২০১৭ সালের একুশে পদকের জন্য রাজশাহী বিভাগ থেকে মনোনীত হয়েছিলেন এই গুণী শিক্ষক।

শাহনাজের সর্বশেষ কীর্তি বিশ্বের সেরা ৫০ শিক্ষকের তালিকায় তার নাম লেখানো। বিশ্বের সেরা শিক্ষক নির্বাচনের জন্য ২০১৫ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভারকি ফাউন্ডেশন ‘গ্লোবাল টিচার পুরস্কার’ প্রবর্তন করে।  ২০১৭ সালে বিশ্বের ১৭৯টি দেশের ২০ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে গ্লোবাল টিচার পুরস্কার জিতেছিলেন মাত্র ৫০ জন। সে বছর বিশ্বসেরা শিক্ষক (বেস্ট গ্লোবাল টিচার) পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের ৫০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে আসা একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষক তিনি। ইউনেসকোর মনোনয়নে ভারকি ফাউন্ডেশনের গ্লোবাল টিচার পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম শিক্ষকও তিনি। শাহনাজ পারভীন পুরস্কার নেওয়ার জন্য সে বছরের ১৫ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত দুবাইতে অবস্থান করেন। আজো তার স্মৃতিতে সেই সাত দিনের অনুভূতি সদা উজ্জীবিত।  জীবনের সেরাপ্রাপ্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন ‘বেস্ট গ্লোবাল টিচার’ অ্যাওয়ার্ডকে।

লেখক: শাহীনা নদী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads