ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা : কেন্দ্র ও ঢাবিতে কারা আসছেন সামনে?
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১৯:৪৭
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের ভেতরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন পর সম্ভাব্য কমিটি গঠনের আভাসে নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা ও আগ্রহ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কারা আসছেন, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে কারা দায়িত্ব পাচ্ছেন— এমন প্রশ্ন ঘিরে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা জল্পনা। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দলের প্রতি আনুগত্য— এসব বিবেচনায় নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে কী ধরনের সমীকরণ সামনে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিএনপির অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের মতো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে কমিটি পুনর্গঠনের আলোচনা থাকলেও নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর পদপ্রত্যাশী নেতাদের তৎপরতা বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন শোডাউন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার মাহফিল এবং দলীয় কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
নেতাকর্মীরা বলছেন, ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কোনো কমিটি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় থাকতে পারে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখতে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। এতে রাজপথে পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে ছাত্রদলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।
ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন— তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। দলীয় সূত্র বলছে, এবার ২০০৮–০৯ থেকে ২০১১–১২ সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসতে পারে।
২০০৯–১০ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরসেদ আলম সোহেল, মনজরুল রিয়াদ এবং এজাজুল কবির রুয়েল। একই সেশনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান। এছাড়াও সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম মাহমুদুল হাসান রনি, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ, ঢাবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুলও আলোচনায় রয়েছেন।
২০১০–১১ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন ঢাবি শাখা ছাত্রদল সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, ঢাবি শাখা ছাত্রদলের ১ নম্বর সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ।
২০১১–১২ সেশন থেকেও একঝাঁক নেতা আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, দ্বীন ইসলাম খান, নাছির উদ্দিন শাওন, তারেক হাসান মামুন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, রাজু আহমেদ, সাইদুর রহমান, ইব্রাহিম খলিল, মাহমুদ ইসলাম কাজল, শামিম আকতার শুভ ও জাহিদ হাসান শাকিল।
অন্যদিকে ছাত্রদলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায়ও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। দলীয় সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতাদের এবারের নেতৃত্বে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
সম্ভাব্য তালিকায় ২০১৩–১৪ সেশন থেকে রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল আমিন, ইমাম আল নাসের মিশুক ও জসিম খান। ২০১৪–১৫ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিএম কাউসার, সাইফ খান ও ফেরদৌস আলম।
২০১৫–১৬ সেশন থেকে রয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, বজলুর রহমান বিজয় এবং দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী।
এছাড়া ২০১৬–১৭ সেশন থেকে আলোচনায় রয়েছেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক আবু হায়াত মো. জুলফিকার জিসান এবং প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান। ২০১৭–১৮ সেশন থেকে আলোচনায় আছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. মেহেদী হাসান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক, ক্রীড়া সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল হাসান, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক নাহিদ হাসান এবং আপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুল ইসলাম।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়—দল সিলেকশন নাকি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করে এবং কারা শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের নেতৃত্বে জায়গা করে নেন।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী একাধিক নেতা জানান, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এখন মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী নতুন কমিটির অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন।
ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী বর্তমান কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, দায়িত্ব পেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছাত্রদলকে ভ্যানগার্ড হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবেন তিনি।
আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে ছাত্রদল করতে গিয়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হাতে অসংখ্যবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ছয়বার আটক হয়ে প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে, ৩৩ দিন রিমান্ডেও ছিলেন। একবার গুমের শিকার হয়েও আল্লাহর রহমতে ফিরে আসেন। এসব বিবেচনায় দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আরেক সভাপতি পদপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান বলেন, সামনে সংগঠনের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন হলেও বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
তিনি বলেন, হারের কারণ বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক কাজের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করলে ভবিষ্যতের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। একইসঙ্গে গ্রুপিং ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামোকে সময়োপযোগী ও গতিশীল করার পাশাপাশি দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া চর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীবান্ধব, ইতিবাচক ও সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী ও জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার কথাও জানান তিনি।
এদিকে ছাত্রদলের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সিলেকশন পদ্ধতির পরিবর্তে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ মে একই পদ্ধতিতে চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন হিসেবে সংগঠনটি গঠন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংগঠনটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ছাত্রদলের সেই শক্তিশালী উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমে যায়। রাজনীতির মাঠে অতীতের সেই সক্রিয় ছাত্রদলকে আর তেমনভাবে দেখা যায়নি। তবে সর্বশেষ ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংগঠনটি আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ১ মার্চ। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রদলের কমিটিরও মেয়াদ প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে দলীয় অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে।


