৪০০ বছর পর খোঁজ মিলল শেক্সপিয়ারের হারিয়ে যাওয়া বাড়ির
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:০৩
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের সেন্ট্রাল এলাকার ব্যস্ত এক মোড়। উল্টোদিকেই একটা সরাইখানা। পথচলতি মানুষের নজর কাড়ে সাধারণ অফিস বিল্ডিংয়ের দেয়ালে লাগানো ছোট্ট একটা নীল ফলক। সেখানে খোদাই করা আছে: ‘১৬১৩ সালের ১০ মার্চ, উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের এই ব্ল্যাকফায়ার্স গেটহাউস এলাকায় থাকার জন্য জায়গা কিনেছিলেন।’
শতাব্দীপ্রাচীন সেই বাড়িটি কবেই ধুলোয় মিশে গেছে। আধুনিক এই দালানটি তার অনেক পরে গড়া। দীর্ঘকাল ধরে গবেষকরা জানতেন যে মৃত্যুর মাত্র তিন বছর আগে লন্ডনের ব্ল্যাকফায়ার্স এলাকায় শেক্সপিয়ার একটা বাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সেই বাড়ির সঠিক অবস্থানটি ছিল এক দুর্ভেদ্য রহস্য।
অবশেষে সেই রহস্যের জট খুলল। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক লুসি মুনরো লন্ডনের মহাফেজখানায় (দ্য লন্ডন আর্কাইভস) ধুলোমাখা নথির স্তূপ থেকে এমন এক মানচিত্র খুঁজে বের করেছেন, যা বলে দিচ্ছে ঠিক কোথায় ছিল বিশ্ববিখ্যাত এই নাট্যকারের সেই হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা।
লুসি মুনরো মূলত ব্ল্যাকফায়ার্স থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করছিলেন, যেখানে একসময় শেক্সপিয়ারের নাট্যদল ‘কিংস মেন’ নিয়মিত অভিনয় করত। পুরনো আমলের সব দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা বাক্সের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকশ বছরের পুরনো স্থাবর সম্পত্তির এক নকশা।
মুনরো শিহরিত হয়ে বলেন, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! আমি যা খুঁজছিলাম তা নয়, বরং আমার সামনে পড়ে ছিল স্বয়ং শেক্সপিয়ারের ব্ল্যাকফায়ার্স বাড়ির ফ্লোরপ্ল্যান বা নকশা। এতদিন ধরে মনে করা হয়েছিল এই বাড়ি নিয়ে আর নতুন কোনো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই এ নিয়ে গবেষণাও একপ্রকার থেমে গিয়েছিল।
শেক্সপিয়ারের জীবন মানেই যেন একরাশ অমীমাংসিত প্রশ্ন। তার জন্ম এবং মৃত্যু দুটোই হয়েছিল লন্ডন থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরের ছোট্ট শহর স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনে। সেখানে তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। কিন্তু তার পেশাদার জীবন, খ্যাতি আর থিয়েটারের নেশা- সবই ছিল লন্ডনকে ঘিরে। তিনি ছিলেন অনেকটা আধুনিক যুগের ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জার’-এর মতো, যিনি নিয়মিত স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে লন্ডনে যাতায়াত করতেন।
১৬১৩ সালে যখন লন্ডনের বিখ্যাত ‘গ্লোব থিয়েটার’ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যায়, তখন মনে করা হয়েছিল শেক্সপিয়ার হয়তো নাটক থেকে বিদায় নিয়ে পাকাপাকিভাবে স্ট্র্যাটফোর্ড ফিরে গেছেন। কিন্তু এই নতুন মানচিত্র সেই প্রচলিত ধারণাকে বড়সড় এক ধাক্কা দিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে মুনরো বলেন, এই আবিষ্কারটি সেই পুরনো তত্ত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় যে শেক্সপিয়ার স্রেফ অবসরের জন্য গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। বরং এটি লন্ডনের প্রতি তার গভীর টানের নতুন প্রমাণ।
সপ্তদশ শতাব্দীর সেই মানচিত্র অনুযায়ী, শেক্সপিয়ারের এই সম্পত্তিটি ছিল বেশ বড়সড় এবং ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো দেখতে। নিচতলাটি ছিল প্রায় ৪৫ ফুট লম্বা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাড়ি কেনার সময় তিনি তার শেষ জীবনের বিখ্যাত নাটক ‘হেনরি দ্য এইটথ’ এবং ‘দ্য টু নোবল কিন্সমেন’ লিখছিলেন। গবেষকদের ধারণা, এই বাড়ির নিভৃতেই হয়তো রচিত হয়েছিল বিশ্বসাহিত্যের সেই অমূল্য পঙক্তিগুলো।
শেক্সপিয়ার যেখানে বাড়িটি কিনেছিলেন, সেই ব্ল্যাকফায়ার্স এলাকাটি ছিল বেশ অভিজাত। একসময় এটি ছিল ডমিনিকান সন্ন্যাসীদের মঠ। কিন্তু হেনরি দ্য এইটথ-এর আমলে মঠগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পর সেখানে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ বসবাস শুরু করে। মজার ব্যাপার হলো, সেই অভিজাত প্রতিবেশীরা থিয়েটার বা নাটককে মোটেও ভালো চোখে দেখতেন না। তারা প্রায়ই থিয়েটারের আওয়াজকে ‘পাবলিক নুইসেন্স’ বা উপদ্রব বলে অভিযোগ করতেন। সেই বৈরী পরিবেশেই নিজের পেশার টানে ঘর বেঁধেছিলেন সাহিত্যের এই জাদুকর।
ট্র্যাজেডি শেক্সপিয়ারের নাটকে যেমন ছিল, তার এই বাড়ির ভাগ্যেও তাই ঘটেছিল। শেক্সপিয়ারের নাতনি যখন ১৬৬৫ সালে বাড়িটি বিক্রি করে দেন, তার ঠিক পরের বছরই অর্থাৎ ১৬৬৬ সালে লন্ডনের অগ্নিকাণ্ডে (গ্রেট ফায়ার অফ লন্ডন) পুড়ে ছাই হয়ে যায় এই ঐতিহাসিক ইমারত।
এতদিন গবেষকরা ভাবতেন অফিস বিল্ডিংয়ের সেই ফলকটি হয়তো ‘আশপাশে’ কোথাও ছিল। কিন্তু লুসি মুনরোর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর এখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে নীল ফলকটির সামনে প্রতিদিন হাজারো মানুষ হেঁটে যায়, ঠিক সেই মাটির নিচেই মিশে আছে শেক্সপিয়ারের পদচিহ্ন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

