• রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯

সরকার

ঋণ পরিশোধে বেড়েছে সক্ষমতা

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১০ এপ্রিল ২০২২

স্বাধীনতার পর থেকেই বৈদেশিক ঋণ সুদ-আসল পরিশোধে পারদর্শিতা দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। সেই ধারা অব্যাহত আছে এখনো। যে কারণে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের প্রতি সব সময় ইতিবাচক। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছর  বৈদেশিক ঋনের সুদ-আসলসহ পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীরা প্রকল্পসহ উন্নয়নকাজ বাবদ ৭২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার ঋণছাড় করেছে। এসব ঋণের বিপরীতে স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ২০ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার আসল পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি পরিশোধ করেছে ৭ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার সুদও। সময়োপযোগী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ছাড়াও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ার ফলে বৈদেশিক সুদ ও আসল পরিশোধে বাংলাদেশ সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দাবি অর্থনীতিবিদদের।

 বৈদেশিক সুদ ও আসল পরিশোধ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা ও আয় বাড়ছে। এসব কারণে বাড়ছে ঋণ ও সুদ পরিশোধ। আমাদের এক্সপোর্ট ও রেমিট্যান্স ভালো। স্বাধীনতার পর থেকে এগুলো কয়েকগুণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে আউটপুট ভালো। আমাদের ঋণ পরিশোধের অন্যতম অস্ত্র এক্সপোর্ট ও রেমিট্যান্স। এটা যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় যথেষ্ট বেশি। এসব কারণেই ঋণ পরিশোধের পারফরম্যান্স ভালো। আমরা প্রকল্প নিয়েছি একেক খাতে একেক রকম। টাকা অপচয় হয়নি, যদি অপচয় হতো তাহলে অর্থনীতি দুর্বল থাকতো। আমাদের অর্থনীতি এখন যথেষ্ট ভালো, দুর্বল নয়।

কঠিন শর্তে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া ও প্রকল্পে দুর্নীতিসহ নানা কারণে সমপ্রতি ভেঙে পড়েছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে জনরোষ। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের আশঙ্কা, বাংলাদেশের অবস্থাও শ্রীলঙ্কার মতো হতে পারে। তবে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ (ইআরডি) সংশ্লিষ্টরা এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, যেকোনো প্রকল্পের আউটকাম তথা রিটার্নের বিষয়টি মাথায় রেখেই সহজশর্তে ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৬১ শতাংশেরও বেশি, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, কোনো একটি দেশের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাতের ২০ শতাংশকে আদর্শ ধরা হয়। সেদিক থেকে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ ১৬ শতাংশ। ঋণের এ অনুপাতই বলছে, শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক বেশি দৃঢ় ও স্থিতিশীল।

ইআরডি সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি আসে ১২৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ছাড় হয়েছে ৭২ বিলিয়ন, পাইপলাইনে রয়েছে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (স্বায়ত্তশাসিত ছাড়া)।

নানা উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ ও অনুদান দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। মোটা দাগে স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে মোট সাড়ে ২৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এর মধ্যে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঋণছাড় করেছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। বাকি ঋণ এসেছে কমোডিটি এইড বাবদ। এরপর ১৮ বিলিয়ন ছাড় করেছে এডিবি। জাপানের ছাড় ১৬ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় ঋণছাড়ের ধারেকাছে নেই চীন। এই সময়ে চীন ছাড় করেছে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪ বিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র সাড়ে ৩ বিলিয়ন, রাশিয়া ৩ বিলিয়ন ডলার, কানাডা ও জার্মানি সমান ২ বিলিয়ন ডলার করে, ইউনিসেফ দেড় বিলিয়ন, ভারত ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন, নেদারল্যান্ডস ১ বিলিয়ন, ডেনমার্ক ১ বিলিয়ন, সৌদি ১ ও সুইডেন ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণছাড় করেছে। এসব ঋণে উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়মিতভাবে সুদ ও আসল পরিশোধে সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ফলে উন্নয়ন সহযোগীরা সব সময় ঋণ নিয়ে ঘুরছে বাংলাদেশের পেছনে।

জানা যায়, মেগা প্রকল্পের ব্যয় দুই ভাবে মেটানো হয়-সরকারি অর্থায়ন ও ঋণসহায়তা। সরকার বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে অন্যতম পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ব্যয়ভার মেটানোর জন্যই মূলত ঋণছাড়ও বেড়েছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বৈদেশিক ঋণছাড় হয়েছিল ২৪ দশমিক ২৬ কোটি ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মেগা প্রকল্পগুলো যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে তত দ্রুত বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ বাড়বে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ও আসল পরিশোধ করেনি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরের পর থেকে নিয়মিতভাবে বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করছে বাংলাদেশ। প্রথম ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছর বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সুদ পরিশোধ করেছিল। বর্তমানে বৈদেশিক সুদ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়ে ৪৯৬ দশমিক ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে সুদ পরিশোধের সক্ষমতাও। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী একটি অবস্থানে। ফলে বৈদেশিক সুদ পরিশোধও বেড়েছে কয়েকগুণ।

এছাড়া ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে ১ দশমিক ৩, ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ৯৯, ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে ২ দশমিক ৭৭, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে ৩, ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে ৪ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করে বাংলাদেশ।

১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২১, ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১, ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৫, ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে ৫, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭৭, ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪, ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২, ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করে বাংলাদেশ। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালে এক ধাপে ১২ দশমিক ৩ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সুদ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়তে বাড়তে প্রায় ৫০ কোটি ডলার হয়েছে।

বাংলাদেশ ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ও আসল পরিশোধ করেনি। ১৯৭৩-৭৪ সালের পর থেকে নিয়মিতভাবে বৈদেশিক ঋণ ও আসল পরিশোধ করছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আসল পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। এই সময় সুদ ও আসল পরিশোধের পরিমাণ একই ছিল। এরপর ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭৮ কোটি ডলার আসল পরিশোধ করে বাংলাদেশ। ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে আসল পরিশোধের সক্ষমতা বাড়তে থাকে, এই সময় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ১০ দশমিক ৬০ কোটি ডলার আসল পরিশোধ করা হয়। এরপর এক ধাপে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০৮ দশমিক ৮৪ কোটি ডলার আসল পরিশোধ করা হয়, একই সময়ে সুদ পরিশোধ করা হয় ২০ দশমিক ৫৯ কোটি ডলার।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে গ্রহণের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২৫ দশমিক ৬৫ কোটি ডলার আসল পরিশোধ করে বাংলাদেশ, একই সময়ে ৪৭ দশমিক ৭৪ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। এরপরই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অবদান ২৩ শতাংশ। এছাড়া মোট ঋণের ১৮ শতাংশ জাপানের, ১ শতাংশ দক্ষিণ কোরিয়ার, আইডিবির ১ শতাংশ, আইএফএডির ১ শতাংশ এবং ঋণের ১২ শতাংশ অবদান অন্যান্য দেশের।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমরা সব সময় বাস্তবতার নিরিখে প্রকল্প গ্রহণ করি। আবেগ দিয়ে কিছুই গ্রহণ করি না। আমাদের রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ ভালো। এসব কারণে বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধ করে যাচ্ছি নিয়মিত। কখনো ফেল করিনি, এসব ক্ষেত্রে ফেল করবোও না। আমরা বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সব সময় সঠিক কাজে ব্যবহার করছি। ঋণ নিয়ে খেয়ে ফেলছি না, যার বড় কারণ নিয়মিত সুদ ও আসল পরিশোধ করে যাচ্ছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads