Logo

শিল্প-সংস্কৃতি

একুশ ম্রিয়মাণ: বাঙালি ঐতিহ্যের অবক্ষয়

Icon

নাহিদ হাসান রবিন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৫

একুশ ম্রিয়মাণ: বাঙালি ঐতিহ্যের অবক্ষয়

ছবি: সংগৃহীত

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের এক রক্তিম অঙ্কুরোদগম। আজ সাত দশকেরও বেশি সময় পার করে আমরা যখন মহান ভাষা আন্দোলনের ৭৩তম বছরে দাঁড়িয়ে, তখন মহাকালের গর্ভে সেই রক্তস্নাত রাজপথের স্মৃতি কতটা অমলিন আর কতটা ধূসর, সেই আত্মজিজ্ঞাসা আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। একুশ আমাদের শিখিয়েছিল মাথা নত না করার দম্ভ, শিখিয়েছিল শৃঙ্খল ভাঙার আদি মন্ত্র। বায়ান্নর সেই চেতনার ভেতরেই নিহিত ছিল একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের নীলনকশা। কিন্তু বর্তমানের দর্পণে তাকালে দেখা যায়, আমাদের যাপিত জীবন ও সংস্কৃতির মাঝে একুশের সেই আদর্শিক লড়াইয়ের জায়গাটি ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে। ঐতিহ্যের এই বিচ্যুতি কেবল আমাদের ভাষা নয়, আমাদের জাতীয় সত্তাকেই এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাঙালির ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি এক আগ্নেয়গিরির অগ্নিগর্ভ বিস্ফোরণ। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা যখন আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিয়ে একটি অবাস্তব ‘উর্দু’ সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তখন সারা বাংলা এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো জেগে উঠেছিল। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সেই অকুতোভয় সাহসিকতা কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্বের এক অবিনাশী অংশ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের সেই আত্মদান পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক বিরলতা। কারণ ভাষার জন্য জীবনের অর্ঘ দেওয়ার নজির বিশ্ব সভ্যতায় আর কোথাও নেই। এই আন্দোলনই ছিল আমাদের পরবর্তী সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্জনের আদি বীজতলা। ভাষা আন্দোলনের ক্যানভাসটি ছিল দিগন্ত বিস্তৃত এবং এর কারিগর ছিল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কেবল ছাত্রসমাজের একক বিচরণ ক্ষেত্র ছিল না। বায়ান্নর সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে আমরা দেখেছি কিশোর-কিশোরীদের এক অভূতপূর্ব স্পর্ধা। ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের সেই কচি শিক্ষার্থীরা সেদিন প্রবীণদের হাত ধরে রাজপথে নেমেছিল, যেন আগামীর সূর্যকে তারাই ছিনিয়ে আনবে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জের মুখে সেই অবোধ কিশোরদের তেজস্বিতা প্রমাণ করেছিল যে, মাতৃভাষার টান ধমনীর রক্তপ্রবাহের চেয়েও শক্তিশালী। অন্যদিকে, প্রবীণ বা বয়স্ক প্রজন্মের ভূমিকা ছিল এই আন্দোলনের এক বিশাল ছায়াবৃক্ষের মতো। সে সময়ের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলনের যে বৌদ্ধিক ভিত তৈরি করেছিলেন, তা ছিল অজেয়। বয়স্কদের সেই হিমালয়সম প্রজ্ঞা আর তরুণদের অগ্নিসম সাহসের মেলবন্ধনেই বায়ান্নর সেই মহাবিপ্লব পূর্ণতা পেয়েছিল। নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনের এক নতুন ও মানবিক মাত্রা। তাঁরা কেবল মিছিল করেননি, বরং অন্দরমহল থেকে রণাঙ্গনের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু আজ ৭৩ বছর পর সেই অকুতোভয় প্রজন্মের উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের অর্জন ও বিচ্যুতি যখন তুলাদণ্ডে মাপি, তখন লজ্জা ও হাহাকারে মন ভরে ওঠে।

সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হলো, আমরা আজ এক আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত হচ্ছি। আমাদের হাজার বছরের যে ঐতিহ্য, যা আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিল, তাকে আমরা নিজ হাতে নির্বাসনে দিচ্ছি। আমরা আধুনিক হওয়ার মোহে নিজেদের সংস্কৃতিকে ‘সেকেলে’ বলে তুচ্ছজ্ঞান করছি। এটি কেবল দুঃখজনক নয়, বরং একটি জাতির জন্য চরম অপমানের। আজ আমাদের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, আচার-অনুষ্ঠান এমনকি কথা বলার ভঙ্গিতেও এক ধরনের কৃত্রিম ও ধার করা বিজাতীয় সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের মাটির গান, আমাদের লোকজ উৎসব আর আমাদের সাহিত্যের ধ্রুপদী আভিজাত্য। এই যে নিজের সম্পদকে তুচ্ছ ভেবে অন্যের উচ্ছিষ্টকে আঁকড়ে ধরার হীনমন্যতা, এটিই প্রমাণ করে আমরা মানসিকভাবে কতটা দেউলিয়া হয়ে পড়েছি। ঐতিহ্যের এই বিচ্যুতি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশ আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। ১৯৩টি দেশে আমাদের শহীদ দিবসের মহিমা গীত হচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে খোদ বাঙালির নিজস্ব উঠোনে মাতৃভাষার প্রতি এক ধরনের অবহেলা ও ম্রিয়মাণ চর্চা আমাদের ব্যথিত করে। আমরা কি সত্যিই সেই ত্যাগের প্রতি যথেষ্ট যত্নবান? প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে আমাদের আবেগ উথলে ওঠে, বইমেলায় জনস্রোত নামে, এ যেন এক বার্ষিক ভাবাবেগের উৎসব। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলো আমরা আমাদের ভাষার শুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষায় কতটা সচেষ্ট থাকি? ভাষার প্রতি এই যে ঋতুভিত্তিক প্রেম, তা অনেকটা শরতের ক্ষণস্থায়ী মেঘের মতো। বাস্তব জীবনে, দাপ্তরিক কাজে এবং মনস্তাত্ত্বিক স্তরে বাংলার ব্যবহারিক প্রয়োগ আজ এক গভীর সংকটের আবর্তে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে।

বর্তমান বাস্তবতায় বাঙালির ভাষাপ্রেম যেন অনেকটা লৌকিক আচারে পরিণত হয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনে, বিশেষ করে উচ্চবিত্ত সমাজে বাংলাকে এক প্রকার ‘ব্রাত্য’ করে রাখার এক সূক্ষ্ম অথচ আত্মঘাতী প্রবণতা কাজ করছে। ইংরেজি মাধ্যমের দাপট আর আকাশ সংস্কৃতির অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবে আমাদের নতুন প্রজন্ম এক জগাখিচুড়ি বা ‘হাইব্রিড’ ভাষার আবর্তে নিমজ্জিত। তারা না পারছে শুদ্ধ বাংলায় মনের ভাব প্রকাশ করতে, না পারছে বিশ্বমানের ইংরেজি রপ্ত করতে। এই যে ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতির উত্থান, তা আমাদের জাতিসত্তার শিকড়কে আলগা করে দিচ্ছে। যখন একটি শিশু তার মায়ের ভাষাকে ‘স্মার্টনেস’-এর অন্তরায় মনে করতে শেখে, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দর্শনে পচন ধরেছে। একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। সেই মেরুদণ্ড যদি পরগাছা ঐতিহ্যের ভারে নুয়ে পড়ে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানশূন্যতা ও শেকড়হীনতা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আমাদের দায়বদ্ধতার চিত্রটি আজ বড় বেশি বিবর্ণ। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার ছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে বিজ্ঞানচর্চা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির গবেষণায় বাংলার অনুপস্থিতি আমাদের মানসিক দাসত্বকেই ফুটিয়ে তোলে। আমরা কেন আজও একটি উন্নত পরিভাষাকোষ তৈরি করতে পারলাম না? এই ব্যর্থতা আমাদের মেধাকে চিরকাল পরমুখাপেক্ষী করে রাখছে। আমরা কি আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য এমন এক পঙ্গু সমাজ রেখে যাচ্ছি, যেখানে তারা নিজের ভাষায় স্বপ্ন দেখতে কুণ্ঠাবোধ করবে? একটি শিশু যখন তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হয়, তখন সে কেবল একটি যান্ত্রিক মানব বা ‘রোবটে’ পরিণত হয়, যার ভেতর কোনো স্বদেশপ্রেম থাকে না। যারা নিজের ভাষার ইতিহাস ও লালিত্য জানে না, তারা কখনো প্রকৃত বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠতে পারে না।

একুশ আমাদের কেবল শোকের সাগরে ভাসতে শেখায়নি, শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়ে অধিকার ছিনিয়ে নিতে। আজ সেই প্রতিরোধের সময় এসেছে নিজেদের ভেতরের ভাষাগত হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারি কোনো রুটিনমাফিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। যদি আমরা এই আলোর মশাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে যথাযথভাবে তুলে দিতে না পারি, তবে ইতিহাসের ক্রুর কাঠগড়ায় আমাদের অপরাধী হিসেবে দাঁড়াতে হবে। আমরা কি চাইব আমাদের সন্তানেরা নিজের শেকড়হীনতার জন্য বিশ্ব দরবারে লজ্জিত হোক? এই ঘাটতি পূরণে আমাদের এখনই কালান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দায়বদ্ধতা কেবল সরকারের নয়, প্রতিটি সচেতন বাঙালির। পরিবার থেকেই শুরু হতে হবে মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা। সন্তানদের শেখাতে হবে যে, অন্য ভাষা শেখা প্রয়োজনের, কিন্তু নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা করা চরম আত্মমর্যাদাহীনতা। প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাকে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হলে ইন্টারনেটে বাংলার আধিপত্য বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষায় বাংলাকে জ্ঞানার্জনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাপানি বা জার্মানরা যদি নিজস্ব ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে, তবে বাঙালি কেন পিছিয়ে থাকবে? প্রযুক্তির দাপটে আজ পৃথিবী যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাকে গতিশীল না করতে পারলে আগামী প্রজন্ম একে ব্রাত্য করে রাখবে।

৭৩ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় আমাদের অর্জনের পাল্লা ভারী হলেও আত্মতৃপ্তির কোনো অবকাশ নেই। যখন দেখি গণমাধ্যমে ভাষার বীভৎস বিকৃতি ঘটে, যখন দেখি রাজপথের সাইনবোর্ডে ভুলের ছড়াছড়ি, তখন শহীদ মিনারের সেই শুভ্রতা যেন অপমানে মলিন হয়ে আসে। ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা অসম্ভব, কিন্তু তাঁদের সেই ত্যাগের মহিমা লালন করা আমাদের পবিত্র জাতীয় দায়িত্ব। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের শৈশবেই বাংলার রস আস্বাদন করাতে ব্যর্থ হই, তবে তারা বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রলয়ঙ্করী প্লাবনে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। ঐতিহ্যের এই সংকট কেবল সাহিত্যের সংকট নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার সংকট।

একুশ আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনার সেই ধ্রুবতারা। এই ধ্রুবতারাকে কেবল পঞ্জিকার পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের মনন ও কর্মের প্রতিটি স্তরে প্রোথিত করতে হবে। শুদ্ধ বাংলার চর্চা আর ঐতিহ্যের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধই পারে আমাদের জাতিগত চেতনাকে পুনরায় ইস্পাত কঠিন করতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখে যেন আমরা এমন এক অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে চিহ্নিত না হই, যারা হীরা ফেলে কাচ কুড়িয়েছিল। বাংলার আকাশ-বাতাস যেন চিরকাল সেই অবিনাশী সেøাগানে মুখরিত থাকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ এই ‘না ভুলতে পারার’ কঠিন শপথে বলীয়ান হওয়াই হোক আজকের অঙ্গীকার। একুশের চেতনা আমাদের হৃদয়ে জ্বলুক এক অনির্বাণ শিখার মতো, যা আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেবে, আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। যদি আমরা আজ সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম ইতিহাস নয়, কেবল কিছু স্মৃতির কঙ্কাল বইবে, যা কোনো জীবন্ত জাতি হিসেবে আমাদের কাম্য হতে পারে না। নিজেদের ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করার এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের পুনরায় শেকড়ে ফিরতে হবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন