• মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
খাদ্যপণ্যের প্রচারে হচ্ছে নতুন বিধান

প্রতীকী ছবি

সরকার

# থাকছে জেল ও জরিমানা

খাদ্যপণ্যের প্রচারে হচ্ছে নতুন বিধান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল ২০২১

খাদ্যপণ্যের প্রচারে নতুন বিধান হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের অংশ না নেওয়াসহ একগুচ্ছ বিধিনিষেধ থাকছে এতে। ভাষাসহ সাধারণ কিছু বিষয় ছাড়াও শিশুখাদ্য, পানীয় এবং শিশুদের নিয়ে ও তাদের লক্ষ্য করে প্রচারিত খাদ্যদ্রব্যের বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচারের ক্ষেত্রে খসড়া প্রবিধানমালায় আরো কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকছে।

‘নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন) প্রবিধানমালা ২০২১’-এর এসব শর্ত অমান্য করলে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’-এর ৪১ ও ৪২ ধারা লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে এবং সে অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে।

৪১ ও ৪২ ধারা লঙ্ঘনে ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ড বা চার লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য আইনের আলোকে ইতোমধ্যে এ প্রবিধানমালার খসড়া মতামতের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের পর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রবিধানমালা প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় বিজ্ঞাপনের সাধারণ শর্তের মধ্যে রয়েছে, এর ভাষা, দৃশ্য, চিত্র, কিংবা নির্দেশনা ধর্মীয় অনুভূতি, সামপ্রদায়িক চেতনা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অনুভূতির প্রতি পীড়াদায়ক হতে পারবে না। একই সঙ্গে প্রতিযোগী পণ্যের তুলনা বা নিন্দা করে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা যাবে না। এমন কোনো বর্ণনা বা দাবি প্রচার করা যাবে না যাতে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারে।

শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা বা দৈহিক আকার ও বর্ণকে কেন্দ্র করে কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না। একই সঙ্গে আমদানিপণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে উন্নতমানের, এমন কিছু বিজ্ঞাপনে থাকতে পারবে না। শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞাপনের বিষয়ে বলা হয়েছে, শিশুর স্বাভাবিক বিশ্বাস ও সরলতাকে প্রতারণাপূর্ণ ও চাতুর্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রচার করা যাবে না।

শিশুদের পরনিন্দা, ঝগড়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অংশ নেওয়া বাদ দিতে হবে। এমন কিছু দেখানো যাবে না যেখানে শিশুদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের নৈতিক, মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হতে পারে এমন বিষয় বিজ্ঞাপনে থাকবে না এবং স্বাভাবিক বিশ্বাস ও সরলতাকে কাজে লাগানোর মতো কিছু প্রচার করা যাবে না বলে খসড়া প্রবিধানমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। যে কোনো খাদ্য বা পানীয়পণ্যের বিজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যগত বিরূপ প্রভাব সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। দেশে প্রস্তুত মোড়কজাত খাদ্যের সংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে বাংলার পাশাপাশি এক বা একাধিক বিদেশি ভাষাও ব্যবহার করা যাবে। আমদানি করা মোড়কজাত খাদ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বিদেশি ভাষায় হলে সেখানে বাংলাও সংযুক্ত করতে খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে।

মিষ্টি জাতীয়, চকলেট, বিস্কুট বা কৃত্রিম পানীয় ও ফলমূলভিত্তিক পানীয়ের মিশ্রণ এবং এসব পানীয় প্রস্তুতের ক্ষেত্রে একই রকম পণ্য না থাকলে, সেগুলোর বিজ্ঞাপনে কোনো ফলের নাম বা ফলের ছবি ব্যবহারের সুযোগ অবশ্য প্রবিধানমালায় রাখা হয়েছে।

যেসব খাদ্যের মান নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনে বা ঘোষণার সঙ্গে বা এর বাইরে অন্য যে কোনো উপাদান সংযোজন বা সংমিশ্রণ নিষিদ্ধ থাকবে। ‘চিকিৎসা বা পুষ্টি বা স্বাস্থ্য পেশাদারদের দ্বারা প্রস্তাবিত’ বা এ জাতীয় কোনো শব্দ, যা খাবারকে সুপারিশ করে, নির্ধারিত করে বা চিকিৎসক অনুমোদিত বলে প্রস্তাবিত বা এমন কোনো শব্দ বিজ্ঞাপনে থাকতে পারবে না বলে শর্তে বলা হয়।

একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ বা সমতুল্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ করা বা এ জাতীয় ঘোষণা দেওয়া যাবেনা, যেটির মাধ্যমে ক্রেতা বিভ্রান্ত হতে পারেন। কোনো খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনে ‘প্রাকৃতিক’ শব্দটি রাখা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই জাতীয় খাদ্য বা খাদ্যপণ্যটি কোনো মিশ্রণবিহীন, অপ্রক্রিয়াজাত বা অন্যকোনো খাদ্যের সঙ্গে মিশ্রিত না হয়।

আমদানি করা খাদ্য বা খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নাম ও পূর্ণ ঠিকানা ছাড়াও আমদানিকারকসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুনঃমোড়কজাতকারকসহ সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী এবং এজেন্টের নাম ও পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে।

মাতৃদুগ্ধ বিকল্প ও শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধি-নিষেধের বিষয়ে প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মাতৃদুগ্ধ, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করা শিশুর বাড়তি খাদ্য বা এর ব্যবহারের সরঞ্জামাদির আমদানি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, বিপণন, বিক্রি বা বিতরণের উদ্দেশ্যে কোনো বিজ্ঞাপন মুদ্রণ, প্রদর্শন, প্রচার বা প্রকাশ করতে পারবেন না।

কোনো খাদ্যপণ্য শিশুখাদ্য বা শিশুখাদ্যের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহারের যোগ্য বলে ঘোষিত হলে বিজ্ঞাপনে উত্তম ভোগের সর্বোচ্চ তারিখ উল্লেখসহ ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’-এর বিধান বাধ্যতামূলকভাবে মানতে হবে।

এছাড়া প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধের ক্ষেত্রে ‘ননীমুক্ত দুগ্ধ’ বা ‘পাস্তুরিত দুগ্ধ’ বা অন্যকোনো প্রক্রিয়াজাত দুধের ক্ষেত্রে পাত্রের গায়ে ‘ননীমুক্ত দুগ্ধ’ বা ‘পাস্তুরিতদুগ্ধ’ কথাটি স্পষ্ট করে উল্লেখের পাশাপাশি ননীর পরিমাণ, নেট দুগ্ধের পরিমাণ ও ব্যবহূত উপকরণের তালিকা বিজ্ঞাপনে স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করতে হবে।

এ প্রবিধানমালার কোনো বিধান অমান্য করে বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্তিকর, অসত্য বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া যাবেনা। এমনকি ওই তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি, মুদ্রণ বা প্রচার করা যাবে না।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য রেজাউল করিম বলেন, অংশীজনদের মতামত পাওয়ার পর প্রবিধানমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ভেটিং শেষে গেজেটের মাধ্যমে তা কার্যকরের দিকে যাবে। করোনার কারণে হয়তো একটু দেরি হয়ে যাবে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে তা নিয়ে ফের কাজ শুরু হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইউম সরকার বলেন, ‘২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইনে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ব্যবসায়ীরা কী করবেন তা বলা ছিল। তবে সেটা ছিল সংক্ষিপ্ত আকারে। এখন আমরা বিস্তারিত প্রক্রিয়া বলে দিয়েছি প্রবিধানমালায়। এগুলো মানতে তারা বাধ্য থাকবেন। না মানলে আমরা আমাদের ফোর্স অ্যাপ্লাই করব। মূল আইনে শাস্তির বিষয়টি রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রবিধানমালার কারণে আমাদের তদারকি কিংবা এনফোর্সমেন্টের কাজ আরো সহজ হবে। কারণ আগে ব্যবসায়ীরা বলতেন প্রসেস জানি না, কীভাবে করব। এখন আর তারা সেটা বলতে পারবেন না।’

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২১’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতকরণে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯ রহিত করে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছি।’ তিনি আরো বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে এরই মধ্যে তিনটি বিধিমালা, সাতটি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads