Logo

শিল্প-সংস্কৃতি

ফরিদ মিয়ার ভালোবাসা

Icon

হানিফ ওয়াহিদ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৯

ফরিদ মিয়ার ভালোবাসা

ছবি: সংগৃহীত

পকেটে কম দামি মোবাইল থাকলে সুন্দরী মেয়ে দূরে থাক, ছিনতাইকারীও ঠিকমতো তাকায় না। ফরিদের দিকেও কেউ তাকাচ্ছে না।

ফরিদ যাচ্ছে রিয়াদের বাড়ি। রিয়া হচ্ছে ফরিদের একতরফা প্রেমিকা। রিয়া তাকে পাত্তা দেয় না তারপরও প্রতিদিন সে রিয়াদের এলাকায় গিয়ে একবার ঢুঁ মেরে আসে। রিয়াদের বাড়ির সামনের গেইট, রাস্তা সব কিছুই ভালো লাগে এমনকি ওদের বাড়ির কুত্তাটাও। প্রেমিকার বাড়ির কুকুর বিড়ালকেও নিজের পরম আত্মীয় মনে হয়। গেটম্যানকে মনে হয় জানের দোস্ত। 

যদিও রিয়াদের বাড়ির গেটম্যান ফরিদকে দেখলেই কঠিন চোখে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করে, বিষয় কী?

ফরিদ বিষয় বলতে পারে না, ভয় পেয়ে চলে আসে। 

সে মাথা নিচু করে হাঁটছে, এটা ওর ভদ্রতা নয়। মাথা নিচু করে হাঁটছে যদি রাস্তায় কিছু টাকা পয়সা কুড়িয়ে পাওয়া যায় তাহলে সে একদিন রিয়াকে ফুচকা খাওয়ার অফার দিবে।

রিয়াকে জিন্সের ছেঁড়া ফাটা প্যান্ট পরতে দেখে ভেবেছিল রিয়া বুঝি ওর মতোই গরিব, গরিবের প্রতি মায়া থেকে প্রেম। পরে ফরিদ আবিষ্কার করে ছেঁড়া প্যান্ট পরলে ধনী আর ছেঁড়া প্যান্ট জামা একসাথে পরলে ফকির! 

রিয়া পাত্তা না দিলেও রোদ বৃষ্টি তুফান কোনো কিছুই ফরিদকে থামাতে পারেনি, আজকে হঠাৎ থামতে হলো। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে তার একটা জুতা ছিঁড়ে গেল। ফরিদ হাঁটা থামিয়ে অবাক হয়ে জুতার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতে বসলো, কবি বলেছেন, জীবন চলার পথে কখনো থামতে নাই তবে জুতা ছিঁড়ে গেলে কথা নাই। 

ফরিদ বিরক্তি নিয়ে থু! করে একদলা থুতু ফেললো। 

এই ফরিদ, এই!

ফরিদ ডাকের উৎসের দিকে চাইলো, ডাক আসছে চায়ের দোকান থেকে। ছেলেবেলার বন্ধু আতিকের গলা। ফরিদ ছেঁড়া জুতা হাতে নিয়ে চায়ের দোকানে ঢুকতেই আতিক বললো, যাচ্ছিস কই? রিয়াদের বাসায়? হাতে কি ছেঁড়া জুতা? এগুলো রিয়াকে উপহার দিবি? বলেই হা হা করে হাসতে লাগল। 

মুচি পাই কই বল তো? ফরিদ বসতে বসতে বললো।

এই জুতা ঠিক করাবি? জুতার যা চেহারা তারচেয়ে বরং এগুলো জাদুঘরে দিয়ে দে।

ফরিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, বেকার মানুষ নিয়ে সবাই হাসিঠাট্টা করে। বন্ধুরাই বাদ যাবে কেন? কিছুদিন আগে আতিকও বেকার ছিল। চাকরি পেয়েই প্রেম করে বিয়ে করে ফেলেছে। বর্ষার সাথে আতিকের ছিল কঠিন প্রেম। একেবারে রোমিও জুলিয়েট টাইপ। 

চা খাবি? রিয়ার চিন্তায় যেভাবে শুকিয়ে মরছিস দুদিন বাদে তো শুঁটকি হয়ে যাবি। এখনই তোর শরীর থেকে শুঁটকির গন্ধ আসছে। লাইলি মজনু, শিরি ফরহাদের পরই ইতিহাসে লেখা হবে ফরিদ রিয়ার প্রেম। আমার যদি বেশি টাকা থাকতো আমি তাজমহলের মতো একটা মহল বানাতাম তোদের জন্য, নাম দিতাম রিয়া মহল। রিয়া তোকে আই লাভ ইউ টু বলেছে? 

ফরিদ মাথা নড়লো, না।

তুই তাকে আই লাভ ইউ বলিস নাই?

এবারও ফরিদ মাথা নাড়ে, না।

আতিক অবাক হয়ে বললো, তারপরও কঠিন গিট্রু প্রেম! আই লাভ ইউ শব্দের মানে জানিস?

ফরিদ ঘোলাটে চোখে আতিকের দিকে তাকিয়ে রইল। 

আই লাভ ইউ শব্দের মানে হচ্ছে, সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। আর আই লাভ ইউ টু মানে হচ্ছে তোর সাথে আমারেও কিলায়। তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, ভূতসমাজ তোকে গণপিটুনি দিয়েছে। বলেই আতিক আবারও হা হা করে হাসতে লাগল। তারপর হাসি থামিয়ে বললো, এসব পাগলামি বাদ দে। রিয়ার সাথে তোর যায়? আগে চাকরি-বাকরি জোগাড় কর, রিয়া না হোক ফারিয়া মারিয়া কাউকে তো পাবি। তোর জীবনের ভবিষ্যৎ প্ল্যান কী? আমাকে বলা যায়?

ফরিদ ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, যায়।

তাহলে বল।

তোর সাথে কথা শেষ করেই আমি রিয়াদের বাড়ির দিকে হাঁটা দিবো। ওকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। 

এটা তোর ভবিষ্যৎ প্ল্যান? তুই যে একটা পাগল তা বুঝতে পারছিস?

পারছি।

কীভাবে বুঝতে পারলি?

রিয়া আমাকে বলেছে। 

রিয়া তোকে বলেছে তুই একটা পাগল? মাশাল্লাহ, মারহাবা। এরপরও তার পিছনে ঘুরঘুর করছিস? বুদ্ধি আছে মেয়ের। রিয়ার কথা বিশ্বাস করেছিস তো?

ফরিদ অবাক হয়ে বললো, গাধার মতো কথা বলিস কেন? রিয়া একটা কথা বলবে আর আম বিশ্বাস করবো না? কী বলিস তুই? রিয়া আমার প্রেমিকা না?

তুই ওখানে গেলে রিয়া তোর সাথে দেখা করবে?

না, দারোয়ান মামার সাথে দেখা হবে, ওদের বাড়ির গেইটে বেঁধে রাখা কুকুরটার সাথে দেখা হবে, এতেই আমার সুখ।

দারোয়ান মামা নিশ্চয়ই তোকে রিয়ার খবরাখবর দিবে? তোর সাথে খোশগল্প করবে...

ফরিদ একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, না রে, দারোয়ান মামা আমাকে দেখলেই রাগ করে, খেঁকিয়ে উঠে। 

আতিক চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললো, এরপরও ওখানে যাবি? শালা তোর মাথার নাটবল্টু দেখি পুরাই আলগা হয়ে গেছে। দেখিস কোনদিন না আবার এসব খুলে পড়ে যায়! আজকাল লোহালক্করের যা দাম!

ফরিদ চুপ করে রইলো।

রিয়াকে কখনো চিঠি লিখিস নাই? 

লিখেছি তো।

চিঠিতে কী লিখেছিস?

ফরিদ ছন্দের সুরে বললো-

ওরে সুন্দরী রিয়া

করবি আমায় বিয়া?

হোক তোর আমাশয় পাইলস

কিংবা গনোরিয়া। 

মাশাল্লাহ, ডাইরেক্ট বিয়েতে চলে গেছিস? অসুখ-বিসুখও বাদ দেস নাই দেখছি। আর কিছু লিখিস নাই? 

ফরিদ ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, না।

আর কিছু না লিখে ভালো করেছিস। চিঠির উত্তর পেয়েছিস?

হ্যাঁ।

নিশ্চয় দারোয়ান মামা উত্তর নিয়ে এসেছিল? রিয়া উত্তরে কী লিখেছে? মদন?

না, ছাগল।

এর মানে কী বুঝেছিস?

হ্যাঁ। দারোয়ান মামা বলেছে, রিয়া আমার কাছে ছাগলের মাংস খেতে চেয়েছে। আমার কাছে ছাগল কেনার টাকা নাই, নইলে রিয়াকে আস্ত একটা ছাগল কিনে গোশত পাঠিয়ে দিতাম। তোর কাছে কিছু টাকা হবে? একটা ছাগল কিনতাম। 

আতিক অবাক হয়ে ফরিদের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ প্রেমে পড়লে বোকা হয়, এই শালা তো প্রেমে পড়ে পুরাই মেন্টাল হয়ে গেছে। কী বলছে, নিজেও কি জানে?

আতিক একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো, রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখ তো কাউকে এদিকে আসতে দেখা যায় কি না।

ফরিদ কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, লাল জামা পরা লুঙ্গি গায়ে চোর বাটপার নেশাখোর টাইপ একটা লোক এদিকে আসছে। 

আতিক টেবিলের নিচে মাথা লুকাতে লুকাতে বললো, ওরে হারামজাদা! কাকে কী বলছিস! ওটা আমার শ্বশুর। আমাকে খুঁজছে। 

লোকটা পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই ফরিদ বললো, উনি তোকে খুঁজছেন কেন?

বাসা থেকে বউয়ের সাথে রাগ করে বেরিয়ে এসেছি। বউ শ্বশুরকে পাঠিয়েছে আমাকে ধরে নিতে। বউ আমাকে এ নিয়ে দশবার ফোন দিয়েছে, রিসিভ করি নাই। দোস্ত রে, যতো খুশি প্রেম কর, ভুলেও বিয়ে করতে যাস না। একদম শেষ হয়ে যাবি। বউয়ের চেয়ে শত্রুও হাজার গুণ ভালো। শত্রুকে অনেক কিছুই বুঝানো যায়, বউকে কিছু বুঝানো যায় না। বউ মানেই প্যারা।

ফরিদ বললো, বউয়ের উপর রাগ করেছিস কেন? তুই না প্রেম করে বিয়ে করলি? বিয়ের আগে এই মেয়ের জন্য মরতে গিয়েছিলি না?

আরে শালা আমার কি এমন সাহস আছে বউয়ের উপর রাগ করবো? বরং বউ-ই আমার উপর রাগ করেছে, মনে রাখবি বউ হচ্ছে রাগের গোডাউন। পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটুক কোনো না কোনো কারণ থাকে, শুধু বউদের রাগের কোনো কারণ থাকে না। জামাইয়ের উপর রাগ করা ওদের বিবাহগত অধিকার। মনে রাখবি মেয়ে মানুষ প্রেমিকা হিসেবে ভালো, বউ হিসেবে ডাইনি। প্রেম করে বিয়ে করলি তো জীবন ছেঁড়াবেড়া। প্রেমিকার রংঢং ভালো লাগে, বউয়ের মিষ্টি কথাও তিতা মনে হয়। 

কথা বলতে বলতেই আতিকের মোবাইলে টুং করে একটা শব্দ হলো, মেসেজ এসেছে। মেসেজে লেখা- এই আমাকে তুমি কল দিবা?

বউয়ের মেসেজ। স্পষ্ট হুমকি। 

আতিক উত্তর দিলো, কল না দিলে তুমি কী করবা?

উত্তর এলো, তাহলে আমিই তোমাকে কল দিবো।

আতিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেখে সত্যি সত্যি কল চলে এসেছে। সে কল রিসিভ করতে গিয়ে স্পিকার অন হয়ে গেল। 

ফরিদ শুনলো আতিকের বউ বর্ষা বলছে, তোমার পাখা গজাইছে নাকি! ফোন ধরতেছো না কেন? সাহস বেড়ে গেছে? হাতির পাঁচ পা দেখছো? নাকি নতুন কাউকে পাইছো? আমি না খেয়ে বসে আছি... সকাল থেকে এতবার মোবাইল গুতাইছি, মোবাইলের প্রাণ থাকলে এতক্ষণে মারা যাইতো।

আতিক রাগী গলায় বললো, হাতির পাঁচ পা দেখি নাই, তবে তোমার মতো মোটা হাতির গলাওয়ালা মেয়েমানুষ দেখছি যে সারাক্ষণ বকরবকর করে আমার জান ঝালাপালা করে দেয়। তুমি এখনো খাও নাই, আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি বিশ্বাস করি না। বিয়ের আগেই তো দেখতাম তুমি গপগপ করে খাইতা। নাম তোমার বর্ষা হলে কী হবে, তুমি তো এসেছো আমার জীবনে আগুন লাগাইতে।

এই সাবধানে কথা বলবা। আমি কি জানতাম তোমার মাথায় ঘিলু বলতে কিছুই নাই, শুধু গোবরের লাদি... 

আতিক ব্যঙ্গ করে উঠে, এতদিন আমার মাথা চেটেপুটে খাওয়ার পর তোমার মনে হলো আমার মাথায় গোবরের লাদি? হাউ ফানি, জরিনার নানি! তোমার কথা শুনলে তো মরা মানুষও হেসে উঠবে।

এই শোনো, আমাকে রাগিও না বলছি, টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছি। খেয়ে আমাকে এবং আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীকে উদ্ধার করে যাও। নইলে কিন্তু একসপ্তাহ খাবার বন্ধ। মনে রাখবা, আমি এক কথার মানুষ। মরদ কা বাত, হাতি কা দাঁত। 

ধমক খেয়ে আতিক কিছুটা নরম হয়, সে বউকে জিগ্যেস করলো, কী রেঁধেছ? 

ওপাশ থেকে রাগী গলায় আওয়াজ পাওয়া যায়, বিষ রেঁধেছি, বিষ। খেয়ে আমাকে মুক্তি দিয়ে যাও।

আতিক নির্বিকারভাবে বললো, ঠিক আছে, তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো, আমি পরে খেয়ে নিবো। আমার আসতে দেরি হবে। এক বন্ধুর সাথে কথা বলছি। বলেই সে ফোন কেটে দেয়।

ফরিদ স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর রিয়াদের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো। 

আজকে রিয়াকে বাড়ির গেইটের সামনে পাওয়া গেল, সে হয়তো কোথাও যাচ্ছে। রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে। রিয়াদ দূরে দাঁড়িয়ে রইল। 

আজকেও রিয়া একটা ছেঁড়া প্যান্ট পরেছে। সাথে টপস। কী যে সুন্দর লাগছে! 

রিয়া তাকে দেখে ইশারা করলো কাছে যাওয়ার জন্য। দুরুদুরু বুকে সে রিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ইস, আজকে ছাগলের মাংস সাথে নিয়ে এলে সরাসরি দেওয়া যেতো। মনে মনে আফসোস করে ফরিদ।

আমাকে দেখতে এসেছেন? 

ফরিদ সামনে পিছনে মাথায় ঝাঁকিয়ে বললো, জি।

আমাকে না দেখে থাকতে পারেন না? 

ফরিদ আবার সামনে পিছনে মাথা ঝাঁকাতে থাকে, না। কিছু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ পাশে পেতে মন চায়। আপনাকে না দেখলে অস্থির লাগে। 

জানেন আমারও আপনার মতো অবস্থা, একঘণ্টা সে কাছে না থাকলে আমার মাথা ঘুরায়, অস্থির লাগে। কাজে মন বসে না।

রিকশা চলে এসেছে। রিয়া রিকশায় চড়ে বসেছে। রিকশা চলতে শুরু করেছে। 

ফরিদ পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললো, তার নামটা কি বলা যায়, যাকে এক ঘণ্টা না দেখলে আপনার অস্থির লাগে, মাথা ঘুরায়?

রিয়া পিছনে ফিরে হাসতে হাসতে বললো, অবশ্যই বলা যায়। সেটা হচ্ছে আমার হাতের মোবাইল। বলেই সে ইশারা করে হাতের মোবাইল দেখায়।

রিয়া চলে গেছে। ফরিদ সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন