বিনিরাইলের জামাই মেলা : জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতা
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৩২
ছবি : বাংলাদেশের খবর
পৌষ সংক্রান্তির শেষে মাঘের প্রথম প্রভাতে গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিনিরাইল গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। স্থানীয়ভাবে যা ‘জামাই মেলা’ নামে পরিচিত।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ভোর থেকেই বিনিরাইল ও আশপাশের মাঠজুড়ে শুরু হয় মানুষের সমাগম। দিনভর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই মেলায় লাখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। বাহারি মাছের পসরা, হাসি-আড্ডা আর উৎসবের আমেজে গ্রামটি পরিণত হয় এক রঙিন জনপদে।
এই মেলার বিশেষত্ব হলো, ক্রেতার বড় অংশই জামাই। শ্বশুরবাড়ির দাওয়াতে দূর-দূরান্ত থেকে তারা আসেন বড় মাছ কিনতে। শ্বশুররাও জামাই আপ্যায়নে সেরা মাছ বাছাই করতে হাজির হন মেলায়। এতে চলে নীরব এক প্রতিযোগিতা—কার ঝুড়িতে উঠবে সবচেয়ে বড় মাছ!
বিনিরাইল গ্রামের সংলগ্ন ফসলি মাঠে প্রায় দুই শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী তাদের পসরা সাজান। সামুদ্রিক ও নদীর বিশালাকৃতির মাছের সমাহার থাকে এখানে।
-696770bf205fc.jpg)
চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালিবাউশ, পাবদা, গুলশা, গলদা চিংড়ি, বাইম, ইলিশসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির মাছের পাশাপাশি থাকে রূপচাঁদা ও পাখিমাছ। মাছের সঙ্গে মেলায় যোগ হয় মিষ্টি, খেলনা, আসবাবপত্র, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান।
দিনভর মেলা ঘিরে থাকে উৎসবের উচ্ছ্বাস। শিশুদের জন্য বিনোদনের আয়োজন, খাবারের দোকানে ভিড় আর আত্মীয়-স্বজনের মিলনে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
ইতিহাস বলছে, পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে অষ্টাদশ শতকে সনদনীরা এই মেলার সূচনা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাছের মেলা থেকে এটি রূপ নেয় সামাজিক উৎসবে। শ্বশুররা জামাইকে দাওয়াত দেন, মেয়েরা স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি ফেরেন—এই রেওয়াজেই ‘জামাই মেলা’ নামটি স্থায়ী হয়ে যায়।
কালীগঞ্জ পৌর এলাকার চুপাইর গ্রামের জামাই মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মেলা শুধু কেনাবেচা নয়, সম্পর্কের টান। বহু বছর ধরে নিয়ম করে এখানে আসি। এখন এটি সবার উৎসব।’
মেলায় ঘুরতে আসা শহিদুল সরকার জানান, বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির নিমন্ত্রণে এসে মেলাটি দেখার সুযোগ হয়েছে। নিজের জন্য এবং বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির জন্য কিছু মাছ কিনেছেন তিনি।
আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই মেলা আজ আমাদের গর্ব। সময়ের সঙ্গে এটি একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।’
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন জানান, ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থানা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মেলা প্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিনিরাইলের মাছের মেলা স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। এমন আয়োজন আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে।’
রফিক সরকার/এআরএস

