• শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

ফিচার

আঁচল ফাউন্ডেশন

মনের সুরক্ষায় তারুণ্যের উদ্যোগ

  • প্রকাশিত ১৮ এপ্রিল ২০২২

জিনাতুল জাহরা ঐশী

 

সদ্য কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা ত্রয়ী কয়েকদিন ধরেই মনমরা। বন্ধুদের আড্ডায় হোক বা পারিবারিক বৈঠকে, সকলের মাঝে থেকেও কেমন যেন খাপছাড়া ভাব, যেন সে থেকেও সবার মাঝে নেই। তার কাছের এক বন্ধু ত্রয়ীর মতন হাসিখুশি মেয়ের হঠাৎ এমন পরিবর্তনে বেশ অবাক হলো। কথাচ্ছলে জানতে পারলো বেশ কিছু বিষয় পীড়া দিচ্ছে ত্রয়ীকে। তার মধ্যে অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশের সঙ্গে ঠিক খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না সে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে কিছুটা হীনমন্ন্যতায় ভুগতে শুরু করলো সে। দিন দিন বাড়তে থাকলো পরিসর। একটা সময় পর গিয়ে প্রায় সবসময়ই মনমরা হয়ে বসে থাকতো।

ত্রয়ীর মতন আমাদের চারপাশে অনেকেরই দেখা যায় নানা চাপে একটু কথা বলার মানুষের অভাবে বা একটা ভরসার জায়গার অভাবে আস্তে আস্তে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। নিজেকে অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে। আপাত দৃষ্টিতে এ বিষয়টি কোনো গুরুত্ব বহন না করলেও মানসিক দিক দিয়ে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই ব্যাপারগুলো নিয়ে চিন্তা করতে গিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী তানসেন ভাবতে থাকেন এমন এক সংগঠনের কথা যারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবে। সেই সঙ্গে তরুণদেরকে গড়ে তুলবে কর্মক্ষেত্রের জন্য দক্ষ জনশক্তি হিসেবে। তার ভাবনাগুলো ভাগ করে নেন আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। সকলের ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’। এটি একটি তারুণ্য নির্ভর সামাজিক সংগঠন, যার মূল লক্ষ্য তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে তাদেরকে পারদর্শী করে গড়ে তোলা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে আত্মহত্যা সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, শামসুন্নাহার হলে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক সেমিনারের আয়োজন করে। ফাউন্ডেশনটি তাদের সেবা ছড়িয়ে দিতে বিওয়াইএলসি ইয়ুথ কার্নিভাল-এ বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে।

করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করে ফাউন্ডেশটি। হাতে নেন টেল ইওর আনটোল্ড স্টোরিজ, স্পীকিং উইথ আ টিচার, আঁচল আড্ডা লাইভ টক শো—এর মতো কিছু অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতো অন্যদের সঙ্গে। তারপর ফাউন্ডেশনটি সকলের গল্প জানার বাইরে বেরিয়ে গল্প থেকে বের হয়ে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে এগিয়ে আসল। শুরু করল অনলাইনভিত্তিক ফার্স্ট এইড মেন্টাল কাউন্সেলিং। পাশাপাশি চালাতে থাকল লাইটেনিং আপ দ্যা মুড নামক ওয়ার্কশপ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা সমাধানে ওয়ার্কশপে যুক্ত হন মনোবিদরা।

ঢাকা কেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশভিত্তিক সচেতনতা তৈরিতেও আয়োজন করেন দেশের প্রথম ভার্চুয়াল জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার। যার প্রতিপাদ্য ছিল ‘আত্মহত্যা, আর নয়’। পুরো দেশ থেকে অংশ নেয় প্রায় ৩২টি দল।

আঁচলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ জানান, আত্মহত্যাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ও আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত বিষয়কে স্বাভাবিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সেই সঙ্গে যে তরুণদের নিয়ে তিনি সমাজ পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়েছেন, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেই তরুণদের গড়ে তুলতে চান দক্ষ জনশক্তি হিসেবে।

প্রজেক্ট লিঞ্চপিন শীর্ষক একটি প্রজেক্ট নিয়ে তারা কাজ করছে যা মূলত স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য ব্যক্তি ও কর্মজীবনে প্রয়োজন এমন কিছু দক্ষতার উন্মেষ ঘটানো। এই প্রজেক্টের আওতায় প্রতি মাসে আয়োজিত ওয়ার্কশপগুলোতে বিভিন্ন সেক্টরের দক্ষ প্রশিক্ষক এনে অনুশীলন করিয়ে থাকেন।

এছাড়া প্রজেক্ট সার্ফেইড, যেখানে মানসিক দৃঢ়তার ব্যাপারগুলো প্রাধান্য দিয়ে কিছু কর্মশালার আয়োজন করা হয়। আঁচলের সদস্যদের পাশাপাশি সকলে যেন নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দ্যে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে শুরু করেন প্রজেক্ট আওয়াজ। সাইবার সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় একজন শিক্ষার্থী কিভাবে মোকাবিলা করবেন সে বিষয়েই সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করা হয় এই প্রজেক্টের মাধ্যমে।

সংগঠনটি এখন পর্যন্ত পাঁচটি গবেষণা প্রকাশ করে। সারা বাংলাদেশে করোনার এক বছরে কত মানুষ আত্মহত্যা করেছে সেই তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা কিরূপ বা তরুণরা কেনো আত্মহত্যামুখী হচ্ছে সেটাও খুঁজে বের করেছে সংগঠনটি। সম্প্রতি নারী দিবসকে সামনে রেখে ‘তরুণীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালনা করে। এর আগে আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিট ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েছে আত্মহত্যা : হতাশায় নিমজ্জিত শিক্ষার্থীরা’ শীর্ষক আরেকটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেন।

আঁচল পরিবার শুধুমাত্র নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান নয়। বরং সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য এখানে গুরুত্ববহ। সেই লক্ষ্যেই ফাউন্ডেশনটি পরিচালনা করছে একটি স্পেশাল কেয়ার ইউনিট, যেখানে আছে একদল তরুণ সাইকোলজিস্ট। যারা প্রতিনিয়ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে সাহায্য প্রত্যাশী ব্যক্তিদের।

ফাউন্ডেশন হাতে নেয় প্রজেক্ট হ্যাপিনেস নামক এক ভিন্নধর্মী প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য হচ্ছে তরুণদের মাঝে সুখের সঠিক ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। তাদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসহ সঠিক ধারণা প্রদান করা।

ভিন্নধর্মী এই প্রজেক্টের পাশাপাশি আঁচল ফাউন্ডেশন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু করে চলেছে আঁচলের ইনস্টিটিউশনাল উইং। যেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ ছড়িয়ে যায় দেশব্যাপী এবং আঁচল যে লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল তা পূর্ণতা পেতে আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, হোম ইকোনমিক্স কলেজে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যাপ্টার খোলা হয়েছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সামিরা আক্তার সিয়াম বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য-এই শব্দটা আসলে আমাদের দেশে খুব একটা সমাদৃত নয়। শারীরিক স্বাস্থ্যের কোনো ব্যাঘাত ঘটলে আমরা যেমন অনায়াসে সবার সঙ্গে শেয়ার করি, ডাক্তারের কাছে যাই, এমনকি সবার সহমর্মিতাও থাকে, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে খুব একটা দেখা যায় না। সমাজের এই ট্যাবুর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমাদের এ উদ্যোগ।

মানসিক স্বাস্থ্যকে সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে গুটিকয়েক সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠা আঁঁচল ফাউন্ডেশন এখন প্রায় তিনশত সদস্যের পরিবার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads